খুলনা | শুক্রবার | ০২ অক্টোবর ২০২০ | ১৬ আশ্বিন ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

আপনার শিশু কি প্রায় পরীক্ষাকে ভয় পায়! এর কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী (বিসিএস শিক্ষা কর্মকর্তা) | প্রকাশিত ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২২:৫৮:০০

শিক্ষার্র্থীদের যদি প্রশ্ন করা হয়- ছাত্র জীবনে কোন জিনিষটি না থাকেেল সব চেয়ে বেশি ভাল হতো? তাহলে বেশির ভাগের কাছ হতে যে উত্তরটি আসবে তাহলো ‘পরীক্ষা’। অনেক সময় এই পরীক্ষার ভীতি কবির ‘আঠার বছর বয়স’ এর সেই উদ্যমটাকে ও হার মানায়। পরীক্ষা, পরীক্ষা আর পরীক্ষা। আমরা প্রতিনিয়ত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েই চলেছি। আর পরীক্ষা মানেই একটু বাড়তি চাপ, যার প্রভাব সবার নিকট সমান ভাবে বিরাজমান নয়। শিশুর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, পিতা মাতার সাথে সন্তানের আবেগীয় উষ্ণ সম্পর্ক, শিশুর উপর পরিবেশে ও প্রতিবেশির মনোসামাজিক প্রভাব ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে শিশুর মানসিক সক্ষমতার উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এরুপ চাপ সমূহের মধ্যে অন্যতম একটি হলো পরীক্ষার ভীতি।
পরীক্ষার ভীতির শারীরবৃত্তিয় কারণ: 
আমরা পরীক্ষার সময় স্বাভাবিক ভাবে এক প্রকার মানসিক চাপ অনুভব করি। এই মানসিক চাপ অনুভব করার কারণে ’হাইপোথ্যালামাস’, ’পিটুইটারি গ্রন্থি’ এবং ’এড্রেনাল কটেক্স’ -এই সংগঠন গুলো একত্রে অতি মাত্রায় কাজ করে। আর যারা অতি মাত্রায় মানসিক চাপ বোধ করে, তাদের মধ্যে ’কর্টিসোল’ অতি মাত্রায় ক্ষরণ হয়। ফলে তাদের মধ্যে এক প্রকার ভীতি পরিলক্ষিত হয়। 
পরীক্ষার ভীতির মনস্তাত্ত্বিক ও অন্যান্য কারণ: 
মূল্যায়ন জনীত সমস্যা:

পরীক্ষা মানে সেখানে শিক্ষার্থীর মেধা ও স্বক্ষমতার মূল্যায়ন সুযোগ বিদ্যমান। এরপ মূল্যায়ন শিশুকে পরিবার, সমাজ এবং সতীর্থদের মাঝে তার অবস্থান তুলে ধরে। আগামি দিনে শিশুর প্রতি তার পিতা মাতার আদর, সামাজিক সম্মান, পারিপাশির্^ক অবস্থান, শিক্ষকের নিকট শিশুর মেধাগত অবস্থান অনেকটা তার পরীক্ষার মূল্যায়নের উপর নির্ভরশীল। এরুপ সামাজিক অবস্থানজনীত ভীতি শিশুকে পরীক্ষার প্রতি উদ্বিগ্ন করে তোলে। ফলে শিশু পরীক্ষার প্রতি ভীত হয়ে উঠতে পারে।
জনতার ভীতি:
অনেক শিশু জনতার মাঝে (বহু সংখ্যক শিশুর মধ্যে) কথা বলতে, বসতে এমন কি লিখতে ভয় পায়। এরুপ শিশু পরীক্ষার সময় পরীক্ষা কক্ষে একত্রে অনেক শিশুর মধ্যে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ভয় পায়।
বংশগত কারণ:
যদি পূর্বে পিতা মাতার এরুপ ভীতি থেকে থাকে তবে তাহা তার সন্তানদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। 
স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের গঠন:
মানুষের স্নায়ুন্ত্রের মধ্যে দৃঢ়তা ও নমনীয়তার দিক দিয়ে পার্থক্য বিদ্যমান। যাদের স্নায়ুতন্ত্র গাঠনিক কার্যক্রম নমনীয় তাদের একই সময়ে বহু সংখ্যক উদ্দীপক দ্বারা সহজে উদ্দীপিত হয়। যেহেতু পরীক্ষার কক্ষে শিশুর সামনে একই সময়ে বহু সংখ্যক উদ্দীপক উপস্থিত হয়, সেহেতু যাদের মস্তিষ্ক গঠন নমনীয় তারা পরীক্ষা কক্ষে অনেক গুলো উদ্দীপক দ্বারা সহজে প্রভাবিত হয় এবং ভীতি অনুভব করে।
শিশুর মধ্যে পরীক্ষা ভীতিজনীত কিছু লক্ষণ:
আবেগীয় লক্ষণ:

