খুলনা | সোমবার | ২৬ অক্টোবর ২০২০ | ১১ কার্তিক ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন | প্রকাশিত ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০১:০০

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

আসমান থেকে শব্দ ভেসে এল, ‘অমুকের বাগানে পানি বর্ষণ কর’। এই শব্দ মাঠ থেকে শুনতে পেল কেউ। আসমানের দিকে তাকাতেই দেখল একখন্ড মেঘে ছুটে চলেছে কোনো দিকে। সেও ছুটল মেঘমালার পিছুপিছু। মেঘমালা পৌঁছে গেল একটি বাগানের উপর। অবিরত ধারায় বর্ষিত হল বৃষ্টি। বিস্ময়ে হতবাক এও কি সম্ভব! সে খুজে বের করল বাগানের মালিককে। পরম বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করল, ভাই আপনি কি এমন আমল করেন যার বদৌলতে মেঘমালাকে আপনার বাগানে পানি বর্ষণ করার জন্য নির্দেশ করা হল? বাগানের মালিক উত্তর দিলেন, আমি বাগানের ফসলকে তিনভাগে ভাগ করি, একভাগ দান করি, একভাগ আমার পরিবারের জন্য ব্যয় করি এবং একভাগ বাগানের খরচের কাজে ব্যবহার করি। 
দান আমাদেরকে নিরাপদে রাখে আর জীবনে আনে সমৃদ্ধি। কিন্তু আমরা অনেকেই এ কাজে পিছপা হই। মনে করি দানে সম্পদ কমে যাবে। তাই সম্পদ সঞ্চিত করে রাখি। ইসলাম আমাদের ধন-সম্পদ নিজের আরাম-আয়েশ এবং পরিবারের ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে ব্যয় করার অনুমতি দিয়েছে এবং অনাগত সন্তানদের জন্য সঞ্চিত করে রাখাও অপরাধ বলেনি। কিন্তু অপরাধ হচ্ছে, সম্পদে গরীব-দুঃখী, অভাবী-অসহায়, মুখাপেক্ষী, বঞ্চিত মানুষের হক আদায় না করা। গরীব-দুঃখী, অভাবী-অসহায়, মুখাপেক্ষী, বঞ্চিত মানুষের দুঃখ দূর করার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা।
পবিত্র কুরআনুল-কারীমে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘আর যাদের ধন-সম্পদে রয়েছে নির্ধারিত হক। ভিক্ষুক এবং বঞ্চিতের (অভাবী অথচ লজ্জায় কারো কাছে হাত পাতে না) (সূরা মাআরেজ, ২৪-২৫)।’
রসূলে কারীম সলল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান বিবস্ত্র মুসলমানকে বস্ত্র পরিধান করালে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’য়ালা তাকে বেহেশতের সবুজ পোশাক পরাবেন। কোনো মুসলমান তার ক্ষুধার্ত ভাইকে অন্ন দান করলে এবং তাকে পিপাসায় পান করালে আল্লাহপাক তাকে বেহেশতের মোহর করা শরাব পান করাবেন(তিরমিজি)।’ ‘যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখিরাতের সব বিষয় সহজ করে দেবেন (মুসলিম)।’ দয়াকারদের উপর রহমান (আল্লাহ তা’য়ালা) রহম করেন। তোমরা জমিনবাসীদের উপর রহম কর, তা হলে আসমানওয়ালা (আল্লাহ তা’য়ালা) তোমরাদের উপর রহম করবেন (আবু দাউদ)।’ ‘খেজুরের একটি অংশ দান করে হলেও তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা কর (বুখারী)।’ ‘যখন আল্লাহর বান্দাগণ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে তখন দুজন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! আপনি দানকারীকে প্রতিদান দেন, আর একজন বলেন, হে আল্লাহ! আপনি কৃপণকে ধংস করেন (বুখারী)।’ ‘যে ব্যক্তি কোন বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করে, তার জন্য গোনাহমাফীর তিহাত্তরটি স্তর লেখা হয়। তন্মধ্যে একটি দ্বারা তার যাবতীয় বিষয়ের সংশোধন করে দেওয়া হয়। আর বাহাত্তরটি স্তর তার জন্য কিয়ামতের দিন উন্নতির কারণ হয়।’
দানশীলতায় রসূলাল্লাহ্ সলল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবল বাতাসের চেয়েও দ্রুত ধাববান ছিলেন। তিনি কখনো সম্পদ জমা করে রাখতেন না। তাঁর হাতে যখনই যা আসত সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা মুখাপেক্ষী মানুষের মাঝে বন্ঠন করে দিতেন। তার কাছে কেউ কিছু চাইলে তিনি কখনও না করতেন না।
আল্লাহর কাছে প্রিয় সেই ব্যক্তি যে তার সৃষ্টির প্রতি সদয় আচরণ করে। তাই ইসলাম সমাজের বিত্তশালী মানুষদেরকে গরীব-দুঃখী, অভাবী-অসহায়, মুখাপেক্ষী, বঞ্চিত, এতিম, গরীব ও দুস্থ মানুষের পাশে দাড়ানোর জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। সম্পদশালীরা গরীব-দুঃখী, অভাবী-অসহায়, মুখাপেক্ষী, বঞ্চিত, এতিম, গরীব ও দুস্থ মানুষের সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করার চেষ্টা করবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাময় ইবাদত।
বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক, বেসরকারি স্কুল কলেজের শিক্ষক, কোচিং সেন্টারে কর্মরত ব্যক্তি সহ এই ধরনের কর্মে নিয়োজিত অনেক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন যারা দীর্ঘ দিন স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান হতে বেতন পাননি। এছাড়াও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন এমন অনেকেই চাকুরি হারিয়েছেন। যারা সাহায্যের জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোথাও হাত পাততে পারেন না। পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকেন তবু কাওকে বলতে পারেন না। পরিচিত জনদের নিকট হতে ধার-কর্য হয়ত নিয়েছেন কিন্তু পরিস্থিতি দীর্ঘ হওয়ার দিন দিন কর্যের বোঝাও অনেক ভারী হয়ে গেছে। এখন হয়ত কারো নিকট হতে কর্যও পাচ্ছেন না।
