খুলনা | সোমবার | ২৬ অক্টোবর ২০২০ | ১১ কার্তিক ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

আপনার বাচ্চার বা আপনার কি বিভিন্ন পরিবেশে বা অবস্থায় অভিযোজন সমস্যা বিদ্যমান? এর কারণ ও প্রতিকার

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী | প্রকাশিত ০৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০:০০


’অভিযোজন’ শব্দটি অনেকের নিকট অনেক ধরণের অর্থ বহন করে। শারীরবিদ্গণের মতে, অভিযোজন অর্থ হলো- পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে দেহের যন্ত্রমন্ডলী ও দেহাভ্যন্তরে রাসায়নিক জগতের পরিবর্তন সাধন করা- যাতে দেহের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায়ে থাকে। আর মনস্তাত্তিকদের মতে- পরিবেশের সাথে প্রেষণা, আবেগ, চাহিদার প্রেক্ষাপটে প্রচেষ্টার দ্বারা মানসিক ভাবে খাপ খাওয়ানোর মাধ্যমে মানসিক অভিযোজন ঘটে। মনোবিজ্ঞানে অভিযোজনের অর্থ হলো জীবনের বিভিন্ন বিপরীতমুখী তাগিদগুলোর মধ্যে যথাসম্ভব সমন্বয় সাধন করে সে গুলোর পরিতৃপ্তি সাধন করা। ব্যক্তি যখন মানসিক ভাবে অভিযোজিত হতে ব্যর্থ হয়, তখন তার অভ্যন্তরীন পীড়ন (ঝঃৎবংং) বেড়ে যায়। আর পীড়ন হলো একটি মনোদৈহিক অবস্থা যা ব্যক্তির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। 
অভিযোজন বিকৃতির মানসিক লক্ষণ সমূহ :
১.    বিষন্নতা, ক্রন্দন, হতাশা ও উদ্যমহীনতা। 
২.    দুশ্চিন্তা ও আতঙ্ক অথবা শিশুদের মধ্যে পিতা- মাতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়। 
৩.    উদ্বেগ ও বিষন্নতার সংমিশ্রন। 
৪.    চারিত্রিক বিকৃতি যেমন : স্কুল পালানো, দাঙ্গা হাঙ্গামায় জড়িত হওয়া, মারামরি করা, বেপরোয়া কাজ ইত্যাদি।
৫.    আবেগজনক পদক্ষেপ, পরিস্থিতির স্বরণাপন্ন হওয়ার পূর্বে কান্নাকাটি করা, ভয় পাওয়া, এড়িয়ে চলার চেষ্টা ইত্যাদি। 
অভিযোজন বিকৃতির শারীরিক লক্ষণ : অনিদ্রা, মাংসপেশির কম্পন্ন, ক্লান্ত বোধ হওয়া, হজমে সমস্যা ইত্যাদি।
সামাজিক অভিযোজনের সমস্যার কারণ সমূহ : 
মানুষ এক দিকে যেমন সামাজিক জীব অন্য দিকে সে একটি জৈবিক সত্তা। এ জৈবিক সত্তার চহিদার বিপরীতে ব্যক্তির অবস্থান ব্যক্তিকে পারিপাশির্^ক ভাবে সামাজিক আস্থাহীন ও বিরুপ ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে তোলে। মূল কারণ হলো- 
১.    পরিবার: শিশুর অভিযোজনে পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবারের বিভিন্ন সদস্য পরিবেশে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রত্যাশিত আচরণ বাচ্চাকে শিখিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে কোন ব্যর্তয় হলো বাচ্চারা পরিবেশগত আচরণ করতে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়।
২.    সামাজিক কারণ: গবেষণায় দেখা গেছে, এক জেনারেসনের সামাজিক সমস্যা মনোবৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে অন্য জেনারেসনে প্রতিভাত হয়ে থাকে। আপনজনের মৃত্যু, স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ, অথবা অন্য কোন বেদনাদায়ক ঘটনার কারণে যদি শিশুর পরিবার ভেঙ্গে যায়, তবে তাহা শিশুর উপর অভাবনীয় নেতিবাচক প্রভাব ফলতে পারে। ফলে শিশুর ভিতর অনভিযোজিত আচরণ সমূহ বিকাশ লাভ করতে পারে।
৩.    অর্থনৈতিক কারণ: পিতা-মাতার নিম্ন পেশা, দারিদ্রতা, অথবা নিম্ন অর্থনৈতিক অবস্থা সন্তানের মধ্যে অনভিযোজিত আচরণ সমূহ বিকাশ লাভে সহায় হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
৪.    মনোবৈজ্ঞানিক কারণ: পিতা মাতার উচ্চ স্বৈরাতান্ত্রিক মনোভাব, উচ্চ প্রত্যাশা যুক্ত মনোভাব এবং অনুপযুক্ত ও অবমাননাকর চিন্তা সন্তানের উপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাহা ছাড়া যখন শিশুর মনস্তাত্তিক চাহিদ সমূহ সঠিক ভাবে পূরণে ব্যর্থ হয়, যদি শিশুর মানসিক বিকাশ ব্যহত হয় এবং কোন কারণে শিশু যদি হতাশায় নিমজ্জিত হয়, তবে তাহা শিশুর মধ্যে অনুপোযুক্ত আচরণ বিকাশে সহায় ভূমিকা পালন করে।
