খুলনা | সোমবার | ২৬ অক্টোবর ২০২০ | ১১ কার্তিক ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

কেন চেয়ে আছোগো মা!

অনুপমা চক্রবর্ত্তী | প্রকাশিত ০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০৫:০০

আলামত হিসেবে জব্দ করা পরনের রক্তাক্ত কাপড়খানা, সাথে ক্ষত-বিক্ষত দুমড়ে পড়ে থাকা নিষ্প্রাণ দেহের ৮ বছরের পলকহীন চোখের চাহনি বিরামহীন ভাবে যেন তাড়া করেই চলেছে। যে আমার মা হয়তো কন্যা হয়তো বা জায়া, ভগিনী। কেমনে দেবো তাকে ন্যায়! কাকে বলবো! বলে কি লাভ! কে পাবে সেই ঘৃণ্য পশুদের! কার কাছেই বা বিচার চাবো! “রক্ষক যে আজ ভক্ষক সমতুল্য”। 
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কস সলিডারিটি (বিসিডব্লিউএস)-এর নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার তার নেতৃত্ব জীবনের আলোকে মন্তব্য করেন যে, দেশে যত ধর্ষণ মামলা দৃশ্যমান, ঘটনা তার চেয়ে মহামারির আকার ধারণ করেছে। স্কুল, কলেজ, যানবাহন, কর্মক্ষেত্র, বাজার, ধর্মীয় স্থান এমনকি বইয়ের লাইব্রেরীতেও চলছে সীমাহীন উৎপীড়ন। অপহরণের পর নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য ঘটনাও যেন দুষ্কৃতকারীদের থামিয়ে রাখেনি, চালিয়ে যাচ্ছে মহাসমারোহে হত্যাকান্ড। এদিকে থানায় মামলা নিতে না চাওয়া এবং অর্থের মাধ্যমে সমঝোতায় বিমুখ পরিবারের একমাত্র আশার আলো জ্বালাচ্ছে ‘ট্রাইব্যুনালে আবেদন’। 
উল্লেখ্য, ঢাকার পাঁচটি (৫) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিগত পনের বছরে ঢাকা মহানগর ও উপজেলা মিলিয়ে সাতান্নটি থানা থেকে ৫,৫০২টি মামলা এসেছে যার মধ্যে নিষ্পত্তিকৃত ২,৮৯৮টি। ‘ধর্ষণ কি’ তা বোঝাতে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটি ১৮৬০ সালের ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারাকে ভিত্তি করেছে। আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার সকল প্রμিয়া শেষ হওয়া অত্যাবশ্যক তবুও এমন নজির দৃশ্যমান যে বছরের পর বছর ধরে মামলা চলছে। আর আদালতে বিচারের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ধর্ষিতা নারী বা শিশুকে প্রতিবার ধর্ষণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধর্ষিত হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি) এর জ্যেষ্ঠ গবেষক রুচির মতে, ধর্ষণ পরবর্তী সময়ে একজন ধর্ষিতা যে ধরনের মানসিক ও শারীরিক পীড়ায় ভোগে তাকে বলে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) যা সাধারণত যুদ্ধে অবতীর্ণ মানুষের যুদ্ধ জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার দ্বারা সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাছাড়া ধর্ষণের প্রমাণ অনেকাংশে ডাক্তারি পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল যে প্রসঙ্গে বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোজাহেরুল হকের অভিমত, ধর্ষণে আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিটি বিজ্ঞানসম্মত নয় যা পাশ্চাত্য দেশগুলোতে নিষিদ্ধ। কারণ, এতে ভুক্তভোগীর মানসিক ও শারীরিক আঘাত আরো বেড়ে যায়। এমতাবস্থায় বিচার প্রμিয়া দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তায় নারী ও শিশু অধিকার কর্মীরা উদগ্রীব হয়ে উঠলে ডিফেন্স ল’ ইয়ারদের মামলা ঝুলিয়ে রাখার ঘৃণ্য মানসিকতা বিচারককে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে জনসমীক্ষে। এমনকি অনেক সময় প্রয়োজনীয় প্রমাণাদির ঘাটতি থাকায় প্রতীয়মান হয় যে, ধর্ষকের অপরাধ ততটা গুরুতর নয় যতটা ধর্ষিতা বলেছে সেক্ষেত্রে হয় অপরাধীর লঘু শাস্তি হয় নতুবা মামলাটি মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত সাব্যস্ত হয়ে বেকসুর খালাস পায়। ফলে মামলা করা বিরাট কর্মযজ্ঞ জেনেও এগিয়ে আসা সেই নির্যাতিত পরিবারটির উপর নেমে আসে