খুলা | বুধবার | ০২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

আপনি কি প্রায় বিষন্নতা বা ডিপ্রেসনে ভোগেন? জেনে নিন বিষন্নতার কারণ এবং তা দূর করার উপায়? 

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী | প্রকাশিত ০৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০:০০

বিষন্নতা একটি আবেগীয় অবস্থা যা মানসিক প্রতিবন্ধীতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রত্যক্ষ হোক আর পরোক্ষ হোক বেশির ভাগ লোক কোন না কোন সময় বিষণœতা দ্বারা আক্রান্ত হয়। বিষণœতা মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ভাবে দেখা দেয়, যেমন- এক মুখী বিষন্নতা, দ্বিমেরু বিশিষ্ট বিষন্নতা, গুরুতর বিষন্নতা, জৈবিক হতাশা, সাইকোথাইমিক বিকৃতি, ডিসথাইমিক বিকৃতি ইত্যাদি। বিষণœতাকে আমরা যে ভাবেই ব্যাখ্যা করি না কেন, উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে নিজেকে বিষণœতা মুক্ত জীবন লাভ করা সম্ভব। 
গুরুত্বর বিষন্নতার লক্ষণ:
সাধারন্ত বিষন্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তির নিম্নলিখিত লক্ষণ সমূহ দেখা দেয় :

