খুলা | বুধবার | ০২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) 

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী | প্রকাশিত ৩০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০:০০

একজন আমেরিকান অমুসলিম বিজ্ঞানী মাইকেল এইচ হার্ট তার ‘দি হানড্রেড্স’ বইতে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জনের তালিকা তৈরি করেছেন। তাতে সবার শীর্ষে যার নাম দিয়েছেন তিনি হলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। আসলেই তিনি আদর্শের বিশ্বকোষ, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তার সম্পর্কে কথা বলতে গেলে হতে হয় নির্বাক, পৃথিবী হয় নিস্তব্দ, কালি হয় নিঃশেষ, কলম হয় অচল। কল্যাণ ও আদর্শের কি ছিল না তার মধ্যে! লাখো পৃষ্টাতেও সংকুলান হবে না তার আদর্শের কাহিনী। কারণ, মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং আল্লাহতায়ালা তার প্রশংসায় বলেছেন, ‘নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী (সূরা কলম:৪)’। আর এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রসুলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ (সুরা আহজাব: ২১)’। তার কাছে এসে মিলিত হয়েছে আদর্শের সকল স্রোতধারা। 
ক্ষমা ও মহানুভবতা যার ভূষণ 
ক্ষমা ও মহানুভবতা ছিল মহানবী (সাঃ)-এর সহজাত অভ্যাস।  প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি চরম শত্র“কেও ক্ষমা করে দিতেন। মক্কার কাফির, মুশরিকরা হুজুর (সাঃ)কে প্রাণে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছে, অত্যাচারের স্টীম-রোলার চালিয়েছে তার উপর। তার পরও তিনি মক্কা বিজয়ের দিনে ঘোষণা করে ছিলেন, ‘হে কুরাইশরা! তোমরা আমার কাছ থেকে আজ কেমন ব্যবহার আশা করো?’ তারা বলল, ‘সম্মানিত ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্রের মতো!’ তিনি বলে ছিলেন, ‘তোমরা চলে যাও! আজ তোমরা মুক্ত!’ বিনা রক্তপাতের এমন বিজয়, আর বিজয়ের পরে সাধারণ ক্ষমার এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবী কি কখনও দেখেছে? এক ইহুদী বুড়ি তাকে বিষ প্রয়োগ করেছিল, তারপরও তিনি তাকে মাফ করে দিয়েছিলেন। 
বিনয় ও নম্রতা যার চাদর 
আল্লাহর নবী (সাঃ) ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। তিনি এতোই নরম প্রকৃতির ছিলেন যে মদীনার সাধারণ বাচ্চারাও তার হাত ধরে শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে নিয়ে যেতে পারতো। তিনি সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) দেরকেও মানুষের প্রতি নম্র আচরণের উপদেশ দিয়ে বলতেন, ‘তোমরা নম্র ব্যবহার করো এবং কঠোর ব্যবহার করো না। মানুষকে শান্তি দাও এবং মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না (বুখারি: ৫৬৯৪)’। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, “একবার এক বেদুঈন মসজিদে পেশাব করে দিলো। তখন লোকজন তাকে শাসন করার জন্য উত্তেজিত হয়ে পড়ল। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাদের বললেনঃ তোমরা তাকে ছেড়ে দাও এবং তার পেশাবের উপর পানি ঢেলে দাও। কারণ, তোমাদের নম্র ব্যবহারকারী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, কঠোর ব্যবহারকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি (বুখারি: ৫৬৯৮)”। 
নিরহঙ্কার ও অনাড়ম্বতা যার পোশাক 
