খুলনা | শনিবার | ০৮ অগাস্ট ২০২০ | ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

করোনাকালীন আতঙ্কজনীত বিকৃতির লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী | প্রকাশিত ২৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০:০০

করোনাকালীন আতঙ্কজনীত বিকৃতির লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার

করোনা বর্তমান বিশ্বে বহুল অলোচিত একটি শব্দ। ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র এ ভাইরাসটির অপ্রত্যাশিত প্রভাব ইতোমধ্যে মানব মনে আতঙ্ক সঞ্চারণী ভূমিকা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে। করোনা ভয়ে উদিয়মান বিশ্ব আজ হারিয়েছে প্রাণ, মানুষ মন থেকে ক্রমে ভুলুন্ঠিত হয়েছে নীতি- নৈতিকতা, বিপর্যস্ত হয়েছে মানুষের মানবতা নামক হৃদ্যতা। তাই তো চারিদিকে গগণবিদারি রুপে জনমানুষের সামনে একটা প্রশ্ন -কখন মিলবে এর থেকে মুক্তি, আর কখনই বা মিলবে মানুষের মনে ছন্দযুক্ত প্রাণ? আর করোনার  কারণে মানুষের জীবনে ছন্দপতনের সাথে সাথে অমানিশার কালো নেকাবের মত গ্রাস করছে মানষিক সমস্যা। এমন মানষিক সমস্যার মধ্যে অন্যতম একটি হলো আতঙ্কজনীত বিকৃতি।
আতঙ্কজনীত বিকৃতি কি?
উদ্বেগজনীত বিকৃতির মধ্যে অন্যতম একটি হলো আতঙ্কজনীত বিকৃতি। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আশঙ্খা দেখা দিতে পারে। তবে তা হয় ক্ষণস্থায়ী এবং তাহা মানুষের জীবনে কোন রুপ বিপত্তি ঘটায় না। কিন্তু আতঙ্কজনীত বিকৃতির অন্যতম হলো কোন কারণ ছাড়ায় ভয়ের আশঙ্খা করা। সাধারণত এ প্রকার ভয় ভবিষ্যতের কোন বিপদের আশঙ্খা হতে সৃষ্টি হয়। এ ধরণের আশঙ্খা মানুষের জীবনের স্বাভাবিক কার্যাবলীকে ব্যহত করে। মোট কথা আতঙ্কজনীত বিকৃতি হলো- বারবার কোন বোধগম্য কারণ ছাড়াই আতঙ্কগ্রস্ত হওয়া এবং যখন আতঙ্ক উপস্থিত হয় তখন ব্যক্তির স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যহত হয় যা কতোকগুলো পীড়াদায়ক লক্ষণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।  
আতঙ্কজনীত বিকৃতির শারীরিক লক্ষণ
(১) ব্যক্তির মাথা ঘোরায়।
(২) হৃদ স্পন্দন বেড়ে যেতে পারে।
(৩) ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে।
(৪) বুকে ব্যথা হতে পারে।
(৫) বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে।
(৬) শরীর কাঁপতে পারে।
(৭) ব্যক্তির ডাইরিয়া বা পাতলা পায়খানা হতে পারে এমন কি আইবিএস পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।
(৮) নাড়ি ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যেতে পারে অথবা শ্বাস কষ্ট দেখা দিতে পারে। 
আতঙ্কজনীত বিকৃতির মানসিক লক্ষণ
(১) ব্যক্তি বেশির ভাগ সময়ে আতঙ্কে ভোগে।
(২) কোন কাজ মনোযোগ সহকারে শেষ করতে পারে না।
(৩) বেশির ভাগ সময়ে ভয়ে ভয়ে বাঁচে।
(৪) কোন স্থানে স্থির ভাবে বসতে পারে না।
(৫) সহজে ব্যক্তির মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে।
(৬) উদ্বেগ ও হতাশা গ্রাস করে বসে।
(৭) হীনমন্যতায় ভোগে এবং প্রত্যাখ্যানমূলক আচরণ বেশি করে।
(৮) ব্যক্তি উৎকন্ঠা বোধ করে এবং অনিদ্রায় ভোগে।
(৯) ব্যক্তির অনুভূতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়।
(১০) মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।
(১১) ব্যক্তি অস্থিরতায় ভোগে।
আতঙ্ক জনীত বিকৃতির সামাজিক লক্ষণ 
(১) ব্যক্তি-পরিবার পরিজন অথবা বন্ধু-বান্ধব থেকে খানিকটা আলাদা হয়ে যায়। 
(২) জীবন যাপন প্রনালীতে স্বাভাবিকতার ছন্দপতন ঘটে।
(৩) ব্যক্তি বেশির ভাগ লোকের সাথে স্বাভাবিক আচরণ করতে ব্যর্থ হয়।
(৪) কোন কথা বললেই সহজে রেগে যায়।
(৫) ব্যক্তির মধ্যে আত্মহত্যা প্রবনতা পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। (৬) ব্যক্তি অযথা ভয়ে ভয়ে বাঁচে।
আতঙ্ক জনীত বিকৃতির কারণ
(১) নর-এন্ড্রিন্যালীন বা এপিনেফ্রিন-চালিত বা সংশ্লিষ্ট স্নায়ুতন্ত্রের অতিসক্রিয়তা বিশেষ করে পনস্ এর মধ্যে অবস্থিত একটি স্নায়ুকেন্দ্র যার নাম ’লুকাস সেরুলিয়াস’ এর অধিক উত্তেজনা বা সক্রিয়তাকে আতঙ্কের জন্য দায়ী করা হয়। তবে এ বিষয়ে বিতর্ক বিদ্যমান।
