খুলনা | শনিবার | ০৮ অগাস্ট ২০২০ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

করোনাকালীন ভয়ের কারণ, ভয়জনীত প্রভাব এবং প্রতিকার।

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিদ  | প্রকাশিত ২১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০:০০

করোনাকালীন ভয়ের কারণ, ভয়জনীত প্রভাব এবং প্রতিকার।


নভেল  করোনাভাইরাস বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টিকারী অন্যতম একটি উপাদান। আজকের দিনে পৃথিবী ব্যাপী করোনা মহামারি ভয়ালো থাবা রুপে জন সমাজে প্রার্দুভাব ঘটেছে। আজ এরুপ ভয় যেমন মানুষের জীবনে আর্থিক দৈন্যদশার সাথে সম্পৃক্ত, তেমনি তাহা মানুষের মনোসামাজিক প্রভাবের সাথে ও ওতোপ্রেত ভাবে জড়িত। আজকের দিনে করোনা ভয় মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনে ছন্দপতন ঘটায়ে এক ভীতিজনক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।  
করোনাকালীন ভয়ের শারীরিক কারণ
সকল মানুষের বিভিন্ন উদ্দীপকের প্রতি প্রতিক্রিয়া করার ক্ষমতা সমান নয়। কোন কোন ব্যক্তি সহজে যে কোন উদ্দীপক দ্বারা উদ্দীপিত হয়, আবার কোন কোন ব্যক্তি উদ্বেগ সৃষ্টিকারী বিভিন্ন উদ্দীপকের প্রতি ও নিজেকে সংযত রাখতে পারে। এর বিভিন্ন কারণের মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের গাঠনিক উপাদান। বিভিন্ন মানুষের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে দৃঢ়তা (stability)  এবং নমনীয়তা (lability) এর দিক দিয়ে পার্থক্য বিদ্যমান।যাদের স্নায়ুতন্ত্র বেশী নমনীয় তারা বহু সংখ্যক উদ্দীপক দ্বারা দ্রুত উত্তেজিত হয়ে। তাদের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রমন্ডলীর ক্রিয়া বেড়ে যায় এবং সহজে আবেগীয় হয়ে পড়ে, যা তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে। আর যাদের স্নায়ুতন্ত্রের গাঠনিক উপাদান দূঢ়, তারা সহজে উদ্দীপক দ্বারা উদ্দীপিত হয় না। অনেক  শারীরিরবিদ মনে করেন যে, স্নায়ুতন্ত্রের নমনীয়তার জন্য বংশগতি দায়ী। আবার কোন কোন স্নায়ুতত্ত্ববিদ মনে করেন যে, ব্যক্তি ভয়ের সময়ে অতিরিক্ত শ্বাস গ্রহণ করে। ফলে শরীরে (CO2) কার্বন -ডাই অক্সাইডের পরিমান বেড়ে যায় এবং ব্যক্তি আরো বেশি ভীত হয়ে পড়ে। আবার কখনো কোন পরিস্থিতিতে ব্যক্তি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে এমন চেনতাবোধ হতে ও ব্যক্তির মধ্যে ভীত সন্ত্রস্ত হবার প্রবনতা দেখা দেয়। তাহা ছাড়া শরীরে যদি নর এড্্িরন্যালিনের অতিরিক্ত ক্ষরণ হয়, তবে ব্যক্তি সহজে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। 
করোনাকালীন ভয়ের মনোসামাজিক কারণ 
(১) সাধারণত আমাদের সমাজে কিছু লোক আছে যারা এক্টোমরফিক বা সেরিব্রোটনিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী -তারা মূলত দূর্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। এরা নির্জনতাপ্রিয় ও সামাজিক মেলামেশা পছন্দ করে না এবং আত্মকেন্দ্রীক প্রকৃতির হয়। এরা প্রায় সময় দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগে ভোগে। ফলে এরা সহজে যে কোন উদ্দীপক দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
(২) আবেগজনীত সমস্যা তুলনামূলক ভাবে বেশী। 
(৩) পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগজনীত আচরণের ঘাটতি বিদ্যমান এবং যারা- 
(৪) কোন কাজ একশত ভাগ নির্ভূল ভাবে করার মানসিকতা পোষণ করে। 
(৫) পিতামাতার থেকে বেশি নিগৃহীত হয় অথবা বেশি আদর বা শাসন পেয়ে থাকে।
(৬) নিজেদের যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দিহান থাকে এবং এরা মনে করে পরিস্থিকে মোকাবেলা করার মত যথেষ্ট মানসিক শক্তি ও সামার্থ্য এদের মধ্যে নাই।
করোনাকালীন ভয়ের মনোসামাজিক প্রভাব
