খুলা | বুধবার | ০২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

মহানবী (সঃ)-এর প্রতি ষড়যন্ত্র ও অবমাননা যুগে যুগে: আমাদের করণীয় 

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী | প্রকাশিত ১৩ নভেম্বর, ২০২০ ০১:০৩:০০

মহানবী (সঃ)-এর প্রতি ষড়যন্ত্র ও অবমাননা যুগে যুগে: আমাদের করণীয় 


সর্বযুগের, সর্বকালের, সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম। স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালাও তার চরিত্রের প্রশংসা করে তাকে বিশ্বমানবের আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করে এরশাদ করেছেন, ‘হে নবী, নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী (সূরা কলম:৪)’। কিন্তু বড় আশ্চর্য্য ও দুঃখের বিষয় হলো, মুশরিক, খ্রীষ্টান ও ইহুদীদের একটি কুচক্রী মহল সব সময়ই এই মহামানবের বিরুদ্ধে অপবাদ, কুৎসারটনা ও গভীর ষড়যস্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। সাম্প্রতিককালে নবীর প্রতি অবমাননা ও ফ্রান্স সরকারের পৃষ্টপোষতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে গোটা মুসলিম বিশ্ব ও বিজ্ঞমহল। 
মুসলমানরা অন্যের নবীকে অবমাননা করে না :
কোন মুসলমানই অন্য ধর্মের নবীর প্রতি কখনই কটাক্ষ ও অবমাননা করেনা। বিগত কোন যুগেই এর দৃষ্টান্ত নেই। ইহুদীদের নবী মূসা, হারুন, সুলাইমান, দাউদ, খ্রীষ্টানদের নবী ঈসা (আঃ) সবার নাম শুনলেই মুসলমানরা বলে, আলাইহিমুস-সালাম, অর্থাৎ তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এটা আমাদের মহানবী (সঃ)-এর শিক্ষা। হুজুর (সাঃ) নিষেধ করেছেন যে, বিধর্মীরা তোমাদের রবেকে গালি দিলেও তোমরা তাদের মাবুদগুলোকে গালি দিবে না। অন্য ধর্মের নবী মানে তিনি মুসলমানদেরও নবী। অথচ গত দেড় হাজার বছরের ইতিহাস কি বলছে? সেই মুহাম্মদ (সাঃ)-এর যুগ থেকে অদ্যবধি বিধর্মীদের একটি মহল কি পরিমাণ ষড়যন্ত্র ও বিষোৎগারে লিপ্ত আছে। তাহলে প্রশ্ন হলো তারা কেন আমাদের পূতপবিত্র নবীকে নিয়ে কটাক্ষ করবে, অপবাদ দিবে ও  কুৎসা রটনা করবে? 
নবীর (সাঃ) প্রতি ষড়যন্ত্র যুগে যুগে: 
আমাদের নবীর (সাঃ) প্রতি খ্রীষ্টান ও ইহুদীদের ষড়যন্ত্র আজকের নতুন নয়। নবী করীম (সাঃ)-এর জমানা থেকেই এই ষড়যন্ত্র চলে আসছে যা কুরআনের অসংখ্য জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় আগমন করার পর বিভিন্ন ইহুদী গোত্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছিলেন যে, তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে না এবং একে অপরকে সাহায্য করবে। কিন্তু তারা সবসময়ই বিশ্বাসঘাতকতা করতো এবং মক্কার কাফের ও অন্যান্য মুনাফিকদের সাথে যোগসাজসে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করত এবং মহানবী (সাঃ) কে পৃথিবী থেকে চির বিদায় করার ফন্দি আটতো। ইহুদীদের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে একটি ছিল বনু নুযায়ের। তারাও শান্তিচুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা মদীনা থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে বসবাস করত। