খুলনা | শুক্রবার | ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের বিজয় উৎসব

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী | প্রকাশিত ২৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০১:২০:০০

চলছে বিজয়ের মাস। বিজয় শব্দটি প্রত্যেকের মনকেই আন্দোলিত করে। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব হলেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) । তার জীবনেও ধরা দিয়েছে বিজয় নামের সুখপাখি। একজন আমেরিকান অমুসলিম বিজ্ঞানী মাইকেল এইচ হার্ট তার ‘দি হানড্রেডস্’ বইতে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ মহামানবের তালিকা তৈরি করেছেন। তাতে সবার শীর্ষে যার নাম দিয়েছেন তিনি হলেন বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত রহমাতইলি­ল আলামীন মুহাম্মদ (সাঃ)। আসলেই তিনি আদর্শের বিশ্বকোষ, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। কল্যাণ ও আদর্শের সবকিছুই ছিল তার মধ্যে। কারণ মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং আল­াহতায়ালা তার প্রশংসায় বলেছেন, নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী (সূরা কলম:৪)। আর এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আল­াহর রসুলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ (সুরা আহজাব: ২১)। তার কাছে এসে মিলিত হয়েছে আদর্শের সকল ¯্রােতধারা। বিজয় দিবস ও বিজয় উৎসব কিভাবে উৎযাপন করতে হবে তারও সর্বোত্তম নমুনা তিনি বিশ্বমানবের সন্মুখে পেশ করেছেন। 
ডিসেম্বর মাস আমাদের জন্য গৌরবময় ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস। কারণ ১৯৭১ সালে এই মাসের ১৬ তারিখে বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। এ বিজয় মূলত ছিলনা কোন দেশের বিরুদ্ধে বিজয়, বরং তা ছিল অত্যাচার,  জুলুম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিজয়। হাজারো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ মহান বিজয়। গৌরবদীপ্ত ও সাহসী জাতি হিসেবে আমাদের কাছে ১৬ ডিসেম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট একটি দেশ। দেশের একজন সচেতন নাগরিক ও আদর্শ মুসলিম হিসেবে আমাদের জানা দরকার বিজয় দিবসের তাৎপর্য ও তা উৎযাপনের উত্তম পদ্ধতি। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি ইসলামের শিক্ষা হলো, নিজ ভূখন্ড ও মাতৃভূমিকে ভালবাসা। এটাই ছিল প্রিয় নবীজীর (সাঃ)-এর আদর্শ। মহানবী (সাঃ) যখন স্বীয় মাতৃভূমি মক্কা নগরী ত্যাগ করে পাড়ি জমাচ্ছিলেন মদীনার দিকে, তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্র“র বন্যা বয়ে যাচ্ছিল এবং বলেছিলেন, হে মক্কা! আমি তোমাকে ভালবাসি। কাফেররা নির্যাতন করে যদি আমাকে বের করে না দিত, কখনো আমি তোমাকে ত্যাগ করতাম না। হাদীস শরীফে রয়েছে, নবীজী (সাঃ) তার নিজ এলাকা মদিনা নগরীকে খুব ভালবাসতেন। কোন সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকালে মদীনার সীমান্তে উহুদ পাহাড় চোখে পড়লে নবীজীর চেহারাতে আনন্দের আভা ফুটে উঠত এবং তিনি বলতেন, এই উহুদ পাহাড় আমাদেরকে ভালবাসে এবং আমরাও উহুদ পাহাড়কে ভালবাসি (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)।
সুতরাং দেশপ্রেম ও মাতৃভূমির প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা হচ্ছে ইসলামসমর্থিত বিশেষ সহজাত গুণ। সুতরাং দেশের বিজয় দিবস আমাদের গৌরব, আমাদের ইতিহাস। এখন জানার বিষয় হলো, বছরের চাকা ঘুরে যখন ডিসেম্বর মাস আসবে তখন সে দিনগুলোতে কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে আমাদের করণীয় কী? বিজয় সম্পর্কে কুরআনের দু’টি সুরা আমাদের সামনে রয়েছে। একটি সুরাহ ফাতেহা (বিজয়) এবং অপরটি সুরাহ নাসর (সাহায্য)। সুরা নাসর-এ মহান আল­াহ তায়ালা বলেন, “যখন আল­াহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং দলে দলে লোকদেরকে ইসলামে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন স্বীয় পরওয়ারদেগারের প্রশংসার সাথে তাসবীহ পড়–ন এবং আল­াহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন। এখানে তিনটি কর্তব্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে : 
১. এই দিনে বিজয়ের জন্য আল­াহর মহত্ব, পবিত্রতা ও বড়ত্ব বর্ণনা করা। কারণ বিজয় মূলত মহান আল­াহর পক্ষ থেকেই আসে। 
২. আল­াহর শুকরিয়া আদায় করা। 
