খুলা | শনিবার | ০৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ২০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

আমার দেখা মওলানা ভাসানী

এড. গাজী আব্দুল বারী | প্রকাশিত ১৭ নভেম্বর, ২০২০ ০১:৩৩:০০


১৯৬৩ সাল-সময়টা ছিল বর্ষাকাল। তখন আমি জামিরা হাই স্কুলে সবেমাত্র সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। শুনলাম দামোদর ডাবুর মাঠে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। মওলানা ভাসানী নামে এক জননেতা সেখানে বক্তৃতা করবেন। তিনি গরীব কৃষকের কথা বলেন। আর তাঁর বক্তৃতায় মানুষ নাকি জোয়ারের পানির মতো ভেসে যায়-সেই কারনে তাঁর নাম ভাসানী। একথা শুনে তাঁকে দেখার এবং কি রকম তাঁর বক্তৃতা তা শোনার জন্য আমার কিশোর মন ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি এবং আমার সহপাঠী বন্ধু বর্তমান খুলনার বিশিষ্ট সমবায়ী ও রোটারিয়ান শেখ আব্দুল হালিম ছাতা মাতায় দিয়ে কাঁদা ভেঙে ছয়-সাত মাইল পথ পায় হেঁটে চলে গেলাম দামোদর ডাবুর মাঠে। মাঠের দক্ষিণ দিকে মাইক। টিপ টিপ বৃষ্টির ভিতর বিরাট জনসভা। শ্রোতারা ছাতা মাথায় দিয়ে আবার কেউ কেউ রেইন কোট পরে বক্তৃতা শুনছেন। অনেক প্রবীণ নেতা বক্তৃতা করলেন-তাদের কেউ কেউ নাকি পঁচিশ/ত্রিশ বছর হাজতে কাটিয়েছেন। তাদের সকলের নাম মনে নেই, সে সময় রাজনৈতিক নেতাদের নামের সাথে পরিচয়ও ছিলো না। তবে খুলনায় সর্বজন শ্রদ্ধেয় জননেতা এড. আব্দুল জব্বারের গম্ভীর কন্ঠে বক্তৃতা সেদিন প্রথম শুনলাম। আমাদের পাশের গ্রামে তাঁর জন্ম, নামকরা আইনজীবী-ফলে তাঁর নামও শুনেছি বহুবার। কিন্তু যাঁকে দেখতে গিয়েছি সেই মাওলানা ভাসানী সেদিন আসতে পারেননি। ফলে তাঁকে দেখার বাসনা রয়ে গেল অতৃপ্ত।
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস, পাক-ভারত যুদ্ধ চলছে। আমি তখন দৌলতপুর মুহাসীন হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া সাহেবকে অন্য কয়েকজন শিক্ষকের সাথে আলোচনা করতে শুনলাম-মাওলানা ভাসানী মিটিং করবেন খুলনায়। তিনি কি বলেন, শোনা দরকার। স্যারের কথা শুনে আমার মনের সুপ্ত বাসনা আবার জেগে উঠলো। নির্ধারিত সময়ের আগেই খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্কের সভা মঞ্চের নিকটেই যেয়ে বসে পড়লাম। মিটিংয়ের আয়োজন একবারেই সাদামাঠা, পার্কের মাঝখানে যে পাকা সভা মঞ্চ সেখানে কয়েকটি চেয়ার আর একটি মাইক-সামনে চারিদিকে কয়েকটি হর্ণ ঝুলানো। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পার্কের পশ্চিম গেট দিয়ে এক দল সমর্থক পরিবেষ্টিত হয়ে র্মুহুর্মুহু শ্লোগান আর করতালির মধ্যে প্রবেশ করলেন শ্যামল রংয়ের মোটাতাজা এক বৃদ্ধ-মাথায় তালের আঁশের টুপি, আর পরনে একবারে সস্তা দামের একটি লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি। বৃদ্ধকে সকলে যেভাবে সম্মান করে মঞ্চে নিয়ে আসলেন তাতে বুঝতে কষ্ট হলো না যে ইনিই সেই মাওলানা ভাসানী কিন্তু আমার স্বপ্নের সেই মহাপুরুষ যাঁর বক্তৃতায় মানুষ জোয়ারের পানির মতো ভেসে যায়, তাঁর পোশাক পরিচ্ছদ একেবারে গ্রামের আর দশজন সাধারণ কৃষকের মতন-দেখে অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু তারপর যখন তিনি বক্তৃতা শুরু করলেন তখন দেখলাম লোকে তার সম্পর্কে যা বলে তা ষোল আনাই ঠিক। ভারতের সাথে সে সময় চলছে তুমুল যুদ্ধ-সন্ধ্যা নামলেই ব্লাক আউট। সকলের মনে আতঙ্ক-কি হবে যদি ভারত পূর্ব-পাকিস্তানে আক্রমণ করে! মাওলানা ভাসানী ঘোষণা করলেন, আমরা পূর্ব পাকিস্তানের সাত কোটি মানুষ-আমাদের অস্ত্র না থাকতে পারে, তবে আমাদের আছে চৌদ্দ কোটি হাত। দরকার হলে আমরা চৌদ্দ কোটি বাঁশের লাঠি নিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। তবু তোমরা আমাদের স্বাধীনতা হরণ করতে পারব না। মওলানা ভাসানীর বক্তৃতায় সে কি দেশত্ববোধ আর ঐক্যের আহ্বান! যুদ্ধের ভেতর হতাশাপূর্ণ সেই দিনগুলোতে সারা পূর্ব পাকিস্তান ঘুরে তিনি দেশবাসীর মনে যে সাহস যুগিয়েছিলেন তা অতুলনীয়।
