খুলনা | রবিবার | ০৯ অগাস্ট ২০২০ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

উপকারী ও পুষ্টিকর সবজি ধুন্দুল

মোঃ আবদুর রহমান | প্রকাশিত ১৮ জুলাই, ২০২০ ০০:৩৭:০০


ধুন্দুল একটি গ্রীষ্মকালীন সুস্বাদু ও পুষ্টিকর সবজি। এর ইংরেজি নাম Sponge Grourd  এবং বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Luffa aegyptiaca / Luffa Cyclindrica . ধুন্দুল কিউকার বিটেসী (Cucurbitaceae) পরিবারের একটি লতানো গুল্ম প্রকৃতির বর্ষজীবী উদ্ভিদ। 
ধুন্দুলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, সি এবং  ক্যালসিয়াম, লৌহ, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, ও পটাশিয়াম রয়েছে। কচি ধুন্দুল সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর সুস্বাদু ও নরম কচি শাঁস টুকরো করে কেটে ভাজি , ঘন্ট, ঝোল ইত্যাদি রান্না করে খাওয়া হয়। ধুন্দুলের মধ্যে লুফেইন নামে এক ধরনের আঠালো পদার্থ আছে যার কিছু ওষুধি গুণ রয়েছে। ধুন্দুলের শিকড়ের রস কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। আর পাতার রস ডায়াবেটিস, জন্ডিজ ও চোখের অসুখ নিরাময় করে। ধুন্দুল পাকার পর এর শুকনো ফলের খোসা গোসলের সময় সাবান গায়ে মাখার খোসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই খোসা রান্না ঘরে থালা বাসন পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার করা হয়। 
জলবায়ু ও মাটি : দীর্ঘ সময় ধরে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া ধুন্দুল চাষের জন্য উপযুক্ত। বীজ গজানো ও গাছের বৃদ্ধির জন্য গরম আবহাওয়ার দরকার হয়। তাই ধুন্দুল চাষের জন্য সারাদিন রোদ পরে ও খোলামেলা এবং পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা আছে ও বর্ষায় পানি জমেনা এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। যে কোনো মাটিতে ধুন্দুল চাষ করা যায়। তবে উর্বর দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি ধুন্দুল চাষের জন্য উত্তম। 
জাত নির্বাচন : আমাদের দেশে দু’ধরনের ধুন্দুল রয়েছে। এর মধ্যে একটি দেশি জাত এবং অন্যটি হাইব্রিড জাত। দেশি জাতের ধুন্দুল আকারে ছোট, দ্রুত আঁশ হয়ে যায় এবং স্বাদে কিছুটা তিতা ও ফলন কম। অপর দিকে হাইব্রিড জাতের ধুন্দুল আকারে অনেক বড়, লম্বা, সুস্বাদু, বীজ নরম, মোলায়েম এবং ফলন বেশি। বর্তমানে বাজারে বেশ কয়েকটি হাইব্রিড জাতের ধুন্দুল পাওয়া যাচ্ছে। এসব জাতের মধ্যে ফুজিয়ান, গীতা, আনন্দ, গ্রীন পিচ, সুপার গ্রীন, সৈকত প্রভৃতি অন্যতম। 
বীজ বপণের সময় : ফেব্র“য়ারি থেকে মার্চ মাস ধুন্দলের বীজ বপণের উপযুক্ত সময়। 
মাদা তৈরি ও সার প্রয়োগ : ধুন্দুল চাষের জন্য ৩/৪টি চাষ ও মই দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হবে। বসতবাড়িতে লাগানোর জন্য বেড তৈরির দরকার নেই। তৈরি জমিতে ২ মিটার দূরে দূরে সারি করে প্রতি সারিতে ৫০ সেঃ মিঃ পর পর ৬০ সেঃ মিঃ চওড়া ও ৬০ সেঃ মিঃ গভীর করে মাদা  তৈরি করতে হয়। বীজ বোনার কমপক্ষে ১০ দিন আগে মাদা তৈরি করতে হবে। প্রতি মাদার মাটির সাথে ৫ কেজি গোবর, ১০০ গ্রাম টিএসপি, ৫০ গ্রাম এমওপি, ২০ গ্রাম জিপসাম, ৫ গ্রাম দস্তা সার, ২ গ্রার বরিক এসিড ও ৫ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ভালভাবে মিশিয়ে মাদা ভরাট করতে হবে।
বীজ বপণ/চারা রোপণ : মাদায় সার প্রয়োগের ৭-৮ দিন পর প্রতি মাদায় ২/৩টি বীজ বপণ করতে হবে। বীজের আকারের দ্বিগুণ গভীরে বীজ বোনা ভাল। ৪০ বর্গমিটার বা এক শতক জমিতে ১২-১৫ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। তাড়াতাড়ি চারা গজানোর জন্য ধুন্দুলের বীজ একদিন ও একরাত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়।  তারপর পানি থেকে তুলে বীজের আবরণ না ফাটা পর্যন্ত একটি ভেজা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। বীজের আবরণ ফাটার পর বীজ মাদায় বপণ করতে হয়। চারা গজানোর পর ৮-১০ সেঃ মিঃ লম্বা হলে প্রতি মাদায় ২ টি সুস্থও সবল চারা রেখে বাকীগুলো তুলে ফেলতে হবে। 