৩. মহান আল­াহর দরবারে কায়মনোবাক্যে আত্মনিবেদন ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে- বিজয় উৎসব পালনে মহা নবীর আদর্শ কি ছিল? যে মক্কা নগরী থেকে আল­াহর নবী বিতাড়িত হলেন, ১০ বছর পর শত-সহস্র সাহাবায়ে কেরামের বিশাল বহর নিয়ে যখন পবিত্র মক্কা নগরীতে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি গর্ব-অহংকার করেননি। শক্তির প্রদর্শণ করেননি। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেননি। গাছ কর্তন করেননি। শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের প্রতি কোন অত্যাচার করেন নি। এমনকি যারা তার ঘোরতর শত্র“ ছিল তাদরেকেও তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেন। আল­াহর নবী একটি উটের উপর বসা ছিলেন, তাঁর চেহারা ছিল নিম্নগামী। নমনীয়তার কারণে তার মাথা উটের পৃষ্ঠে লেগে যাচ্ছিল। হাদিসে এসছে, সর্বপ্রথম তিনি উম্মে হানীর (রাঃ) ঘরে প্রবেশ করেন। শুকরিয়া স্বরুপ তিনি সেখানে আট রাকাত নফল নামায আদায় করেন। এই নামাযকে বলা হয় ‘বিজয়ের নামায’। এতে বিজয় দিবসে মহান আল­াহর দরবারে শুকর আদায়ে এভাবে নফল নামায পড়া ইসলামের শিক্ষা বলে পরিগণিত হয়। এরপর নবীজী (সাঃ) হারাম শরিফে এসে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, হে মক্কার কাফের স¤প্রদায়! তের বছর ধরে আমার উপর, আমার পরিবারের উপর, আমার সাহাবাদের উপর নির্যাতনের যে স্টীম রোলার চালিয়েছ, এর বিপরীতে আজকে তোমাদের কি মনে হয়, তোমাদের থেকে কি প্রতিশোধ গ্রহণ করব? তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা কঠিন অপরাধী। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, আপনি আমাদের উদার ভাই, উদার সন্তান, আমাদের সাথে উদারতা, মহানুভবতা প্রদর্শন করবেন। এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। তখন আল­াহর নবী (সাঃ) বললেন, হ্যাঁ, আমি আজ তোমাদের সকলের জন্য হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর মত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলাম। এটাই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, অনবদ্যতা ও অনন্যতা। এভাবে মহানুভবতা ও উদারতা প্রদর্শনের দ্বারাই মানুষের মন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে। তখন মক্কার কাফিররা মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলামে দাখিল হয়েছে। এভাবে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে মক্কা বিজয় করে মহানবী সাঃ পুরো বিশ্ববাসীর সামনে বিজয় দিবস পালনের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তিনি প্রকারন্তে এই বার্তা দিলেন যে, আমরা শান্তির পক্ষে। আমরা খুনাখুনি, ত্রাস এবং লুন্ঠনের বিপক্ষে। আমাদেরকে এখান থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার যে, বিজয় দিবস কিভাবে পালন করতে হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ, ঋণী। আমাদের উচিৎ তাদের পরিবারকে সাহায্য করা, তাদের রুহের প্রতি মাগফিরাত কামনা করা এবং তাদের জন্য অন্তর থেকে দোয়া করা। তাদের জন্য এমন কিছু করা দরকার যা আসলেই তাদের চিরস্থায়ী উপকারে আসবে। মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা, রাস্তা-ঘাট-ব্রীজ নির্মাণ, সুপেয় জলাধার বা নলকূপ স্থাপন, অথবা যে কোন উপায়ে দান-খাইরাত করে তার ছাওয়াব দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন, সেই শহীদ ভাই-বোনগণের রূহের শান্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারি।  আসুন তাদের আত্মোত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং শান্তিময় ও সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করি।    
(লেখক: প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।) 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

অশ্লীল আসক্তি থেকে বেঁচে থাকার দোয়া

অশ্লীল আসক্তি থেকে বেঁচে থাকার দোয়া

২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১৩:৩৪


চাকরির জন্য যে দোয়া পড়বেন

চাকরির জন্য যে দোয়া পড়বেন

১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১৪:১০

পবিত্র শবে মেরাজ ১১ মার্চ

পবিত্র শবে মেরাজ ১১ মার্চ

১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১৯:৫৭


অনিদ্রা দূর করতে পড়ুন এই দোয়া

অনিদ্রা দূর করতে পড়ুন এই দোয়া

১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১৩:৫৫



সহযোগিতা করে খোটা দেয়া কবিরা গুনাহ

সহযোগিতা করে খোটা দেয়া কবিরা গুনাহ

০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১৭:১৫





ব্রেকিং নিউজ







মাদক মামলায় এক আসামির ৮ বছরের কারাদণ্ড

মাদক মামলায় এক আসামির ৮ বছরের কারাদণ্ড

২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০০:৩১