খুলনা | বুধবার | ০৩ মার্চ ২০২১ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭ |

Shomoyer Khobor

শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতা কি আপনাকে প্রায় হতাশ করে?

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী | প্রকাশিত ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০০:২৪:০০

অতি চঞ্চল কথাটির সাথে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। সাধারণত: বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কথাটি মূখ্য হিসেবে প্রযোজ্য। অতি চঞ্চল শিশু বললে বুঝায় যে, কোন শিশু ক্রমাগত গতিশীল যার জন্য কোন কাজ মনোযোগ সহকারে করতে ব্যর্থ হওয়া, উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে কতক গুলো কাজে অতিরিক্ত সক্রিয়তা দেখানো এবং শিশুর ঝোঁকের বশে আচরণ করার প্রবনতা ইত্যাদিকে বোঝায়। যে সব কাজে স্থির হয়ে বসে থাকতে হয় (যেমন: শ্রেণি কার্যক্রমে বা খাবার সময়) সেই সব পরিস্থিতিতে শিশু তার  প্রতিক্রিয়া গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। যখন শান্ত থাকার প্রয়োজন তখন শিশু অযথা নড়াচড়া করা বা কথা বলা বন্দ করতে ব্যর্থ হয়। অতিরিক্ত চঞ্চল শিশুদের একটি অন্যতম সমস্যা হলো এরা  বিভিন্ন অপ্রতিরোধ্যমূলক কাজ দ্বারা মা-বাবাকে প্রায় ক্লান্ত করে ফেলে। 
কিভাবে চিনবেন আপনার শিশু অতিরিক্ত চঞ্চল: 
নিম্নের কিছু লক্ষণ থাকলে আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনার শিশু চঞ্চল (১) পড়ার সময় সে প্রায় পা দোলায়, স্থির হয়ে পড়ার বা খাওয়ার টেবিলে বসতে ব্যর্থ হয়। (২) শিশু নির্ধারিত কর্তব্য ও কাজের বাইরে অপ্রাসঙ্গিক কাজের প্রতি মনোযোগ বেশি দিয়ে থাকে। (৩) এরুপ শিশু একটু আগোছালো, বেশি প্রাণবন্ত, একটু বেশি জোরে এবং তুলনা মূলক বেশি কথা বলে। (৪) এরা ঘরের মধ্যে প্রায় নিরর্থক ও উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে ঘোরাফেরা করে। (৫) চঞ্চল শিশু তার ব্যবহার্য জিনিষপত্র বিশেষ করে কাপড় চোপড় বা জুতা খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট করে ফেলে। (৬) অতি চঞ্চল শিশু একটু বোঝা শিখলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মা-বাবার উপর অবাধ্যতামূলক আচরণ প্রদর্শণ করে। (৭) অতি চঞ্চল শিশুর শিক্ষণগত কিছু সমস্যা (গণিত, বই পড়া, লেখায় বা বানানে ভুল) তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। (৮) শ্রেণি কক্ষে এসব শিশু সহপাঠিদের প্রায় সময় বিরক্ত করে এবং শিক্ষকের মনোযোগ ব্যঘাত ঘটাতে বেশ পটু। (৯) এদের বেশির ভাগেরই জ্ঞানীয় ক্ষমতার কিছুটা ত্র“টি দেখা যায়। (৯) অনেকেই কিশোর অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। উলে­খ্য শিশুর বয়সের প্রথম দিকে অনেকের মধ্যে উপরোক্ত লক্ষণ সমূহ থাকতে পারে যা পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু উপরোক্ত লক্ষণ সমূহ শিশুর মধ্যে যদি চুড়ান্ত মাত্রায় এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে বর্তমান থাকে, তবে তাহা শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতার নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতার কারণ: 
শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতার বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান। তার মধ্যে অন্যতম কিছু কারণ হলো- 