ধুন্দুলের বীজ মাদায় না লাগিয়ে পলিথিন ব্যাগে চারা উৎপাদন করে মাদায় রোপণ করা যায়। পলিব্যাগে চারার বয়স ১৬-১৭ দিন হলে তা মাদায় লাগানোর উপযুক্ত হবে। পলিব্যাগের চারা মাদায় লাগানোর আগে পানি দিয়ে পলিব্যাগের মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে।  এতে পলিব্যাগ থেকে চারা আলাদা করার সময় মাটি ভেঙে শিকড় বের হবে না এবং চারা রোপণের পর মারা যাওয়ার হার কমবে। একইভাবে মাদার মাটিও ভিজিয়ে ‘জো’ বা‘রস’ আনতে হবে। তবে তার আগে মাদার মাটি কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ওলট পালট করে নিতে হবে। বিকেলবেলা চারা লাগানো ভালো। এত চারা কম মরে। মাদার ঠিক মাঝখানে পলিব্যাগের মাটি যতটুকু ছিল সে পর্যন্ত চারা পটুতে গোড়ার মাটি চেপে শক্ত করে দিতে হবে। এরপর গোড়ায় পানি দিতে হয়। 
আগাছা পরিষ্কার ও উপরি সার প্রয়োগ : নিয়মিত নিড়ানি দিয়ে ধুন্দুল ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করে ক্ষেতে উপরি সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া ও এমওপি সার চারা গজানো বা লাগানোর ১৫-২০ দিন পর ১ম কিস্তি, ৩০-৩৫ দিন পর ২য় কিস্তি এবং ৫০-৫৫ দিন পর তৃতীয় কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হয়। প্রতি কিস্তিতে মাদা প্রতি ৩০ গ্রাম ইউরিয়া ও ২৫ গ্রাম এমওপি সার মাদার চারদিকে (গাছের গোড়া থেকে ১০-১৫ সেঃ মিঃ দূরে) উপরি প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভাল ভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। প্রতিবার সার উপরি প্রয়োগের পর মাদায় পানি সেচ দিতে হয়। 
পানি সেচ ও নিষ্কাশন : ধুন্দুল চাষের সময় সাধারণত ঘন ঘন বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি হলে সেচ দেয়ার দরকার নেই। তবে খরা দেখা দিলে ৫ থেকে ৬ দিন অন্তর মাদায় সেচ দিতে হবে। মাটি শুকিয়ে গেলে ফুল ঝরে যায় ও ফল বড় হয় না। তাই মাটি শুকানোর আগেই পানি সেচ দিতে হবে। এছাড়া সেচ বা বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য ক্ষেতে নালা রাখতে হবে।
গোড়ায় মাটি দেয়া : পানি সেচ দেয়ার পর মাদার মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে আসলে নিড়ানি বা ছোট কোদাল দিয়ে মাটি খুচিয়ে আলগা ও ঝুরঝুরে করে দিতে হয়। এছাড়া চারা বড় হওয়ার পর ধুন্দুল ক্ষেতের দু’সারির মাঝের মাটি কুপিয়ে সারির মাঝখান থেকে ঝুরঝুরে মাটি তুলে সারি বরাবর উঁচু করে দিতে হবে। এতে সারির মাঝে নালার সৃষ্টি হয় এবং বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি সহজেই এ নালা দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে। 
মাচা তৈরি বা জাংলা দেয়া : মাটিতে বা মাচায় দু’ভাবেই ধুন্দুলের চাষ করা যায়। তবে মাটিতে বাইতে দিলে সেসব গাছের ফলের রঙ ফ্যাকাশে বা বিবর্ণ ও বিকৃত হয়, মাটির সংস্পর্শে ফল বেশি পচে ও প্রাকৃতিক ভাবে পরাগায়ন কম হয়। তাই মাচা বা জাংলায় ধুন্দুল চাষ করা উত্তম। ধুন্দুল গাছ ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলেই বাউনির জন্য মাচা  তৈরি করে দিতে হবে। মাচা মাটি থেকে ১-১.৫ মিটার উচু হবে। বাঁশের খটুটি ও জি আই তার বা নাইলনের রশি দিয়ে জাংলা করা যায়। পাটকাঠি বা ধৈঞ্চা গাছের শলাও এ কাজে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া ধুন্দুল বেড়ায়  এমনকি বড় বড় আম, জাম, কাঁঠাল, সুপারি, নারিকেল, নিম, মেহগনি, শিরিষ প্রভৃতি গাছে লতিয়ে বাড়তে পারে।
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন : পোকার মধ্যে রেড পাম্পকিন বিটল, ফলের মাছি পোকা, কাঁটালে পোকা ও মূল বা লতা ছিদ্রকারী পোকা এবং রোগের মধ্যে এ্যানথ্রাকনোজ বা ফলপচা, ডাউনি মিলডিউ, পাউডারি মিলডিউ ও পাতার দাগ রোগ, পাতা কোঁকড়ানো রোগ ধুন্দুলের ক্ষতি করে। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব পোকা ও রোগ দমন করতে হবে। 
ফসল সংগ্রহ : বীজ বপণের ৪০-৪৫ দিন পরই ধুন্দুল তোলা শুরু করা যায়। খাওয়ার জন্য কচি থাকতে সবুজ রঙের ধুন্দুল তুলতে হবে। খোসা শক্ত হয়ে এলে তা আর খাওয়ার উপযুক্ত থাকে না । ধুন্দুল পাকতে দিলে সে গাছে ফলন কমে যায়। যত ফল তোলা হবে, ফলনও তত বাড়বে। ধারালো চাকু দিয়ে বোটা কেটে একটা একটা করে ধুন্দুল তুলতে হবে। 
ফলন : এক শতক জমিতে ১০০-১৫০ কেজি ধুন্দুল উৎপাদন হয়। 
লেখক : উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিস রূপসা, খুলনা। 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


ঝিঙার পুষ্টি ও উপকারিতা

ঝিঙার পুষ্টি ও উপকারিতা

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০








সবজি চাষে কৃষকের ভাগ্য বদল

সবজি চাষে কৃষকের ভাগ্য বদল

০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০১:১০




ব্রেকিং নিউজ