(১) গুরুতর আত্মনির্ভরতার অভাব দেখা দেয়া: এদের মধ্যে গুরুতর আত্মনির্ভরতার অভাব দেখা দেয়। এরা পরিবার এবং সঙ্গির দ্বারা প্রায় সমালোচিত হয়। এরা সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে পরিবারের সদস্যেদের সাথে এদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
(২) নিজেদের অযোগ্য ও অদক্ষতা হিসেবে ভাবতে শুরু করে: যেহেতু এরা কোন কাজ পূর্ণ বিশ্বাস ও মনোবলের দ্বারা করতে ব্যর্থ হয়, তাই তাদের কাজের মানে অপেক্ষাকৃত নিচু ফলাফল প্রতীয়মান হয় যা তাদের অযোগ্য ও অদক্ষ হিসেবে প্রতিফলিত করতে পারে।
(৩) এরা প্রায় ভয়ে ভয়ে বাঁচে: এরা মনে করে এদের সামাজিক ভাবে গ্রহণ যোগ্যতা কম। তাই তাদের মধ্যে প্রায় সময় ভয়ে ভয়ে বাঁচার প্রবনতা বিদ্যমান। 
(৪) এরা দল বা গোষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে: এরা মনে করে এদের ভালবাসার কেউ নেই, তাই এরা বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
করোনাকালীন ভয়ের শারীরিক প্রভাব
যখন মনের উপর ভয়ের প্রভাব দেখা দেয় তখন কিছু শারীরিক ও সমস্যা  দেখা দেয়। যেমন- শ্বাস প্রশ্বাস বেড়ে যায়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে, বমি বমি ভাব দেখাদিতে পারে, দম বন্ধ হয়ে আসতে পারে, মাথা ঘুরাতে পারে, শরীরির কাঁপা শুরু হতে পারে, মনের মধ্যে বিপদের আশংঙ্কা দেখা দিতে পারে, পর্যপ্ত ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে। ইত্যাদি শারীরিক লক্ষণ সমূহ ব্যাক্তির মধ্যে পরিলক্ষিত হতে পারে।
ভয়কে জয় করার উপায়:
(১) ভেষজ চিকিৎসা - যেহেতু ভয়ের সঙ্গে বিষন্নতা ও উদ্বেগ জড়িত। সুতরাং বিভিন্ন উদ্বেগ নাশক ঔষধ যেমন - বেঞ্জোডায়াজেপাইন (Banzodiazepine) জাতীয় ঔষধের মধ্যে Imipramine অথবা Pramin গ্র“পের ঔষধ এবং বিষন্নবিরোধী ঔষধ ওসরঢ়ৎধসরহব গ্র“পের মধ্যে চৎধসরহ  সেবন করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। তবে এসব ঔষধের আসক্তি স"ষ্টিকারী ক্ষমতা বিদ্যমান যা শরীরে ক্ষতিকর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতীয়মান। 
(২) ভয়ের উৎস সমূহ ক্রমানুসারে একটি কাগজে লিখে ফেলা: ভয়ের উৎস সমূহ ক্রমানুসারে একটি কাগজে লিখে এর পর কেন, কি কারনে, কখন, কিভাবে, কিসের জন্য ভয় সৃষ্টি হয় এভাবে পর্যালোচনা করলে অনেক ক্ষেত্রে ভয়ের উৎস সমূহ দূর হয়ে যায়।
(৩) শক্ষথন অভ্যাস শিক্ষা: ভীতির সময় শারীরিক শক্ষথন অভ্যাস করলে ভয় দূর হয়ে যায়। 
(৪) মোকাবিলা করতে শেখা: সাহসের সাথে ক্রমান্বয়ে ভয়ের উৎস সমূহকে (শুধু মাত্র করোনা ক্ষেত্রে নয়) মোকাবিলা করানো যেতে পারে।তাতে ব্যক্তির মধ্যে ভয়ের কারণ সমূহ দূর হতে পারে। 
(৪) করণ শিক্ষন পদ্ধতির ব্যবহার: ব্যক্তি যদি ভয়ের বস্তুকে একটু একটু করে মোকাবেলা করতে পারে তবে তাকে পুরস্কৃত করা যেতে পারে। এতে ব্যক্তির মধ্যে ভয়ের প্রবনতা কমে যেতে থাকে।
বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় করোনাকালীন ভয় একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এরুপ বাস্তবতায় ব্যক্তির মধ্যে বিভিন্ন প্রকার মানসিক ,সামাজিক ও শারীরিক সমস্যার প্রার্দূভাব দেখা দিয়েছে। তাই এরুপ পরিস্থিতিতে একজন মনোচিকিৎকের শরণাপন্ন হয়ে এ সমস্যা হতে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব।
(লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা।)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ





যাবার জন্য করোনা আসেনি (?)

যাবার জন্য করোনা আসেনি (?)

১৯ মে, ২০২০ ০০:০০


আনাড়ি নাপিতের কেরামতি 

আনাড়ি নাপিতের কেরামতি 

১২ মে, ২০২০ ২৩:০৮

করোনা, মোরে ভিখারি করনা !

করোনা, মোরে ভিখারি করনা !

০৮ মে, ২০২০ ২৩:০০


করোনামুক্তিতে হারবাল চা!

করোনামুক্তিতে হারবাল চা!

০৫ মে, ২০২০ ০০:০০


স্বপ্নদের হত্যা করতে নেই

স্বপ্নদের হত্যা করতে নেই

৩০ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০


ব্রেকিং নিউজ











শোকাবহ আগস্ট

শোকাবহ আগস্ট

০৮ অগাস্ট, ২০২০ ০১:০৫