রসুলের ভিতরে (সাঃ) অহঙ্কারের লেশ মাত্র ছিলনা। তিনি সবার আগে মানুষকে সালাম দিতেন এবং বলতেন, ‘যে আগে সালাম দেয় সে অহঙ্কার মুক্ত’। কিন্তু, বর্তমানে আমরা অপরের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকি, দেখি মুখ নড়ে কিনা, কখন সে আমাকে সালাম দেয়, এর পর উত্তর দিব। সৃষ্টির সেরা মানুষ হয়েও তিনি বিলাসিতামুক্ত, অত্যন্ত সাটা-মাটা ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। খেজুরের ছালভর্তি ছাটায়ের উপর শোয়ার কারণে তার পিঠে দাগ পড়ে যেতো। সাহাবারা (রাঃ) ভালো কোনো বিছানার ব্যবস্থা করার আবদার জানালে তার প্রতিউত্তরে তিনি বলতেন, ‘আমি দুনিয়াতে একজন পথচারী ছাড়া আর কিছুই নই। যে পথচারী একটা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে একটু পরে সেটা ছেড়ে চলে যায় (তিরমিজি: ২৩৭৭)’। তিনি সাহাবাদের সাথে এমনভাবে মিশে বসতেন যে, কোন আগন্তুক এসে চিনতে পারতো না কে আল্লাহর রসুল। এ কারণে অধিকাংশ সময়ে তারা জিজ্ঞাসা করতো, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ কে? 
লজ্জাশীলতা যার পর্দা 
মানুষ অধিকাংশ সময়ে অশ্লীল ও বেহায়া কাজ করে শুধুমাত্র লজ্জাশীল না হওয়া কারণে। এক হাদিসে আছে, ‘পুর্বেকার নবীদের কর্তব্য থেকে মানুষ যা বর্জন করেছে তার একটি হল লজ্জা, যদি তুমি লজ্জাই ছেড়ে দাও তবে তুমি যা চাও তা কর (বুখারি:৫৬৯০)’। বিশিষ্ট সাহাবি আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেনঃ ‘নবী (সাঃ) নিজ গৃহে অবস্থানরত কুমারী মেয়েদের চেয়েও বেশী লাজুক ছিলেন (বুখারি:৫৬৮৯)’। আজ আমাদের সমাজের চারদিকে, বিশেষ করে যুবক শেণী যে সমস্ত নির্লজ্জ কাজ করে তা আবার সোশাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিচ্ছে তা লিখতেও ঘৃণাবোধ হয়। রসুল (সাঃ)-এর শিক্ষাই পারে এই বিপথগামী যুবকদের বাঁচাতে।
মিশুক এক নবী 
সকল রসুলের সেরা হয়েও মহানবী (সাঃ) ছোট-বড়, শিশু-বৃদ্ধ সবার সাথে মন খুলে মিশতেন। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, আমাদের সাথে নবীজি (সাঃ) মেলামেশা করতেন, এমনকি একদিন তিনি আমার এক ছোট ভাইকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ ‘ওহে আবু উমায়র, তোমার নুগায়র পাখিটি কেমন আছে (বুখারি: ৫৬৯৯)?’ আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, ‘নবীজি (সাঃ)-এর সামনেই আমি (ছোট বেলায়) পুতুল বানিয়ে খেলতাম। আমার বান্ধবীরাও আমার সঙ্গে খেলতো। আল্লাহর রসুল (সাঃ) ঘরে প্রবেশ করলে তারা দৌঁড়ে পালাত। তখন তিনি তাদের ডেকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং তারা আমার সঙ্গে খেলা করত (বুখারি:৫৭০০)’।
দানশীলতা যার মজ্জাগত 
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, ‘নাবীজি (সাঃ) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সবার চাইতে অধিক দানশীল এবং লোকদের মধ্যে সর্বাধিক সাহসী ছিলেন (বুখারি:৫৬০৭)’। কেউ কিছু চাইলে তিনি তাদেরকে খালি হাতে ফেরাতেন না। জাবির (রাঃ) বলেন, ‘নবী (সাঃ) এর নিকট এমন কোন জিনিসই চাওয়া হয় নি, যার উত্তরে তিনি ‘না’ বলেছেন (বুখারি:৫৬০৮)’।
বিধর্মীদের প্রতি সদাচরণ 
কেবল মুসলমানই নয়, অমুসলিমদের সাথে মহানবী (সাঃ) যে উত্তম আচরণ দেখিয়েছেন, তা আজও সবাইকে বিস্মিত করে। কোন অমুসলিম নাগরিকের প্রতি যদি কোন জুলুম করা হয় তাহলে নবীজি (সাঃ) স্বয়ং নিজে তার বিরুদ্ধে বিচারের দিনে দাঁড়াবেন বলে উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। একবার এক ইহুদি নবীকে মারতে এসে তার মেহমান বনে গেলো। রাতে রসূল (সাঃ) যথাসাধ্য আপ্যায়ন করে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু শয়ন কক্ষে বিছানায় সেই ইহুদি লোকটি পায়খানা করে চলে গেলো। সকালে হুজুর (সাঃ) তার কোনো সন্ধান পেলেন না। রাসূল (সাঃ)-এর চেহারা মুবারক মলিন হয়ে গেলো। আফসোস আর আক্ষেপ করে বলে ছিলেন, ‘হায়! আমি বুঝি তার যথাসাধ্য আপ্যায়ন করতে পারিনি’। হুজুর (সাঃ) নিজ হাতে সে পায়খানা পরিস্কার করলেন। 
গরীবের বন্ধু, নিঃস্বের আশ্রয়স্থল 
