খুলনা | শুক্রবার | ০৭ মে ২০২১ | ২৪ বৈশাখ ১৪২৮ |

Shomoyer Khobor

রোজার শারীরিক উপকারিতা

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন | প্রকাশিত ২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০:০০

রোজা শুধু যে রুহ বা আত্মার উন্নতি সাধন করে তা নয়। বরং দেহের সুস্থতারও বিশেষ সহায়ক। প্রকৃতপক্ষে মাহে রমজান আমাদের জন্য একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ কোর্স, যার মাধ্যমে আমাদের যুগপৎ আত্মিক ও শারীরিক শক্তির উন্নয়ন ঘটে। এক হাদীসে রসূলে কারীম সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম বলেছেন, ‘তোমরা রোযা রাখ তাহলে তোমরা সুস্থ থাকবে (তাবারানী)।’
উক্ত হাদীসের দ্বারা বোঝা যায় রোজার সাথে শারীরিক সুস্থতারও একটি সম্পর্ক রয়েছে। মানব জীবনে রোজার উপকারিতা নিয়ে পৃথিবীতে বিভিন্ন বিজ্ঞানী বিভিন্ন সময়ে গবেষণা করেছেন। আর এরই ধারাবাহিকতায় জাপানি বিজ্ঞানী ইউশিনোরি ওশুমি রোজার উপকারিতার উপর এক গবেষণায় ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কারও পান।
বিজ্ঞানী ইউশিনোরি ওশুমি লক্ষ্য করেন, মানব দেহের কোষ গুলো নিজের ভেতরে একটি বস্তার মতো ঝিলি­ তৈরি করে এবং নিজের আবর্জনা বা ক্ষতিগ্রস্ত উপাদানকে তার ভেতরে আটকে ফেলে। আর লাইসোজম শুধু দেহের আবর্জনা বা ক্ষতিগ্রস্ত উপাদান জমা করে রাখে না। এটা রিসাইক্লিং চেম্বার বা নবায়নযোগ্য শক্তিব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে নতুন কোষ তৈরি করে। এবং কোষেরা নিজেরাই নিজেদের বর্জিতাংশ বা আবর্জনাকে আটকায়, এরপর সেখান থেকে উপকারী উপাদানগুলোকে ছেঁকে আলাদা করে ফেলে। এখানে দেখা যায়, শরীরের কোষগুলো যখন বাইরে থেকে কোনো খাবার না পায় তখন নিজেই নিজের অসুস্থ কোষগুলোকে খেতে শুরু করে। মেডিক্যাল সাইন্সের ভাষায় একে অটোফেজি (Autophagy)  নামকরণ করা হয়।
ব্যাপারটা তুলনা করা যায়, রাস্তার একজন ঝাড়–দারের সাথে। যার কাজ হলো শহরবাসীরা সারাদিন ধরে রাস্তায় যত আবর্জনা ফেলেছে, তা ঝাঁড়– দিয়ে দিয়ে একসাথে জড়ো করা। এরপর সিটি কর্পোরেশনের গাড়িতে করে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসা। তেমনি আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের মাঝেও একটি করে ডাস্টবিন আছে। শরীরের কোষগুলো যখন ব্যস্ত থাকে তখন তারা ডাস্টবিন পরিষ্কার করার সময় পায় না। ফলে কোষগুলোতে অনেক আবর্জনা ও ময়লা জমা হতে থাকে। মানুষ যখন খালি পেটে থাকে, তখন শরীরের কোষগুলো অনেকটা বেকার হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা অলস হয়ে বসে থাকতে পছন্দ করে না, ফলে প্রতিটি কোষ তার ভিতরের আবর্জনা ও ময়লাগুলো পরিষ্কার করার কাজ শুরু করে। এখানে মজার বিষয় হল কোষগুলোর আমাদের মত আবর্জনা ফেলার জায়গা নেই বলে তারা নিজেরাই নিজের আবর্জনা খেয়ে ফেলে।
অর্থাৎ শরীরকে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় দূষণমুক্ত করার পদ্ধতিই হচ্ছে অটোফেজি (Autophagy)।
