খুলনা | শুক্রবার | ০২ অক্টোবর ২০২০ | ১৬ আশ্বিন ১৪২৭ |

আপনি কি প্রায় রেগে থাকেন! এর কারণ এবং প্রতিকার

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী | প্রকাশিত ২৯ অগাস্ট, ২০২০ ২২:৫৬:০০

’রাগ’ শব্দটির সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। সব সময় রেগে থাকেন এমন লোকের সংখ্যা যেমন বিরল নয় আবার তেমনি হুটহাট রেগে যান এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়। তবে রাগের ধরণ যেমনই হোক না কেন তার পিছনে কোন না কোন কারণ থাকে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা বহু রকমের পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। সামাজিক রাষ্ট্রীয় পরিবেশের প্রভাব, সেই সংগে ব্যক্তিত্বের কাঠামো অনুযায়ী আমরা এক একজন বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন প্রকার প্রতিক্রিয়া বা আচরণ করে থাকি। আর ক্ষুব্দ আচরণের বর্হিপ্রকাশের অন্যতম একটি মাধ্যম হলো ‘রাগ’।
রাগ সৃষ্টির কারণ সমূহ : রাগ বিভিন্ন কারণে সৃষ্টি হতে পারে, তবে তন্মধ্যে অন্যতম কারণ হলো- 
(১)ব্যক্তিত্বের গঠনগত দুর্বলতা।
(২) বিষণœতা নামক অসুখ।
(৩) ব্যক্তির সূচিবাই রোগ।
(৪) পরিবেশগত সমস্যা।
(৫) ব্যক্তির ঘুমের সমস্যা।
(৬) ব্যক্তির দীর্ঘদিনের কোন শারীরিক সমস্যা।
(৭) ব্যক্তির অতিরিক্ত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রবনতা।
(৮) অসহোযোগিতা মূলক মনোভাব।
(৯) পরিস্থিতিকে মানিয়ে নেবার অক্ষমতা।
(১০) নেশাগ্রস্ততা।
(১১) বিভিন্ন মানসিক রোগজনীত সমস্যা।
(১২) পরিবেশের শব্দ দূষণ বা বায়ু দূষণের জন্য।
(১৩) ব্যক্তি যদি কোন কারণে অন্যের রাগ পুরস্কৃত হতে দেখে তাহা অনুকরণের মাধ্যমে।
রাগের শারীরবৃত্তিয় কারণ : মানুষের মস্তিষ্কের মধ্যে বিদ্যমান আছে কিছু নিউরো ট্রান্সমিটার। আমাদের মানসিক ভারসাম্য বজায়ে রাখতে এসব নিউরো ট্রান্সমিটারের ভূমিকা অসমান্য। এ সব নিউরো ট্রান্সমিটারের (যেমন: সেরোটনিন, ডোপামিন) ভুমিকায় যখন পরিবর্তন দেখা দেয় তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ আচরণে স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে এবং অস্বাভাবিক আচরণ করতে উদ্যোগী হয়।
রেগে গেলে যে সব শারীরিক ক্ষতিসমূহ দেখা দিতে পারে : রাগলে নিম্ন লিখিত ক্ষতির ঝুঁকি সমূহ বেড়ে যেতে পারে- 
(১) ব্যক্তির হার্ট এ্যাটাক ঝুঁকি বাড়তে পারে।
(২) হৃদ রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
(৩) ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। 
(৪) হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। 
(৫) বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরানো বা গা ঘামতে পারে। 
রাগের পরোক্ষ্য ক্ষতিসমূহ :
(১) ব্যক্তির আয়ু কমে যেতে পারে। 
(২) সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে এমনকি সংসার ভেঙ্গেও যেতে পারে।
(৩) মা- বাবার  রাগ সন্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক বিকাশকে ব্যহত করতে পারে।ফলে সন্তানের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। 
(৪) অতিরিক্ত রাগ ব্যক্তিকে আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলতে পারে।
(৫) রাগ বা তৎ সংক্রান্ত কার্য থেকে মুক্তি পাবার জন্য ব্যক্তি মাদকে আসক্ত হয়ে উঠতে পারে। 
(৬) অতিরিক্ত রাগ ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। 
(৭) ব্যক্তির ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। 
(৮) ব্যক্তির মধ্যে মনোযোগ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কিছু খাবার যা রাগ কমাতে পরোক্ষ্যভাবে সহায়তা করে :
(১) কলা : কলাতে প্রচুর পরিমানে পটাসিয়াম ও ভিটামিন বি-থাকে। এই দু’টি উপাদান স্নায়ু ব্যবস্থাকে শান্ত রাখে। 
(২) আলু : আলুতে  ভিটামিন বি ও কার্বহাইড্রেট থাকে যা রক্ত চাপ ও স্ট্রেস কমায়। সেদ্ধ আলু রাগ কমাতে সাহায্য করে। 
