খুলনা | সোমবার | ২৬ অক্টোবর ২০২০ | ১১ কার্তিক ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে বালিয়াখালি ব্রীজের বাঁক এখন মরণফাঁদ : ৪ বছরে ৫০ দুর্ঘটনা, হতাহত ৭৮

এস এম আমিনুল ইসলাম | প্রকাশিত ১৪ অক্টোবর, ২০২০ ০০:৪০:০০

মহানগরী থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে অবস্থিত ডুমুরিয়ার বালিয়াখালি ব্রীজ। এ ব্রীজ থেকে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কটি উত্তর-পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে সাতক্ষীরা অভিমুখে ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে খুলনা অভিমুখে অগ্রসর হয়েছে। ফলে ব্রীজের দুই প্রান্তে সৃষ্টি হয়েছে ইংরেজি বর্ণমালা ‘এস’ আকৃতির তীব্র বাঁক। আর এ বাঁকেই প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। গত ৪ বছরে বাঁকে অর্ধশত দুর্ঘটনা ঘটেছে, হতাহত হয়েছে অন্তত ৭৮ জন। এ অবস্থায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও মৃত্যুফাঁদ হিসেবে বাঁকটি চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডুমুরিয়া ফায়ার সার্ভিস অফিস সূত্রে জানা গেছে, বালিয়াখালি ব্রীজের দুই প্রান্তের বাঁকে গত ৪ বছরে ছোট-বড় মিলে মোট ৫০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৮ জন হতাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে ২৬ মার্চ বাস খাদে পড়ে ৪ জন, ৬ এপ্রিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন ও ৯ জুন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন আহত হয়। ২০১৮ সালে ২৬ এপ্রিল দু’টি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১ জন, ১৯ জুন এ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২ জন, ৩০ সেপ্টেম্বর মাইক্রোবাস ও নছিমন সংঘর্ষে ২ জন, ১৪ আক্টোবর ইজিবাইক উল্টে ১ জন, ২৮ নভেম্বর ব্যাটারী চালিত ভ্যান উল্টে যায় ও ২ ডিসেম্বর যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে ৪ জন আহত হয়। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ১৫ এপ্রিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন, ২৬ এপ্রিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন, ৯ মে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন, ৩০ মে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন, ৯ জুন বাস-পিকআপ দুর্ঘটনায় ৭ জন আহত ও ১ জন নিহত হয়, ২ সেপ্টেম্বর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন, ৬ সেপ্টেম্বর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন, ১২ সেপ্টেম্বর মিনি ট্রাক খাদে পড়ে ২ জন,  ২৭ সেপ্টেম্বর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন, ২৯ সেপ্টেম্বর পিকআপ খাদে পড়ে ১ জন, ১৫ নভেম্বর প্রাইভেটকার ও ইজিবাইক মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ জন, ১৮ নভেম্বর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন, ২৫ নভেম্বর যাত্রীবাহী বাস ও মোটরসাইকেল সংঘর্ষে ১ জন, ২৯ নভেম্বর মোটরসাইকেল ও এ্যাম্বুলেন্স মুখোমুখি সংঘর্ষে ২ জন, ২৬ নভেম্বর যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে ৬ জন, ২৭ নভেম্বর ট্রাকের সাথে বাই-সাইকেলের ধাক্কায় ১ জন, ৪ ডিসেম্বর কাভার্ড ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ১ জন এবং ৩১ ডিসেম্বর মোটরসাইকেল ও ভ্যান দুর্ঘটনায় ২ জন আহত হয়। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন, ১৭ মার্চ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন, ২৫ মার্চ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন, ২৮ এপ্রিল ট্রাক দুর্ঘটনায় ১ জন, ৩ মে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন, ১১ মে দু’টি ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে ১ জন, ২২ মে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন, ১৩ জুন মাইক্রোবাস খাদে পড়ে, ১৪ জুন ট্রাক উল্টে ১ জন, ২৫ জুন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন, ৩০ জুন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন, ২৯ জুলাই ইজিবাইক