(১) মস্তিষ্কজনীত সমস্যা: বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, গুরু মস্তিষ্কের সম্মুখ ভাগের কার্যাবলীর অক্ষমতার সাথে অতি চঞ্চলতার সম্পর্ক বিদ্যমান। 
(২) পরিবেশগত দূষণ: পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদান যেমন: বিভিন্ন প্রকার টক্সিন, বাতাসের সীসা, কার্বণ মনোক্সাইড, নিকোটিন ইত্যাদি শিশুর মাতৃগভে বা প্রাক্ শৈশব কালীন মস্তিষ্ক গঠনে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে যা শিশুর চঞ্চল আচরণ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। 
(৩) খাবারের ক্রিয়া: কিছু কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ (যেমন কৃত্রিম চিনি) খাবারের সাথে মিশায়ে মুখরোচক ও ক্ষতিকর খাবার তৈরী করা হয় যা শিশুর জন্য বেশ পছন্দনীয়, এসব খাবার শিশুর কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়ায় ক্ষতিকারক পরিবর্তন ঘটায় যা শিশুর সক্রিয়তা/ চঞ্চলতার পরিমানকে বৃদ্ধি করে। 
(৪) পিতা মাতার কর্তৃত্বপরাণয় আচরণ: যে সব শিশু একটু চঞ্চল প্রকৃতির- তারা প্রকৃত পক্ষে একটু বদ মেজাজী, সহজে ধৈর্যহীন, শিশু স্বাভাবিক ভাবেই তার বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন সময়ে মা বাবার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। মা-বাবা এ সুযোগে শিশুর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে তার কর্তৃত্বের প্রভাব বিস্তার তথা শিশুর চাহিদার বিপরীতে আচরণ প্রদর্শণ করার মাধ্যমে শিশুর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, ফলে শিশু নিজেকে অপ্রতিরোধ্য মনে করে তার চঞ্চলতাকে আরো বাড়ীয়ে দেয়। 
(৫) বংশগত কারণ: পিতা-মাতার মধ্যে যদি অতিচঞ্চলতার প্রকৃতি বিদ্যমান থাকে তবে তাহা শিশুর জন্মের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে যা শিশুকে অতি চঞ্চল করে তুলতে পারে।
শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতার চিকিৎসা : 
(১) জৈবিক চিকিৎসা: কিছু সংখ্যক স্টিমুলেন্ট বা উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী ঔষধ যেমন: মিথাইল ফেনিডেট বা রিটালিন প্রয়োগ করে অতিরিক্ত চঞ্চলতা চিকিৎসায় ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে এসব ঔষধ সেবনে শিশুর মনোযোগ কেন্দ্রীকরণে উন্নতি এবং চঞ্চলতার অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস ঘটেছে। তবে এসব ঔষধে পাশর্^ প্রতিক্রিয়ার সম্ভবনা থেকে যায়।
(২) করণ শিক্ষণ পদ্ধতির প্রয়োগ: এ পদ্ধতিতে বিদ্যালয় ও আবাস গৃহে শিশু সঠিক আচরণের উপর নজর রাখা হয় এবং উপযুক্ত আচরণ করলে তাকে পুরস্কৃত করা হয়। 
(৩) স্টার্ট চার্ট পদ্ধতি: এ পদ্ধতিতে শিশুর আচরণকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করা হয়। শিশু প্রতিটি অংশের আচরণ সঠিক ভাবে সম্পাদন করলে তাকে ছোট ছোট কাগজে স্টার দেওয়া হয় এবং পুরা কাজটি সঠিক ভাবে সম্পাদন করতে পারলে শিশুর নিকট হতে স্টার সমূহ সংগ্রহ করে শিশুর চাহিদা সম্পন্ন একটি পুরষ্কার প্রদান করা হয়। 
শিশুদের দৌঁড়াদৌঁড়ি বা ছুটাছুটি তাদের স্বাভাবিক কর্মচঞ্চলতা হিসেবে অনেক সময় বিবেচনা করা হয়। যদি চঞ্চলতা স্বাভাবিকতার মাত্রাকে অতিক্রম করে যা নিত্য দিনের কাজ কর্মকে ব্যহত করে, তবে এসব ক্ষেত্রে একজন মনোচিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। 
(লেখক: সহকারি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা।)
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


শিক্ষণীয় কয়েকটি গল্প

শিক্ষণীয় কয়েকটি গল্প

৩১ জানুয়ারী, ২০২১ ০০:৪১






চলে গেলেন এক আদর্শিক পুরুষ

চলে গেলেন এক আদর্শিক পুরুষ

২৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৫:৩৮



স্মৃতিতে ‘ডলি বু’ 

স্মৃতিতে ‘ডলি বু’ 

১২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০



ব্রেকিং নিউজ



অগ্নিঝরা মার্চ

অগ্নিঝরা মার্চ

০৩ মার্চ, ২০২১ ০০:২৮