এজন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে যে সমস্ত মানুষ কষ্টে থাকার পরও কার নিকটে হাত পাততে পারেন না আমরা ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে তাদের খুঁজে বের করে গোপনে তাদের সাহায্য ও সহযোগীতা করার চেষ্টা করব। মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের যাদের সামর্থ্য দিয়েছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল সঞ্চিত সম্পদ হতে এই ধরনের অসহায় মানুষদের জন্য খরচ করতে হবে, মুঠোর মধ্যে ধরে রাখলে চলবে না। মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা দেখতে চান আসলেই আমরা মহান আল্লাহ্ তা’য়ালাকে মহব্বত করি কি না? আসলেই আমরা নেকী চাই কি না? আসলে এই নেকী’ই আমাদের কাজে লাগবে। নিশ্চয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে শুনে বা দেখে থাকবেন, এই মহামারীতে মৃতের পরিবারের লোকেরা জানাজা এবং দাফন-কাফনে শরিক হচ্ছে না। লক্ষ্য করুন, কিয়ামতের ভয়াবহতা দৃশ্যমান হয়ে গেছে, ইয়া নাফছি, ইয়া নাফছি! আমি যে সম্পদ আমার ওয়ারিশদের জন্য সঞ্চয় করে রেখে যাচ্ছি, হয়তোবা সামনে এমন দিন আসছে তারা আমার জানাজা ও দাফন কাফনে শরিক হবে না বা শরিক হতে সাহস পাবে না। তাহলে কি হবে এই সঞ্চিত সম্পদ দিয়ে? ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন। যেটুকু আমি আমার আল্লাহর রাজির জন্য খরচ করব ঐটুকুই আমার কাজে আসবে।
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’য়ালা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে খাদ্য দাওনি।’ সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আপনিতো বিশ্বজাহানের প্রভু! আমি আপনাকে কিভাবে খাওয়াতে পারি? তিনি বলবেন, তুমিতো জেনে ছিলে যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে খাদ্য দাওনি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি যদি তাকে খাবার খাওয়াতে তাহলে আমার কাছ থেকে তা পেয়ে যেতে (মুসলিম)।
রসূলুল্লাহ্ সলল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করে, তার জন্য গোনাহমাফীর তিহাত্তরটি স্তর লেখা হয়। তন্মধ্যে একটি দ্বারা তার যাবতীয় বিষয়ের সংশোধন করে দেওয়া হয়। আর বাহাত্তরটি স্তর তার জন্য কিয়ামতের দিন উন্নতির কারণ হয়।
মৃত্যু এমন এক অনিবার্য বাস্তবতা যার মাধ্যমে আমার দুনিয়ার জীবনের সমস্ত আশা আকাঙ্খার পরিসমাপ্তি ঘটবে। আমাকে আমার বাড়ি-গাড়ি, জমি-জায়গা, স্ত্রী-সন্তান সর্বপরি সমস্ত সম্পদ ও আসবাব ফেলে খালি হাতে পরপারে পাড়ি জমাতে হবে। কিছুই সঙ্গে নেওয়া যাবে না। বিলাসিতায় কাটানো সুন্দর দেহটা পোকার খোরাক হবে। সকল হাসি সেদিন পরিণত হবে কান্নায়।
পবিত্র কুরআনুল-কারীমে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় করো। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম (সূরা মুনাফিকুন, ১০)।’
এজন্য আসুন আমাদের মৃত্যু আসার আগেই আমরা আমাদের সম্পদ থেকে মহান আল্লাহ্ তা’য়ালার রাজি খুশির জন্য খরচ করে আখিরাতে আমার একাউন্টে জমা করি, অন্যথায় মৃত্যু এসে গেলে আর কিছুই করার থাকবে না।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, দান করার দ্বারা যে শুধু পরকালেই উপকার পাওয়া যাবে তা নয়, এর দ্বারা দুনিয়াতেও উপকার পাওয়া যায়। রসূলুল্লাহ্ সলল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘দান আল্লাহর অসন্তুষ্টি লাঘব করে এবং লাঞ্চিত মৃত্যু (খারাপ মৃত্যু  বা অপমৃত্যু ) প্রতিরোধ করে (তিরমিজি)।’ অপর এক হাদীসে রসূলুল্লাহ্ সলল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা দান করার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করবে, কেননা বিপদাপদ তাকে (দানকে) অতিক্রম করতে পারে না (মেশকাত শরীফ)।’ অর্থাৎ দানের দ্বারা বিপদাপদ দূরীভূত হয়।
অতএব, বর্তমান অবস্থায় যদি আমরা বেশি বেশি দান করতে থাকি তাহলে মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা চাহেন তো আমাদের উপর হতে লাঞ্চিত মৃত্যু ও বিপদাপদ দূর করে দিবেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সঠিক কথার উপর আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
(লেখক: বয়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা।)
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

মহামায়া

মহামায়া

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০


প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০১:৫৩

কেন চেয়ে আছোগো মা!

কেন চেয়ে আছোগো মা!

০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০৫





অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০





ব্রেকিং নিউজ