Autophagy শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ। Auto অর্থ নিজে নিজে, এবং চযধমু অর্থ খাওয়া। সুতরাং, অটোফেজি মানে নিজে নিজেকে খাওয়া। ভয় পাবার কোন কারণ নেই আসল ব্যাপার হল, এটি একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়ায় দেহের ক্ষয়িষ্ণু এবং অপ্রয়োজনীয় কোষাণুগুলো ধ্বংস ও পরিচ্ছন্ন হয়। এ হলো কোষের এক আবর্জনা পরিচ্ছন্নকরণ প্রক্রিয়া! অর্থাৎ যখন শরীরের কোষগুলো বাইরে থেকে কোনো খাবার না পেয়ে নিজেই নিজের অসুস্থ কোষগুলোকে খেতে শুরু করে, তখন তাকে মেডিক্যাল সাইন্সের ভাষায় অটোফেজি (Autophagy) বলা হয়। যেটি বিজ্ঞানের অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একটি পরিভাষা।
অটোফেজি প্রক্রিয়া শরীরে ত্বরান্বিত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হল সবিরাম উপবাস। যখন শরীরের ভিতরে খাবারের সংকট তৈরি হয় তখন অটোফেজি প্রক্রিয়াটি চালু হয়। রোজার রাখার মাধ্যমে খুব সহজেই তা আমরা করতে পারি ঠিক যখন একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে বাইরে থেকে দেহে কোনো খাবার বা পানীয় আসে না। কেউ যদি টানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা উপবাস থাকে তখন তার লিভারে সঞ্চিত খাবার গ্লাইকোলাইসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরে খাবারের চাহিদা পূরণ করে শক্তির জোগান দেয়। এছাড়াও শরীরের বাড়তি চর্বি শরীরের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  অর্থাৎ বাইরের রসদের ওপর নির্ভর না করে দেহ নিজেই নিজের রসদ দিয়ে নিজেকে চালায়।
শরীরের বিভিন্ন কাজ করার জন্য প্রতিনিয়ত প্রোটিন তৈরি হয় এবং প্রোটিনের কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রোটিনের গঠনটি অ্যামিনো অ্যাসিড দ্বারা ত্রিমাত্রিক হতে হয়। যদি ত্রিমাত্রিক না হয় তবে প্রোটিনটি শরীরের জন্য ক্ষতিকারক হবে ও নানা রোগ সৃষ্টি করবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০% প্রোটিন সঠিকভাবে সংশ্লেষ হতে পারে না ফলে এদের ধ্বংস করা, শরীর থেকে বের করে দেওয়া কিংবা অন্য উপায়ে কাজে লাগানো জরুরি। কেননা শরীরে এরা থাকলে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি হবে। সবিরাম উপবাসের ফলে আমাদের দেহ অটোফেজি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এদের খেয়ে ফেলে।
ফলে আমরা বলতে পারি রোজা আমাদের শরীরকে কার্যকরী করে রাখে, দুর্বল অঙ্গাণু থেকে মুক্তি দেয়, ক্যানসার কোষ ধ্বংস করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কমে যায় প্রদাহ (ব্যথা, লাল হওয়া, ফুলে যাওয়া এবং সংক্রমণ), ক্ষতিকর কোলেস্টেরল মাত্রা, লিভারের ফ্যাট, হৃদরোগের ঝুঁকি এবং শরীরের বাড়তি ওজন। সহজেই নিয়ন্ত্রণে থাকে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং অ্যাজমা। রোজার ফলে দেহের অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এতে রক্তনালিতে জমে থাকা চর্বির উপাদানগুলো কমতে থাকে ফলে হার্ট ব্লকের মতো ঝুঁকি কমে যায়। কিডনির কাজ হলো শরীরের বর্জ্য পদার্থগুলো প্রগ্রাব আকারে মূত্রথলিতে