(২) কোন কোন স্নায়ুতত্ত্ববিদ মনে করেন- অতিরিক্ত শ্বাস গ্রহণই আতঙ্ক বিকৃতির জন্য দায়ী। অনেক সময় বাতাসে স্বাভাবিকের তুলনায় কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমান বেশি থাকলে শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিমান বেড়ে যেতে পারে। এতে করে কখনো কখনো আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে।
(৩) কোন কোন ব্যক্তি নিজেদের শারীরিক অনুভূতি এবং উত্তেজনা সম্বন্ধে ভয় পায়। তাদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হলে আতঙ্ক বিকৃতি দেখা দিতে পারে।
(৪) কোন কোন ব্যক্তির ভিতর ভিতরে অনেক সময় স্বাভাবিক ঘটনাকে বড় করে দেখার প্রবনতা বিদ্যমান। অনেক সময় তারা মনে করে পরিস্থিতির উপর তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নাই। এরুপ ভাবনা ঐ ব্যক্তির উপর আরো বেশি পরিমান ক্রিয়া করে এবং ব্যক্তি আতঙ্কে ভোগে। 
আতঙ্ক জনীত বিকৃতি মোকাবেলায় করনীয়
(১) জৈবিক চিকিৎসা : আতঙ্ক জনীত বিকৃতির সাথে উদ্বেগ ও বিষন্নতা ওতোপ্রোত ভাবে জড়ীত। সে কারণে উদ্বেগ নিবারক ঔষধ যেমন বেঞ্জোডায়াজেপাইন জাতীয ঔষধের মধ্যে ব্রোমাজিপাম বা এ্যালপ্রাজোলাম বা ক্লোবাজাম এবং বিষণœতা বিরোধী ঔষধ ইমিপ্রামিন গ্র“পের ঔষধ সেবনে ভাল ফল পাওয়া যায়। তবে এসব ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি এবং আসক্তি সৃষ্টিকারী ক্ষমতা আছে।
(২) মোকাবেলা করতে শেখানো : কিছু কিছু ভীতির চিকিৎসায় যেমন: জনতার বা অন্যান্য সামাজিক পরিস্থিতির চিকিৎসায় ব্যক্তিকে উক্ত সামাজিক পরিস্থিতির সম্মুখীন করে তাদের সে সব পরিস্থির মোকাবেলা করতে শেখানো হয়।
(৩) ব্যক্তির সামাজিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা : যাতে তার সক্ষমতা বোধ অক্ষুন্ন থাকে এসব কৌশলের মধ্যে আছে- 
(ক) আত্ম-প্রতিষ্ঠামূলক প্রশিক্ষণ। 
(খ) ভাষাগত ও মৌখিক নির্দেশনা। 
(গ) করণ শিক্ষণের মাধ্যমে আচরণ শিক্ষণ।
(ঘ) রিহার্সেলের মাধ্যমে ব্যক্তির সামনে তার করণীয় ফুটিয়ে তোলা। 
(৪) শ্লথন অভ্যাস করানো :আতঙ্কগ্রস্ত রোগীদের তাদের শারীরিক উত্তেজনা সম্পর্কে ভীতগ্রস্ত হতে দেখা যায়, সেজন্য তাদের শ্লথন অভ্যাস করালে ভাল ফল পাওয়া যায়।
(৫) জ্ঞানীয় সংগঠন পরিস্থিতির পূর্ণমূল্যায়ন : জ্ঞানীয় সংগঠনের পরিস্থিতিকে আতঙ্কগ্রস্ত ব্যক্তি ভুল ভাবে মূল্যায়ন করে এবং ঋনাত্মক ঘটনা ঘটার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেখে। সে জন্য আতঙ্কগ্রস্ত ব্যক্তিকে এসব পরিস্থিতিকে পূনর্মূল্যায়ন করতে সাহায্য করা উচিৎ। এতে তার আতঙ্ক কমে যাবে। 
(৬) সমাধানমূলক  আচরণের শিক্ষা : আতঙ্কগ্রস্তÍ ব্যক্তিকে সমস্যা সমাধানমূলক আচরণের শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। 
বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় করোনাকালীন ভয় একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এরুপ বাস্তবতায় ব্যক্তির মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিতে পারে যা বিভিন্ন প্রকার মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক সমস্যার ভিতর দিয়ে প্রকাশ পায়। তাই এরুপ পরিস্থিতিতে একজন মনোচিকিৎকের শরণাপন্ন হয়ে এ সমস্যা হতে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব।
(লেখক: সহকারি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা।)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ





যাবার জন্য করোনা আসেনি (?)

যাবার জন্য করোনা আসেনি (?)

১৯ মে, ২০২০ ০০:০০


আনাড়ি নাপিতের কেরামতি 

আনাড়ি নাপিতের কেরামতি 

১২ মে, ২০২০ ২৩:০৮

করোনা, মোরে ভিখারি করনা !

করোনা, মোরে ভিখারি করনা !

০৮ মে, ২০২০ ২৩:০০


করোনামুক্তিতে হারবাল চা!

করোনামুক্তিতে হারবাল চা!

০৫ মে, ২০২০ ০০:০০


স্বপ্নদের হত্যা করতে নেই

স্বপ্নদের হত্যা করতে নেই

৩০ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০


ব্রেকিং নিউজ











শোকাবহ আগস্ট

শোকাবহ আগস্ট

০৮ অগাস্ট, ২০২০ ০১:০৫