৫.    বিদ্যালয় সংক্রান্ত কারণ: যখন শিশুর বিকাশমান পর্যায়ে তার শক্তি ও সামার্থকে বিদ্যালয়ে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়, তখন শিশুর অভিযেজিত আচরণে ব্যর্তয় ঘটে।
৬.    শিক্ষক কেন্দ্রিক কারণ: যদি শিক্ষকের আচরণ পক্ষপাতপূর্ণ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ছাত্রদের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে থাকে, তবে তাহা শিশুর অভিযোজনমূলক আচরণে বিরুপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
৭.    সতীর্থজনীত কারণ: সতীর্থদের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক শিশুর মনস্তাত্তিক বিকাশে বিরুপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা শিশুকে অনভিযোজিত আচরণ বিকাশে প্রভাবিত করতে পারে।
৮.    ব্যক্তিগত কারণ: যে সব শিশু শারীরিক, মানসিক দৃষ্টিগতভাবে সমস্যাগ্রস্ত, তারা বিভিন্ন পরিবেশে অস্বভাবিক আচরণ প্রদর্শণ করে থাকে। 
অন্যান কারণ: 
১.    ব্যক্তি যদি ঘটনাটিকে পীড়াদায়ক বা ভীতিজনক হিসেবে মূল্যায়ন করে।
২.    শৈশবে পীড়নমূলক ঘটনার অভিজ্ঞতা ব্যক্তিকে পরিস্থিতি সম্পর্কে ভীত করে তুলতে পারে।
৩.    ব্যক্তির ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিশেষ করে এনডমরফি অথবা অর্ন্তমূখি ব্যক্তিত্বের লোকেদের পীড়ন সহ্য করার ক্ষমতা তুলনামূলক কম বিধায় বিভিন্ন পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করতে তার ভয় পায়।
৪.    যাদের কোন কাজ একশত ভাগ নির্ভূল করার মানসিকতা বিদ্যমান, তাদের মধ্যে কোন কাজের উন্নত মান ধরে রাখার প্রয়াস এবং ব্যর্থতার সঙ্গে আপোসহীন মনোভাব পরিস্থিতি সম্পর্কে ভীত করে তুলতে পারে।   
অভিযোজনের সমস্যা মোকাবেলায় করনীয়: 
১.    জৈবিক চিকিৎসা: অভিযোজনের সমস্যার মোকাবেলায় বেঞ্জোডায়াজেপাইন জাতীয় ঔষধের মধ্যে এ্যালপ্রেরাজোলাম বা লোরাজিপাম গ্র“পের ঔষধ সেবনে ভাল ফল পাওয়া যায়। তবে এসব ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি এবং আসক্তি সৃস্টিকারী ক্ষমতা আছে তাই এ গুলো সেবন না করাই ভাল।
২.    তাদের মানসিক সাপোর্ট দ্বারা সামাজিক সমর্থন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। 
৩.    উন্নত আত্ম সম্মান প্রতিষ্ঠায় সামগ্রিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করতে পারলে ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে।
৪.    আত্ম বিশ^াস বাড়ানোর জন্য কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।
৫.    তীব্র সংকট দেখা দিলে নিদ্রা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। আঘাতের পরবর্তী পীড়নমূলক চিকিৎসা দিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, অভিযোজন সমস্যা দেখা দিলে এক জন মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ গ্রহণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব। (লেখক : বিসিএস (শিক্ষা কর্মকর্তা), সহকারি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ ,খুলনা।)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

মহামায়া

মহামায়া

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০


প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০১:৫৩

কেন চেয়ে আছোগো মা!

কেন চেয়ে আছোগো মা!

০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০৫

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০১




অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০





ব্রেকিং নিউজ