দুর্ঘটনায় ২ জন, ৪ আগস্ট বাস-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে ৩জন আহত ও ১ জন নিহত হয়, ১৭ আগস্ট ইঞ্জিন ভ্যান খাদে পড়ে ও ২৫ আগস্ট মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৩ জন আহত হয়। ৩ সেপ্টেম্বর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৩ জন, ওইদিন বিকেলে মোটরসাইকেল ও ভ্যান সংঘর্ষে ৩ জন, ১৩ সেপ্টেম্বর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ জন, ২০ সেপ্টেম্বর পিকআপ খাদে পড়ে, ২৮ সেপ্টেম্বর মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন হতাহত হয়। তবে ঘটনাস্থলে নিহত ছাড়াও হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক মানুষ মারা গেছেন বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
এলাকাবাসী জানায়, ব্রীজের দুই প্রান্তের তীব্র বাঁক তৈরি হয়েছে। এই বাঁকে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। অনেকে পঙ্গুত্ববরণও করছে। কিন্তু দুর্ঘটনারোধে সংশ্লিষ্টদের কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। এই বাঁক প্রশস্থকরণসহ ডিভাইডার এখন সময়ের দাবি।
ডুমুরিয়া ফায়ার সার্ভিস অফিসের স্টেশন অফিসার যুগল বিশ্বাস বলেন, বালিয়াখালি ব্রীজের দুই প্রান্তে ইংরেজি বর্ণমালা “এস” আকৃতির মতো আঁকা-বাঁকা। এই বাঁকে সড়কের পাশে উঁচু উঁচু গাছপালা রয়েছে। যার কারণে একপাশ থেকে অন্যপাশে কিছুই দেখা যায় না। এছাড়া গাড়ি এ বাঁকের কাছে আসলেও গতি কমায় না। অন্যদিকে গাড়িগুলো ব্রীজের উপর এসে ক্রস করার চেষ্টা করে। এ সময় সড়কে জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। ফলে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি ঘুরতে না পেরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে অথবা মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। অনেক সময় অপরিচিত ড্রাইভার সড়ক চিনতে না পেরে গাড়ি নিয়ে খাদে পড়ে।
তিনি জানান, দুর্ঘটনা রোধে ওই বাঁক সংশ্লিষ্ট সড়ক ডিভাইডার দিয়ে দুই লেন করতে হবে। তাহলে একপাশের গাড়ি অন্য পাশে যেতে পারবে না। এছাড়া পুলিশের নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে গাড়ির গতিবিধি ও ড্রাইভারের আচারণ শনাক্ত করে শাস্তিও ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।
খর্ণিয়া হাইওয়ে থানা পুলিশের ওসি রেজাউল করিম জানান, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে গত সোমবার ডুমুরিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলোর সমন্বয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাম্মদ শাহনাজ বেগম ওই সভার সভাপতিত্ব করেন। সভায় চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, অদক্ষ ও লাইসেন্স বিহীন চালক নিয়োগ, বিধি লঙ্ঘন করে ওভার লোডিং ও ওভার টেকিং, ¯িপ্রড ব্রেকার না থাকা, ট্রাফিক আইন অমান্য, ইঞ্জিন চালিত ক্ষুদ্রযানে যাত্রী-পণ্য পরিবহন এবং সড়কের অব্যবস্থাপনাসহ পথচারিদের অসতর্কতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। উক্ত কারণগুলো ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বা বাঁকগুলোতে ¯িপ্রড ব্রেকার না থাকা, হেলপার কর্তৃক ড্রাইভিং, টাইম কভার করতে দ্রুত গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, অবৈধভাবে সড়ক ও ফুটপথ দখল প্রভৃতি কারণকেও দায়ী করা হয়।
সভায় দুর্ঘটনা রোধে সড়কে প্রতিনিয়ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা আদায়, রাস্তার বাঁকে সাইনবোর্ড ও জায়গা বৃদ্ধিকরণ, গাছের ডাল কাটা, গাড়ির গতি কমানো, চালকদের প্রশিক্ষণ, সাইড রোড থেকে হাইওয়ে সড়কে ওঠার  স্পটগুলোতে ¯িপ্রড ব্রেকার নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। 
খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনিসুজ্জামান বলেন, যেহেতু বাঁকটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ তাই গাছের ডালপালা কাটা হবে। এছাড়া সড়কের পাশে সাইনবোর্ড দেয়া হবে এবং ওই জায়গাটুকু চলতি বছরের মধ্যে ডিভাইডার দিয়ে চার লেন করে প্রশ্বস্থ করা পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