(৩) গ্রীন টি : কোন দিন মেজাজ খারাপ থাকার জন্য যদি কাজে বিঘœ ঘটতে থাকে তবে এক কাপ গ্রীন টি খান, দেখবেন মন অনেকটা ভাল হয়ে গেছে।
(৪) চকলেট : যারা চট করে রেগে যান, তারা চকলেট খেতে পরেন। চকলেট স্ট্রেস হরমোনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ফিল্ড গুড হরমোনের ক্ষরণ বাড়ায় যা মনকে শান্ত রাখতে সহায়তা করে।
রাগ দূর করার উপায় সমূহ :
(১) গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিন এবং ছাড়তে থাকুন : যখন কারোর উপর আপনি রেগে যাচ্ছেন, তখন গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিন তিন সেকেন্ড দম আটকিয়ে রেখে তারপর আস্তে আস্তে দম ছাড়–ন, দেখবেন এতে রাগ অনেকটা কমে গেছে। 
(২) মনোযোগ সরিয়ে নিন : যখন বুঝবেন আপনি করোর উপর কোন কারণে রেগে যাচ্ছেন, তখন মনকে সেই কারণ থেকে সরিয়ে অন্য কোন কাজে নিয়োজিত করে ব্যস্ত রাখুন। পছন্দের গান শুনন বা মজার মজার ভিডিও দেখুন।
(৩) নিয়মিত ব্যায়াম করুণ : প্রতিদিন সময় করে নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়াম করুন। ব্যায়াম করলে মানসিক চাপ ও হতাশা দূর হয়। শারীরিক ব্যায়ামের ফলে মস্তিষ্কে সেরেটনিন ও এন্ডোফিন নামক উপাদান নিঃশৃত হয় যা সুখের অনুভূতি সৃষ্টি করে।
(৪) উল্টো সংখ্যা গননা শুরু করুন : যখন মনে হয় করোর উপর আপনার রাগ সৃষ্টি হচ্ছে, তখন আপনি ১০০ হতে উল্টা সংখ্যা গননা শুরু করতে চেষ্টা করুন। এতে আপনার রাগ কমে যেতে পারে। 
(৫) বিরতি নিন : রাগের সময় কোন কাজ করবেন না এমনকি কোন কথাও না বললে ভাল হয়। কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে যদি করোর সাথে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে রাগ সৃষ্টি হয়, তবে তার নিকট হতে ভাববার জন্য কিছু সময় চেয়ে নিয়ে কিছু সময় অন্যত্র ঘুরে আসুন। তারপর তার সাথে কথা বলুন, দেখবেন এতে আপনার রাগ কমে গেছে। 
(৬) পর্যাপ্ত পরিমান ঘুমান : যদি রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হয়, তবে সকালে মেজাজ খিট খিটে থাকে, তখন ছোট খাট কাজে ব্যক্তির রাগ তৈরী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রতিদিন কম পক্ষে সাত থেকে আট ঘন্টা ঘুমাতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে  ঘুম ভাল হলে ব্যক্তির মেজাজ ও ভাল থাকবে। 
(৭) স্বভাব পরিবর্তন করার চেষ্টা করুন : কথায় আছে -রেগেছেন তো হেরেছেন। তাই ছোট ছোট বিষয়ের ক্ষেত্রে করোর সাথে মনোমালিন্য সৃষ্টি হলে রাগ করার পরিবর্তে মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। এতে আপনারই জয় হবে।
(৮) ইতিবাচক হওয়ার চেষ্টা করুন : বিভিন্ন বিষয়ে কোন দুর্বল দিকে নজর না দিয়ে নিজের সংকীর্ণ মনোভাব দূর করে ইতিবাচক মনোভাব পোষণের নীতি গ্রহণ করতে পারে। এতে মানসিক চর্চা অনেক সুন্দর হবে। 
পরিশেষে বলা যায় : রাগের পরিনতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধ্বংস বয়ে আনে। মনোবিজ্ঞানী ফ্লোরিডার মতে ‘রাগ হলো মানুষের জন্মগত কু অভ্যাস।’ এ্যারিস্টোটল বলেন ‘যে কেউ রাগতে পারে। রাগা খুবই সহজ। কিন্তু সঠিক ব্যক্তির উপর, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক উদ্দেশ্যে এবং সঠিক ভাবে রাগতে পারাটা সহজ নয় এবং সবাই তা পারে না। মনে রাখতে হবে ভালবাসা ভালবাসা আনে আর রাগ ধ্বংস বয়ে আনে।’ 
(লেখক : সহকারি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা।)
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০১




অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০




শিক্ষা দরদি হিসেবে বঙ্গবন্ধু !

শিক্ষা দরদি হিসেবে বঙ্গবন্ধু !

১৫ অগাস্ট, ২০২০ ০০:০০


এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

০৯ অগাস্ট, ২০২০ ০০:৪১



ব্রেকিং নিউজ






ডিএনএ পরীক্ষা ৬ ধর্ষকের

ডিএনএ পরীক্ষা ৬ ধর্ষকের

০২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:৩৪