তারপর বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেল। আমরা তখন বি,এল, কলেজের ছাত্র। ১৯৬৯ সলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন যেমন গ্র“পের একজন কর্মী হিসেবে দৌলতপুর এলাকায় আমি সে আন্দোলনের একজন সক্রিয় সংগঠক। মওলানা ভাসানী সারা দেশে তখন আইউব বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্কে ন্যাপের বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হলো। সেই জনসভায় বক্তৃতা কররেন ন্যাপ নেতা নূরুল হুদা, কাদের বক্স, হাজী দানেশ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। প্রত্যেকেই অনলবর্ষী বক্তা। মশিউর রহমান এবং পাঞ্জাবের আরিফ ইফতেখার উদ্দিন তাঁদের জ্বালাময়ী বক্তৃতার এক পর্যায়ে পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলী থেকে পদত্যাগ ঘোষণা করলেন এবং সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের পরিচয়পত্রে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিলেন। মওলানা ভাসানী তাঁর বক্তৃতায় নিজেই শ্লোগান তুললেন “জ্বাল-জ্বাল-আগুন জ্বাল”। বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে ঘোষণা দিলেন ডিসি-র বাসা ঘেরাও করা হবে। আর ঘোষণা দিয়েই তিনি মিছিল নিয়ে রওনা হলেন কে, ডি, ঘোষ রোড দিয়ে বাসার দিকে। কিন্তু ডিসি সাহেব বাসায় না থাকায় তিনি মিছিল নিয়ে জেলা স্কুলের মাঠে যেয়ে আর এক সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিয়ে সেদিনের মত কর্মসূচি সমাপ্ত করলেন। মওলানা ভাসানী সেদিন খুলনা থেকেই শুরু করেছিলেন তাঁর ঐতিহাসিক ঘেরাও আন্দোলন। তারপর আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন আইউব খান রাওয়ালপিন্ডিতে গোল টেবিল বৈঠক আহ্বান করলেন। শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে বন্দীদশাতেই প্যারোলে গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মাওলানা ভাসানী তার বিরুদ্ধে ঘোষণা দিলেন- শেখ মুজিব যদি প্যারোলে গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দেন তাহলে তার ফিরতি বিমান ঢাকায় নামতে দেয়া হবে না। ফলে আইউব সরকার শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হলেন।
গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো-কিন্তু আইউব খানের পতন ঠেকানো গেল না। ছাত্রদের ঐতিহাসিক ১১ দফা দাবির ভিত্তিতে যে আন্দলন শুরু হয়েছিলো আইউব খানের মত লৌহ মানবের তাতে পতন ঘটলো, শেখ মুজিব মুক্তি লাভের পর ছাত্রদের ১১ দফা কর্মসূচি বাদ দিয়ে ইতিমধ্যে চাপা পড়ে যাওয়া ৬ দফা কর্মসূচি নিয়ে আবার মাঠে নামলেন এবং নির্বাচনে জয়লাভের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। নির্বাচন পরবর্তীকালে পকিস্তানের ঐক্য ও অখন্ডতা রক্ষার পূর্ব শর্ত হিসেবে ইয়াহিয়া খান জারি করলেন লিগ্যাল ফ্রেম অর্ডার (এল, এফ, ও) এবং ঘোষণা করলেন যে, যে দল এল, এফ,ও মেনে নেবে শুধু তাদেরই নির্বাচনে অংশ গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হবে। শেখ মুজিব এল, এফ,ও মেনে নিয়েই নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন। ভাসানী, ন্যাপ, মুসলিম লীগ, জামায়াতী ইসলামী অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলো। ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ তারিখে জাতীয় ও প্রদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ধার্য হলো। এর ভিতর নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি ঢাকায় পত্র-পত্রিকায় কবর ছাপা হলো- উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক প্লাবনে ১১ জন নিহত। তখন পর্যন্ত দেশের মানুষ জানতে পারিনি যে উপকূলীয় এলাকায় আসলে কি ঘটেছে। পাকিস্তানের রেডিও-টেলিভিশন সেদিন কোন ঘোষণাই দেয়নি বা রাষ্ট্রীয় ভাবে কোনরূপ ত্রাণ তৎপরতার ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। মওলানা ভাসানী তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তার শরীর এতই অসুস্থ যে, সে সময় তার মৃত্যুর গুজব প্রচার হয়ে গিয়েছিলো।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ





মহামায়া

মহামায়া

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০


প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

প্রস্ফুটিত নেতৃত্বের গুচ্ছগাথা

০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০১:৫৩

কেন চেয়ে আছোগো মা!

কেন চেয়ে আছোগো মা!

০৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০৫


মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

মুখাপেক্ষী মানুষ, করোনা ও আমাদের করণীয়

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০১




ব্রেকিং নিউজ

বিজয়ের মাস  ডিসেম্বর

বিজয়ের মাস  ডিসেম্বর

০৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:২৬