খুলনা | শনিবার | ১৭ এপ্রিল ২০২১ | ৪ বৈশাখ ১৪২৮ |

Shomoyer Khobor

আপনি কি আপনার আচরণ নিয়ন্ত্রণে প্রায়শ ব্যর্থ হন? কারণ ও প্রতিকার

প্রকাশ চন্দ্র অধিকারী, মনোবিজ্ঞানী | প্রকাশিত ০৩ এপ্রিল, ২০২১ ০১:০৭:০০

কেস নংঃ-১, ছন্দা (ছদ্ম নাম) বয়স ২৪ বছর। বাজার থেকে নিত্য নতুন জিনিস কেনা কাটা তার বেশ পছন্দ। সুযোগ পেলেই সে বিশেষ বিশেষ কাজ বাদ রেখে- এমনকি ধার দেনা করে ও বাজারে কেনা কাটা করতে বেশ আনন্দ বোধ করে। অনিচ্ছা থাকা সত্তে¡ও সে ইচ্ছার নিকট হেরে গিয়ে অনেক সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনা কাটা করতে বাধ্য হয়। সে যে সব জিনিস কেনা কাটা করে, অনেক সময় তার প্রয়োজনীয়তা খুব সামান্যই থেকে যায়। কখনো কখনো সে যে সব জিনিস কেনা কাটা করে, তার অনেকটা সে মানুষকে বিলিয়ে দেয়। মোটের উপর ইচ্ছা থাকা সত্তে¡ ও সে নিত্য নতুন জিনিস ক্রয় করা থেকে বিরত থাকাটা তার জন্য বেশ কষ্ট দায়ক মনে হয়।
কেস নংঃ-২, মহিন (ছদ্ম নাম) বয়স ২৭ বছর। সে কথা বলতে বেশ পটু। যখন সে কথা বলা শুরু করে, তখন তার আগ পাছ কিছুই না ভেবেই কথা বলে ফেলে। প্রায় সময়ই সে গোপন কোন কোন বিষয়কে নিজের মধ্যে রাখতে অক্ষম। কোন বিষয়কে তার মর্মার্থ অনুযায়ী গভীর ভাবে বোঝার ক্ষমতা তার কম। মতের অমিল হলেই সে প্রায়শঃ বাড়ীর জিনিস পত্র ভাংচুর করে এমন কি নিজের ক্ষতি সাধন করে ফেলে।
উপরের দুটি বিষয়কে বিশ্লেষণ করলে আমরা ব্যক্তির আচরণকে আবেগ প্রবনতামূলক আচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা দিতে পারি। মূলতঃ আবেগময় আচরণ হলো সুষ্ঠু বিচার বিশ্লেষণ ব্যতীত এবং ভবিষ্যতের ফলাফলের চিন্তা ব্যতীরেকে কোন পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া করা। জীবনে চলার পথে অহরহঃ আমরা অসংখ্য এরুপ আচরণ করে থাকি যা ইচ্ছা করলে ও অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। এ ধরণের আচরণ আমাদের অনেকের মধ্যে বিদ্যমান যা ইচ্ছা করলে ও ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রায় ক্ষেত্রেই অক্ষম। এরুপ আচরণের ফলে ব্যক্তিকে মাঝে মধ্যে জীবনে বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীনও হতে হয়। 
আবেগপ্রবণ আচরণের লক্ষণ : মানুষ যখন কোন আচরণ সংঘটিত করে, বেশির ভাগ লোকের ক্ষেত্রে সে সব আচরণের উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে। তবে কোন কোন ব্যক্তি, কখনো কখনো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় যেটাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় আবেগপ্রবণ আচরণ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। আবেগপ্রবণ আচরণের লক্ষণ হলো- (১) বিশেষ বিশেষ কাজকে বেশি প্রশ্রয় দেওয়ার মানসিকতাঃ ব্যক্তির মধ্যে কেনা কাটা, খাওয়া দাওয়া, জুয়া খেলা বা অন্য কোন কাজকে বেশি প্রশ্রয় দেয়ার স্বভাব বিদ্যমান থাকে। (২) কোন বিষয়কে বড় করে চিন্তা করাঃ ক্ষুদ্রকে কোন সমস্যাকে বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বড় করে দেখা বা অপেক্ষাকৃত বেশি প্রাধান্য দেওয়া। (৩) ওভার শেয়ারিংঃ ভবিষ্যতের চিন্তা না করে কথা বলা এবং গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অন্যের নিকট শেয়ার করতে বাধ্য হওয়া। (৪) সম্পদ নষ্ট করাঃ রাগের মুহূর্তে নিজের ক্ষতি করা বা ঘরের জিনিস পত্র অথবা অন্য কোন সম্পদ নষ্ট করার প্রবণতা বিদ্যমান। (৫) শারীরিক ক্ষতি সাধনঃ অতিরিক্ত রাগের মুহূর্তে নিজের শারীরিক ক্ষতি সাধন করা। (৬) অহেতুক উৎসাহ দেখানোঃ তুচ্ছ কোন বিষয়ে কেন্দ্র করে বার বার উৎসাহ দেখানোর স্বভাব বিদ্যমান। (৭) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারঃ মোবাইল বা গেম খেলাতে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