ভয়ের কড়াল গ্রাস। কেন না, সমাজ মেয়েটিকে দোষী বলে মনে করে এবং বিচার্য হয় ধর্ষিতা কুমারী বা বিবাহিতা মহিলার ত্র“টিপূর্ণ কোন আচার-আচরণ বা পোষাকাদি যার কারণেই সে ধর্ষণের শিকার। অনেক সময় সামাজিক প্লানি এতটাই পাশবিক হয়ে উঠে যে, সপরিবারে রেললাইনে আত্মহুতি দিতে হয়; যা পূর্বে বহুবার সংঘটিত হলেও দৃশ্যপটে যেন আমাদের বোবা অনুভূতিগুলো দিন দিন ভোতা হয়েই চলেছে। এভাবে আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন যেমন ব্যাহত হচ্ছে ঠিক তেমনি সামাজিক ভাবেও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না। আর তাইতো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ μাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ধর্ষিতার সঠিক হিসাব এখনো অনির্দিষ্ট, যেখানে বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে গড়ে প্রতিদিনই সারাদেশ থেকে আসা ধর্ষিতার সংখ্যা আনুপাতিক হারে μমশ বাড়ছে। 
দেশে কি সমূলে উৎপাটিত হয়নি, নারী নির্যাতনের সেই প্রথা যা থেকে বের হয়ে আসে বহু আকর্ষণীয় উত্তর। বিশ শতকের গোড়া থেকে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক তাদের গবেষণার তত্ত্বে নানা ভাবে নারী নির্যাতনের তথা নারীর সার্বিক বৈষম্য পীড়িত, শোষিত ও বঞ্চিত অবস্থার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছেন। এভাবে একদিকে যখন চলছে নারী স্বাধীনতা, নারী আন্দোলন, নারী অধিকার নিয়ে সর্বত্র আলোচনা, সমালোচনা ও বক্তৃতা অন্যদিকে প্রতিনিয়ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং পুলিশি তথ্যে ধষর্ণের বহু লোমহর্ষক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিকৃত মানসিকতায় মেয়েদের কেবল শ্লীলতাহানিই ঘটছে না, তাদের এরূপ নিরাপত্তাহীনতা দেশের ভাবমূর্তিকেও করে তুলছে নিতান্ত নগ্ন। 
মূলত, শক্তিশালী আইনের যেমন কোন বিকল্প নেই তেমনি বিকল্প নেই সমাজ পরিবর্তনের অন্যথায় ভারত-বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নারীরা যৌন নিগ্রহের শিকার হতেই থাকবে আর অপরাধীরা বিচরণ করবে মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় যার প্রমাণ বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট। তাদের মতে, বিশে^র এক তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার এবং ৭ শতাংশেরও বেশি নারী তাদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় মুখবন্ধ দেন, জীবনের যেকোন সময়ে যে কোন ভাবে তারা নির্যাতিত বা ধর্ষিত। আমরা মানুষ, ধর্ষিতাও মানুষ! তাদের ক্ষেত্রে কেন হবে দুষ্প্রাপ্য ‘মানবিক মূল্যবোধ’! 
সামাজিক অবক্ষয় রোধে আমাদের অত্যন্ত সচেতনভাবে পরিবর্তন আনয়ন করতে হবে তবেই আইনের সঠিক প্রয়োগ সম্ভব। পাশাপাশি পরিবারের প্রতিটি নারীর উচিত হবে নিজেকে ছোটবেলা থেকে আত্মনির্ভর করে গড়ে তোলা, কোন পুরুষের বাজে স্পর্শে সংকুচিত না হয়ে প্রতিবাদ করা এবং গণমাধ্যমে প্রতিরোধ গড়তে শেখা। এমনকি পরিবারের প্রতিটি ছেলে বা পুরুষকেও নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে সংবেদনশীল না হয়ে। বাবা-মায়ের উচিত হবে প্রতিটি সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে একজন নারীকে অসম্মান করার পূর্বে তার বিবেক জাগ্রত হয়। সর্বোপরি, “সমাজের পরিবর্তন তখনই আসবে যখন পরিবারের পরিবর্তন সাধিত হবে”। 
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

মহামায়া

মহামায়া

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০


প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০১:৫৩


মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০১




অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

অনলাইন স্কুল : করোনাকালে আশার আলো

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০





ব্রেকিং নিউজ