(১)    পরীক্ষার পূর্বে শিশুর মধ্যে পরীক্ষাজনীত উদ্বেগ দেখা দেয়
(২)    ভাবনায় অস্থিরতা দেখা দেয়।
(৩)    কখনো কখনো শিশুর মনের মধ্যে গুরুতর আত্ম-বিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়।
(৪)    শিশুর মধ্যে ভয়ের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
(৫)    পরীক্ষা এলে শিশু মধ্যে চরম হতাশা বোধ দেখা দেয়। 
শারীরিক প্রকাশ:
(১)    পরীক্ষার পূর্বে শিশুর বুক ধরফর করতে পারে।
(২)    পরীক্ষার টেশসনে শিশুর খাবারে অরুচি দেখা দিতে পারে। 
(৩)    শিশুর মধ্যে অনিদ্রা দেখা দেয়।
(৪)    ক্ষেত্র বিশেষ বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে।
(৫)    পরীক্ষার সময়ে প্রচুর ঘামতে পারে।
(৬)    পরীক্ষার ভয়ে মুখ কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠতে পারে।
(৭)    পরীক্ষার ভয়ে শ^াস প্রশ^াস ছোট হয়ে যেতে পারে। 
অন্যান্য লক্ষণ: 
(১)    পরীক্ষা এলে শিশু চরম অসহায়ত্ববোধ বোধ করতে পারে।
(২)    পরীক্ষা এলে অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার করণে শিশুর মনোযোগ  সমস্যা দেখা দিতে পারে।
(৩)    পরীক্ষার পূর্বে পড়ার বিষয়বস্তু ভুলে যাওয়া সমস্যা দেখা দিতে পারে।
(৪)    পরীক্ষার পূর্ব দিনে শিশুর মধ্যে এদিক ওদিক ছুটা-ছুটি করার প্রবনতা দেখা দিতে পারে।
(৫)    শিশুর মধ্যে আবেগজনীত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পরীক্ষর ভীতি দূর করতে মা-বাবার করনীয়:
বাসায় পড়ার পরিবেশ তৈরী করুন:

পরীক্ষার সময় শিশুকে একটি কোলাহলমুক্ত পরিবেশ উপহার দেবার চেষ্টা করতে হবে। এতে করে শিশুটির পড়ার মনোযোগ বিধানে সহায়তা করবে। 
শিশুকে ভাল ভাবে লক্ষ্য করুন:
শিশুটি পরীক্ষা ভীতিতে আক্রান্ত কিনা তাহা বোঝার জন্য তাকে ভাল ভাবে লক্ষ্য করুন। পেট ব্যাথ্যা, বমি বমি ভাব, খাওয়ার অরুচি, ঘুম না আসা, মন ভাল না থাকা, পড়া ভুলে যাওয়া ইত্যাদি বলে দেবে শিশুটি পরীক্ষায় ভীতিতে আক্রান্ত।
ইতিবাচক মনোভাব তৈরী সহায়তা করুন:
‘তুমি পারবে’- এমন একটি উক্তি শিশুর মনোবল তৈরীতে যথেষ্ট সহায়ক। যা পরীক্ষার ভীতিকে দূর করতে যথেষ্ট সহায়ক। 
শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন:
শিশুর ঘুমের ঘাটতি তার মনোযোগ বিচ্ছিন্নতার একটি কারণ। সুতরাং প্রতিদিন কমপক্ষে ৭ হতে ৮ ঘন্ট শিশুর ঘুমের ব্যবস্থা করুন। এতে তার মন শান্ত থাকবে।
পড়ার মাঝে শিশুটিকে বিরতি দিন:
শিশুটিকে পড়ার মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে তার সাথে গল্প করুন কিংবা মাঝে মাঝে প্রিয় কার্টুন দেখতে দিন। এতে তার মানসিক চাপ কমবে।
পরীক্ষার্থী কতৃক অনুস্বরণীয়: 
সময়মত রিভাইস দিতে হবে। 
পরীক্ষার পূর্বে হালকা খাবার খেতে হবে।
রুটিন অনুযায়ী পড়তে হবে।
পড়ার মধ্যে মাঝে মাঝে বিরতী রাখতে হবে। 
পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে। পরীক্ষার দিন পূর্বে কমপক্ষে ৭-৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবে। 
পরীক্ষার পূর্বের দিন সব কিছু গুছিয়ে রাখতে হবে। 
পরীক্ষার ভীতি সংক্রান্ত বিষয়কে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করা যেতে পারে। 
পরীক্ষার পূর্বে রিভাইজ করার সময় মেইন পয়েন্ট, সাব পয়েন্ট, দিন, তারিখ বা বিশেষ বিষয় লিখে রাখা যেতে পারে। তাতে মিমোরাইজ ভাল হবে। 
পরীক্ষার সময়ে অন্যের কোন বিষয়ে নজর না দিয়ে মাথা ঠান্ডা রেখে পরীক্ষা দিতে হবে।
(লেখক: সহকারি অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা।)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০১



অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০





শিক্ষা দরদি হিসেবে বঙ্গবন্ধু !

শিক্ষা দরদি হিসেবে বঙ্গবন্ধু !

১৫ অগাস্ট, ২০২০ ০০:০০


এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

০৯ অগাস্ট, ২০২০ ০০:৪১



ব্রেকিং নিউজ