নিঃস্ব, অসহায় ও এতিমদের প্রতি দয়ার শেষ ছিলনা মহানবী (সাঃ)-এর। কিভাবে গরীব মানুষের মুখে হাঁসি ফোটানো যায় এই জন্য সর্বদা ব্যাতিব্যস্ত থাকতেন। তিনি তাদেরকে খুব ভালোবাসতেন এবং সাহাবাদেরকেও ভালোবাসা ও দয়ার হাত প্রসারিত করার জন্য উৎসাহ প্রদান করে বলতেন, ‘যদি কোন ব্যাক্তি কোন বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান করে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সবুজ বস্ত্র পরিধান করাবেন। যদি কেউ কোন ক্ষুধার্তকে খানা খাওয়ায় আল্লাহপাক তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। আর যদি কেউ কোন  পিপাসিতকে পানি পান করায় মহান আল্লাহপাক তাকে জান্নাতের মোহরযুক্ত পানীয় পান করাবেন (আবু দাউদ, তিরমিজী)’। আর এক হাদিসে নবীজি (সাঃ) এরশাদ করেন, ‘আমি ও এতীমের তত্বাবধানকারী জান্নাতে এভাবে (পাশাপাশি) থাকবো। এ কথা বলার সময় তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল মিলিয়ে ইশারা করে দেখান (বুখারী:৫৫৭৯, তিরমিজী:১৯১৮)’। 
মিলাদুন্নবীতে আমাদের প্রতিজ্ঞা 
ঈদ অর্থ আনন্দ, আর মিলাদুন্নবী অর্থ নবীর জন্ম। নবীর জন্ম উপলক্ষে যে আনন্দ কর্মসূচি তাকেই বলা হয় ঈদে-মিলাদুন্নবী। তবে এটাকে সীরাতুন্নবী বলাই অধিক অর্থবহ। পৃৃথিবীতে সুমহান আদর্শ ও উন্নত আখলাক প্রতিষ্ঠা করার জন্যই আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইংরেজী ৫৭০ সনে এবং আরবী ক্যালেন্ডারের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল মাসের ৯ কিংবা ১২ তারিখ সোমবার বিশ্ব-মানবতার মুক্তিদূত মহানবী (সাঃ) জন্ম গ্রহণ করেন। মহানবী (সাঃ)-এর সুন্নত ও মহাব্বত সাহাবায়ে কেরামের অস্থি-মজ্জা ও অন্তরে বদ্ধমূল ছিলো। যার কারণে রসুলের জন্ম দিনকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ দিবসে কোন কর্মসূচির আয়োজন তারা করেননি। তারা সারা বছরই হুজুরের প্রশংসা করেছেন এবং তার ও তার পরিবারের ওপর দরুদ ও সম্মান জানানোকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও বরকতের ওসিলা হিসেবে মনে করেছেন। মহানবীর চরিত্র ও আদর্শের কথা লিখে কখনও শেষ করা যাবে না। তিনি যেন এক ‘জীবন্ত আদর্শকোষ’। তাই আসুন, আমরা শুধুমাত্র মিষ্টি খাওয়া, র‌্যালি-করা, আর একটি নির্দিষ্ট দিনে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে সারাবছরই মহান নবীর মহান আদর্শের আলোচনা অব্যাহত রাখি এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তার আদর্শকে ছড়িয়ে দিয়ে এক সুস্থ সমাজ গড়ি।   
(লেখক: জেনেট্ক্সি বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যাল।)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম ২৭ নভেম্বর

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম ২৭ নভেম্বর

১৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০২




আখেরি চাহার শোম্বা  ১৪ অক্টোবর

আখেরি চাহার শোম্বা  ১৪ অক্টোবর

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:৩৩

রোগী দেখতে যাওয়া রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাত

রোগী দেখতে যাওয়া রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাত

০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০


হজযাত্রীদের প্রথম দল মক্কায়

হজযাত্রীদের প্রথম দল মক্কায়

২৭ জুলাই, ২০২০ ০০:২০

এবার বাংলাতেও হবে হজের খুতবা

এবার বাংলাতেও হবে হজের খুতবা

২৬ জুলাই, ২০২০ ০০:৩৬


কুরবানি ও গুরুত্বপুর্ন আমল

কুরবানি ও গুরুত্বপুর্ন আমল

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০

পবিত্র জিলকদ  মাস শুরু আজ

পবিত্র জিলকদ  মাস শুরু আজ

২৩ জুন, ২০২০ ০০:০০


ব্রেকিং নিউজ