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোন এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রক্ত বিনিময় আদায় করার জন্য হুজুর (সাঃ) একবার বনু নুযায়ের গোত্রের নিকট গিয়েছিলেন। তারা দেখলো যে নবীকে হত্যা করার এটাই সুবর্ণ সুযোগ। তাই তারা রসুলুল্লাহ (সঃ) কে এক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বললোঃ আপনি এখানে অপেক্ষা করুন। আমরা রক্ত বিনিময়ের অর্থ সংগ্রহ করার ব্যবস্থা করছি। এরপর তারা গোপনে সাংঘাতিক চক্রান্ত করলো যে, তিনি যে প্রাচীরের  নিচে বসে আছেন, এক  ব্যক্তি সেই প্রাচীরের ওপরে গিয়ে একটি প্রকান্ড ও ভারী পাথর তার মাথার ওপর ছেড়ে দেবে যাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা তৎক্ষণাৎ ওহীর মাধ্যমে এই চক্রান্তের ব্যাপারটি অবহিত করে দিলেন এবং সেখান থেকে সরে যেতে বল্লেন (বিস্তারিত সূরা হাশরের তাফসীরে দেখুন)। আরও অনেক সময়ে তারা মহানবী (সাঃ) কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছে। ওহুদ যুদ্ধের পর দৃশ্যত তাদের বিশ্বাসঘাতকতার মাত্রা চরমে পৌঁছে। ওহুদ যুদ্ধের পর বনু নুযায়েরের জনৈক সর্দার কা’ব ইবনে আশরাফ চল্লিশ জন ইহুদীকে সাথে নিয়ে মক্কা পৌঁছে এবং ওহুদ যুদ্ধফেরত কোরায়েশী কাফিরদের সাথে সাক্ষাৎ করে। দীর্ঘ আলোচনার পর তারা আল্লাহ’র নবী (সাঃ) ও মুসলমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার গোপন চুক্তি  চুড়ান্ত করে। চুক্তিটি  পাকাপোক্ত করার জন্য কাব ইবনে আশরাফ চল্লিশজন ইহুদীসহ এবং প্রতিপক্ষের আবু সুফিয়ান চল্লিশজন কোরায়েশী নেতাসহ কাবা গৃহে প্রবেশ করে এবং বায়তুল্লাহর গিলাফ ধরে পারস্পরিক সহোযোগীতা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অঙ্গিকার করে। এটি ছিল শান্তি চুক্তির প্রকাশ্য লংঘন। আর একবার মুশরিক ও কাফির গোষ্ঠী ধোকা দিয়ে ডেকে এনে উনসত্তর জন বিজ্ঞ ও ক্বারী সাহাবীকে একবারে হত্যা করেছিল। 
মুশরিক, ইহুদী এবং খ্রীষ্টানরা সবসময়ই মুসলমানের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে যাচ্ছে এবং নানাভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, কুৎসারটনা করছে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব দয়ার নবী (সাঃ) কে অবমাননা করছে এবং তার সম্পর্কে ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি ও প্রপাগান্ডা করে  চলেছে। তারই সাস্প্রতিক কিছু নমুনা আমরা লক্ষ্য করেছি। বেশ কয়েক বছর আগে, ইহুদী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক স্যাম বাসিল মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তার পরিবারকে প্রকাশ্য অবমাননা করে কুরুচিপূর্ণ একটি মুভি তৈরি করেছিল। দোজাহানের সর্দার মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তার পূত-পবিত্র বিবিগণ বিশেষ করে খাদিজা (রাঃ), আয়েশা (রাঃ) এবং অন্যান্য সাহাবীদের সরাসরি নাম নিয়ে কুলাঙ্গার এই স্যাম বাসিল যে অর্ধনগ্ন ও চরম কূরুচিপূর্ণ চলচ্চিত্র তৈরি করেছে তা দেখলে দূর্বলতম মুসলমানেরও লোম খাড়া হয়ে উঠবে। জঘন্য চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রশমিত না হতেই আবার কিছুদিন