শিশুদের মধ্যে আবেগপ্রবণ আচরণের লক্ষণ : (১) সমস্যার গুরুত্বকে উপলব্ধি না করে তাকে উপেক্ষা করা। (২) বড়দের বিভিন্ন বিষয়ের সম্পর্কে কথপকথনের মধ্যে অযথা হস্তক্ষেপ করার প্রবনতা। (৩) শিশু রাগান্বিত হলে অন্য শিশুকে আঘাত করার প্রবনতা বিদ্যমান। (৪) শিশুর যাহা পছন্দ, তাহা অন্যের হলেও চিন্তা না করে বা অন্যকে না বলে গ্রহণ করার মানসিকতা বিদ্যমান। (৫) হতাশার মুহূর্তে চিল­াচিলি­ করা বা হাত-পা ছেড়ে দিয়ে কান্না কাটি করা। 
আবেগপ্রবন আচরণ কখন বিপদজনক : আমাদের অনেকের মধ্যেই আবেগীয় আচরণ প্রতীয়মান হয়। কোন ব্যক্তি যদি খুব কম সংখ্যকবার আবেগীয় আচরণ প্রদর্শন করে, তবে তাহা বিপদজনক নহে। কিন্তু আবেগীয় আচরণ তখনই বিপদজনক হিসেবে বিবেচিত হয়- (১) যখন আবেগীয় আচরণ একটি প্যাটার্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, (২) যখন ব্যক্তি ইচ্ছা করলেও তার আবেগীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, (৩) যখন অন্যান্য কোন মানসিক সমস্যা থেকে থাকে। 
ব্যক্তির আবেগপ্রবণ আচরণের কারণ : (১) মস্তিষ্কের ফ্রন্ট্যাল লোব সমস্যাঃ যাদের মস্তিষ্কের ফ্রন্ট্যাল লোব কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত থাকে, তাদের মধ্যে বিচার বিবেচনা বোধ কম থাকে। এ প্রকার লোক সহজে আবেগীয় আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়। (২) ব্রেইন ক্যানেকটিভিটিঃ ব্রেইন ক্যানেকটিভিটি তিন প্রকার- (!) এনাটোমিক্যাল (!!) ফ্যাংসানাল (!!!) ইফেকটিভ- গবেষণায় দেখা গেছে যে, ব্রেইন কানেকটিভিটির যে কোন নেটওয়ার্কে সমস্যা হলেই মানুষের আচরণের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়। (৩) বংশগত সমস্যাঃ বংশে কোন ব্যক্তির আবেগজনীত আচরণগত সমস্যা থাকলে, তাদের সন্তানদের মধ্যে এ প্রকার সমস্যা দেখা দিতে পারে। (৪) অন্যান্য মানসিক সমস্যার সাথে সহ-সম্পর্কঃ আবেগীয় আচরণের সাথে আরো কিছু মানসিক রোগের গভীর সহ-সম্পর্ক খুজে পাওয়া যায়। যাদের মধ্যে উদ্বেগ জনীত মানসিক সমস্যা, হতাশা বাইপোলার ডির্স-ওয়ার্ডার, পোষ্ট ট্রমেটিক স্ট্রেস ডির্স-ওয়ার্ডার, সমাজ বিরোধী ব্যক্তিত্বের মানসিক সমস্যা, ওডিডি বা পিটিএসডি থাকে তাদের মধ্যে আবেগীয় আচরণ প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
আবেগীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণের উপায়ঃ (১) ব্যক্তিকে সচেতন করা : ব্যক্তির উপলব্ধিতে যদি আবেগীয় আচরণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বোধগম্য সৃষ্টি করা যায়, তবে ব্যক্তির আবেগীয় আচরণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। (২) ধৈর্যের প্রশংসা করাঃ ব্যক্তি/শিশু কখনো যদি আবেগীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হয়, তবে তার কাজের জন্য তকে প্রশংসা করা। (৩) ডিপ ব্রিদিং প্রাকটিসঃ যখন নিজের মধ্যে আবেগীয় আচরণের উদ্ভব হওয়ার সম্ভবনা দেখা দেয়, তখন গভীর নিঃশ^াস নিন এবং ৫ সেকেন্ড আটকে রেখে আবার জোরে ছেড়ে দিন। দেখবেন আপনার ইচ্ছার উপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ এসে গেছে। (৪) অন্যান্য মানসিক রোগের চিকিৎসাঃ ব্যক্তির ভিতর যদি অন্য কোন মানসিক রোগ থেকে থাকে, তার জন্য দক্ষ মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে।
আবেগীয় আচারণ যেমন আপনার জন্য ক্ষতিকর, তেমনি তাহা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এরুপ আচারণ আপনার নিজের জীবনের জন্য, আপনার পরিবারের জন্য ব্যাপক ক্ষতি সাধন করতে পারে। তাই এরুপ সমস্যা দেখা দিলে একজন দক্ষ মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ গ্রহণ করে আপনি সুন্দর জীবনের অধিকারী হতে পারে।

লেখকঃ সহকারি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজ, খুলনা। Email: [email protected] gmail.com)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ









ঠাকুরবাড়ির কন্যা সন্তান

ঠাকুরবাড়ির কন্যা সন্তান

০৮ মার্চ, ২০২১ ০০:০০





ব্রেকিং নিউজ



ছুরিকাঘাতে ফুফাতো ভাইকে হত্যা 

ছুরিকাঘাতে ফুফাতো ভাইকে হত্যা 

১৭ এপ্রিল, ২০২১ ১৭:০৭






করোনামুক্ত হলেন এমপি চুমকি

করোনামুক্ত হলেন এমপি চুমকি

১৭ এপ্রিল, ২০২১ ১৬:১৫