প্রায় প্রতিদিন দিনের বেশির ভাগ সময়ে ব্যক্তি দুঃখিত থাকে।
ব্যক্তির নিজের বাস্তব কাজকর্মের প্রতি আগ্রহ ও আনন্দহীনতা বিদ্যমান।
সহজে ঘুম আসে না, মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে আর ঘুম আসে না। কেউ কেউ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ে।
ব্যক্তির সক্রিয়তার মাত্রায় পরিবর্তন ঘটে। হয়তো ব্যক্তি অলস হয়ে যায় নতুবা বেশি উত্তেজিত বা কর্মক্ষম হয়ে উঠে।
ক্ষুধা কমে যায় ও ওজন কমে যায় অথবা ক্ষুধা বেড়ে যায় ও ওজন বেড়ে যায়।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ক্লান্তি বা অবসন্ন বোধ করে।
রোগির মধ্যে নেতিবাচক আত্মধারণা বিকাশ ঘটে। নিজেকে দোষ দেওয়া, নিজেকে অপদার্থ মনে করার বদ অভ্যাস গড়ে ওঠে।
বেশির ভাগ কাজে ব্যক্তি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে।
ব্যক্তির মধ্যে পুনঃপুনঃ আত্মহত্যা চিন্তা অথবা মৃত্যু চিন্তা পেয়ে বসে।
ডিপ্রেসন বা বিষন্নতার কারণ: 
১. মনোসমীক্ষণ তথ্য :
এ তথ্য মতে, বিষন্নতার সম্ভাবনা অতিশৈশবে শুরু হয়। ফ্রয়েড়ের মতে, শিশু বিকাশের মৌলিক স্তরে যখন শিশুর তাগিদ সমূহ খুব কম পরিমানে বা বেশি পরিমানে পরিতৃপ্ত হয়, তখন শিশুর বিকাশ ঐ পর্যায়ে থেমে যায়। ফলে শিশুর স্বাভাবিক যৌন-মানসিক পরিপক্কতা ব্যহত হয় এবং শিশুর আত্মমর্যাদা রক্ষার্থে অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার প্রবনতা তৈরী হয়, যা শিশুকে হতাশায় নিমজ্জিত করে।
২. মনোবিজ্ঞানী বেকের তথ্য : এ তথ্যের আলোকে মনে করা হয় যে-বিষণœতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের চিন্তা ধারায় কোন ঘটনার নেতিবাচক বা পক্ষপাতদুষ্ট ব্যাখ্যায় বেশিভাবে অভ্যস্ত। বিষণœতার পিছনে বেক জ্ঞানীয় প্রক্রিয়ার তিন পর্যায়ের পারস্পরিক ক্রিয়াকে দায়ী করেছেন বেকের মতে- প্রথমত : বিভিন্ন প্রত্যাখানমূলক ঘটনা হতে ব্যক্তির মধ্যে ত্রিবিধ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরী  হয়। দ্বিতীয়ত : জীবন প্রবাহে ব্যক্তির মধ্যে নেতিবাচক ঘটনা হতে নেতিবাচক স্কিমা তৈরী হয়ে যায়। তৃতীয়ত : অর্জিত নেতিবাচক স্কীমা ব্যক্তির মধ্যে একপাশে চিন্তার সৃষ্টি করে। আর এরুপ এক পাশে চিন্তা ব্যক্তির মধ্যে বিষন্নতার সৃষ্টি করে। 
৩. আশাহীনতার তথ্য : এ তথ্য মতে, বিষন্নতার জন্য ব্যক্তির মধ্যে বর্তমান আশাহীনতা বা নিরাশ প্রবনতা কে দায়ী করা হয়। এই তথ্য মতে ব্যক্তি প্রায় মনে করে যে, কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটবে এবং যা মোকাবিলা করার মত উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া তার নিকট মজুদ নাই। ফলে ব্যক্তির অসহায়ত্ব বোধ থেকে তার মধ্যে নিরাশবাদী মনোভাব তৈরী হয় যা তাকে নৈরাশ্যের দিকে পতিত করে।
৪. স্নায়ু রসায়ন মতবাদ - এ মতবাদ অনুসারে মনে করা হয়ে থাকে যে, আমাদের মেজাজের বিকৃতিতে নিউরোট্রানেসমিটার বা বার্তা বাহক গুলোর ভূমিকা বর্তমান। নর-এপিনেফ্রিনের ভূমিকা সংক্রান্ত মতবাদ অনুসারে শরীরে নর-এপিনেফ্রিনের মাত্রা কমে গেলে ব্যক্তির ভিতর বিষন্নতার লক্ষণ দেখা দেয়। আবার সেরোটনিন সম্পর্কিত তথ্যে বলা হয়েছে যে, শরীরে সেরোটনিনের মাত্রা কমে গেলে ব্যক্তির ভিতর বিষন্নতা দেখা দেয়।
৫. হরমোন ও স্নায়ুবিক তত্ত্ব - এ তত্ত্ব অনুসারে বিষন্নতার সময়ে যে সব শারীরিক লক্ষণ সমূহ দেখা যায়- যেমন, খাদ্যে অনিহা, ঘুমের ব্যাঘাত- এ গুলোর জন্য হাইপোথ্যালামাস-পিটুইটারি ও এড্রেনাল কর্টেক্স - এই সংগঠন গুলোর অতিরিক্ত সক্রিয়তাকে দায়ী করা হয়।
বিষন্নতা দূর করণের উপায় :
১. জৈবিক চিকিৎসা : বিষন্নতা চিকিৎসার জন্য জৈবিক ঔষধ এবং রাসায়নিক ঔষধ উভয় ধরণের ঔষধ বেশ কার্যকর বলে প্রমানিত হয়েছে। তবে এসব ঔষধ সবার জন্য সমান ভাবে কাজ করে না এবং এর পাশর্^ প্রতিক্রিয়া গুরুতর হতে পারে। তিন শ্রেণীর বিষন্নতা বিরোধী ঔষধ (১) তিন চক্র বিশিষ্ট ঔষধ- যথা ইমিপ্রামিন, এমিট্রিপটাইলিন (২) নির্বচিত সেরোটটিন পুনঃগ্রহণ অবদমনকারী ঔষধ- যেমন, ফ্লোক্সেটিন (৩) মনোএমাইন অক্সাইডেজ অবদমনকারী ঔষধ -যেমন, পারনেট বিষণœতা নিবারণে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করে। তবে যাদের মেজাজ উঠা নামা করে তাদের জন্য লিথিয়াম বেশ ফলপ্রসূ হিসেবে বিবেচিত। 
২. মনোসমীক্ষণমূলক চিকিৎসা : মনে করা হয় যে, যখন ক্রোধ বর্হিমূখী না হয়ে ব্যক্তির নিজের প্রতি ধাবিত হয়, তখন বিষণœতা দেখা দেয়। সে জন্য মনোসমীক্ষণ পদ্ধতির চিকিৎসায় ব্যক্তির অবদমিত দ্বন্দ্বগুলো  যা ব্যক্তির বিষণœতার জন্য দায়ী সে গুলো আবিষ্কার করে তাহা উন্মোচনে রুগিকে সাহায্য করা হয়।
৩. আন্ত: ব্যক্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে চিকিৎসায় বিষন্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সামাজিক পরিবেশের সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করা হয়। রোগীর যে সব আচরণ সামাজিক সম্পর্ক থেকে আনন্দ উপভোগ করতে বাধা দেয়, রোগীকে সে গুলো পরীক্ষা করতে সাহায্য করা হয়।
৪.    জ্ঞানীয় চিকিৎসা পদ্ধতি : এ প্রকার তথ্য অনুযায়ী মনে করা হয় যে, বিষন্নতায় আক্রান্ত রোগীর গভীর দুঃখবোধ  এবং আত্মমর্যাদা বিধস্ত হয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো- ঐ সব ব্যক্তির ভুল /ত্র“টিপূর্ণ চিন্তাধারা। এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতে হলে চিকিৎসক বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে এবং নিজের সম্পর্কে রোগীর যে সব মতামত থাকে, সেগুলো বদলাতে চেষ্টা করেন। তারপর চিকিৎসক রোগীকে শিখিয়ে দেন যাতে সে তার নেতিবাচক চিন্তাধারা গুলোকে বিশ্লেষণ করতে পারে এবং বুঝতে পারে এগুলো কিভাবে তাকে বাস্তব ধর্মী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা দিচ্ছে। পরিশেষে বলা যায়, বিষণœতা একটি মারাত্মক বিপদজনক রোগ যা রোগিকে ধীরে ধীরে নানা প্রকার মানসিক রোগের সাথে শারীরিক রোগের দিকে অগ্রসর করে। তাই বিষণœতা থেকে যদি সত্যিকারের মুক্তি পেতে চান তবে তবে ঔষুধের উপর নির্ভরতা কমিয়ে, দরকার আপনার চিন্তা ও মানসিক জগতের সত্যিকারের পরিবর্তন। আর তার জন্য প্রয়োজন একজন মনোবিজ্ঞানীর সঠিক দিকনির্দেশনা যা আপনার জীবন ধারা ও চিন্তা চেতনাকে পরিবর্তন করতে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। 
(লেখক : সহকারি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা।)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


আমার দেখা মওলানা ভাসানী

আমার দেখা মওলানা ভাসানী

১৭ নভেম্বর, ২০২০ ০১:৩৩



মহামায়া

মহামায়া

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০


প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০১:৫৩

কেন চেয়ে আছোগো মা!

কেন চেয়ে আছোগো মা!

০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০৫


মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০১




ব্রেকিং নিউজ