পর ফ্রান্সের এক পত্রিকায় রসুল (সাঃ) কে নিয়ে অবমাননাকর কার্টুন ছাপা হয়েছিল। এই একই পত্রিকা সম্প্রতি আবারও মহানবীর (সাঃ) নামে অবমাননাকার ব্যাঙ্গ্যাত্মক চিত্রের প্রদর্শন করেছে এবং ফ্রান্স সরকার তার পৃষ্টপোষকতা করছে। এ যেন কাটা ঘাঁয়ে নুনের ছিটা! কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলো সারা বিশ্ব যখন এই ন্যক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে তখন পশ্চিমা শক্তি গুলো মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার দোহায় দিয়ে এর পক্ষে সাফাই গাচ্ছে। 
আমাদের করণীয় : 
১.    আমাদের উচিৎ এর প্রতিবাদ করা। তা হতে পারে মুখের মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে অথবা প্রতিবাদ সভার মাধ্যমে। সোশাল মিডিয়াতে দেখা যায়, অনেক নাস্তিক, বিধর্মী, এমনকি ফ্রান্সের প্রধান ধর্মযাজকও এই কর্মকান্ডের নিন্দা জানিয়েছে। আমরাও এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ, নিন্দা ও ধিক্কার জানাই।  তবে এ ব্যাপারে  আমাদের অবশ্যই সাবধান থাকতে হবে যাতে প্রতিবাদের নামে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা বা জানমালের ক্ষতি না হয়। তাহলে হিতেবিপরীত হবে। এক জনের কারণে অপরকে শাস্তি দেয়া, অহেতুক সরকারী বা জনগণের জানমালের ক্ষতি করা ইসলামও সমর্থন করে না। 
২.    বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানকে আমরা ফ্রান্সের প্রতি নিন্দাজ্ঞাপন ও চাপ প্রয়োগ করার জন্য উদ্ধুদ্ধ করতে পারি যাতে এই ধরনের ঘটনার পূনঃরাবৃত্তি না হয়। 
৩.    ফ্রান্সের পণ্যকে বর্জন করার যে ডাক দেয়া হয়েছে এটাও জনগণের অধিকার, তারা মনে করলে যে কোন পণ্যই বর্জন করতে পারেন।  
৪.    দূর্বলতম ঈমানের অংশ হিসেবে এই ঘটনাকে অন্তরে অন্তরে ঘৃণা করা। কারণ মহানবী (সাঃ) বলেছেন, যদি তোমরা অন্যায় কাজ দ্যাখো তাহলে শক্তি থাকলে হাতের দ্বারা বন্ধ করে দিবে, তাও না পারলে জবাব দ্বারা প্রতিবাদ করবে, তাও না পারলে মনে মনে ঘৃণা করবে, আর এটা ঈমানের সবচেয়ে দূর্বল স্তর (সহিহ মুসলিম ও তিরমিজী)।  
(লেখক : প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম ২৭ নভেম্বর

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম ২৭ নভেম্বর

১৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০২




আখেরি চাহার শোম্বা  ১৪ অক্টোবর

আখেরি চাহার শোম্বা  ১৪ অক্টোবর

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:৩৩

রোগী দেখতে যাওয়া রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাত

রোগী দেখতে যাওয়া রাসূল (সাঃ)-এর সুন্নাত

০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০


হজযাত্রীদের প্রথম দল মক্কায়

হজযাত্রীদের প্রথম দল মক্কায়

২৭ জুলাই, ২০২০ ০০:২০

এবার বাংলাতেও হবে হজের খুতবা

এবার বাংলাতেও হবে হজের খুতবা

২৬ জুলাই, ২০২০ ০০:৩৬


কুরবানি ও গুরুত্বপুর্ন আমল

কুরবানি ও গুরুত্বপুর্ন আমল

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০

পবিত্র জিলকদ  মাস শুরু আজ

পবিত্র জিলকদ  মাস শুরু আজ

২৩ জুন, ২০২০ ০০:০০


ব্রেকিং নিউজ