প্রেরণ করা। রোজা অবস্থায় কিডনি বিশ্রাম পায়, ফলে এ সময় কিডনি বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। আগের চেয়ে আরো দক্ষভাবে কাজ করতে শুরু করে পাকস্থলী, সবল হয় হজমযন্ত্রও। এছাড়াও রোজা মস্তিষ্কের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মস্তিষ্ককে ক্ষুরধার হতেও সাহায্য করে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, রোজার মাধ্যমে যে মানসিক পরিবর্তন আসে, তাতে মস্তিষ্ক থেকে এক ধরনের নিউরোট্রিফিক ফ্যাক্টর নিসৃত হয়, যা অধিক নিউরন তৈরিতে সাহায্য করে। রোজার কারণে ত্বক বার্ধক্যের প্রভাবমুক্ত হয় এবং ত্বককে দেখায় স্বাস্থ্যজ্জ্বল। অটোফেজি প্রক্রিয়ায় শরীরে তৈরি হয় নাইট্রিক অক্সাইড। এই নাইট্রিক অক্সাইড দেহকোষকে পুনরুজ্জীবিত করে বাড়িয়ে দেয় কোষের আয়ু যা এন্টি এজিং বা বার্ধক্য রোধক হিসেবে কাজ করে। কোষ পুনরুজ্জীবনের ইতিবাচক প্রভাব পুরো শরীরের ওপরই পড়ে যা অন্য অঙ্গের উপকারে আসে। এককথায় বলা যায়, রোজা রোগ প্রতিরোধ করে এবং আমাদের যৌবন ধরে রাখতে সহায়তা করে। এজন্য ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি রোজা রাখো তবে তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ, যদি তোমরা সেটা উপলব্ধি করতে পারো (সুরা বাকারা: ১৮৪)।’
ভেবে অবাক হতে হয় মহান আল­াহ্ তা’য়ালা কত দয়ালু, কত মেহেরবান, তিনি আমাদের উপর রোজা ফরজ করে আমাদের কী উপকারই না করেছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে রোজা রাখার পরেও আমরা কেন এই সমস্ত উপকারিতা অর্জন করতে পারছি না। এর কারণ হচ্ছে, আমাদের অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভাস, ভেজাল খাদ্য গ্রহণ, পরিমিত ঘুম না হওয়া, দুশ্চিন্তা করা এবং রাত জেগে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস যেমন মোবাইল, ল্যাপটপ ও কমপিউটার ব্যবহার করা যা অটোফেজি প্রক্রিয়াকে বাধা প্রদান করে। আমরা সাধারণত অধিক পরিমানে ভাত, রুটি, আলু ও মিষ্টি জাতীয় খাদ্য অর্থাৎ শর্করা (Carbohydrate) জাতীয় খাদ্য, প্রচুর পরিমানে ভাজা-পোড়া এবং ঘন ঘন খাদ্য গ্রহণ করে থাকি। এছাড়াও রান্নার কাজে ভেজাল তেল যেমন সোয়াবিন তেল ব্যবহার করে থাকি। আমরা যদি এই সমস্ত খাদ্যকে বর্জন করে প্রচুর পরিমানে সবুজ শাক-সবজি, বাদাম, ডিম, মাছ, গোসত, ডাবের পানি, খাঁটি ঘি, মাখন ও সরিসার তেল গ্রহণ করি, ঘন ঘন খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকি, সময়মত পরিমত ঘুম ও ব্যায়ামের অভ্যাসের নিয়মানুবর্তিতা গড়ে তুলি, দুশ্চিন্তা পরিহার করি, ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহারে ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করি তাহলে অটোফেজি প্রক্রিয়া ত্বারান্বিত হবে এবং আমরা রোজার সুফল অর্জন করতে সক্ষম হব। ইনশা’আল­াহ।
মহান আল­াহ তা’য়ালা আমাদেরকে রোজার উপকারিতা গুলি সামনে রেখে ভেজালমুক্ত খাদ্যাভাস, পরিমত ঘুম ও দুশ্চিন্তা পরিহারের দ্বারা শারীরিক সুস্থতা অর্জনে তাওফিক দান করুন। আমিন। আল­াহই সর্বজ্ঞ।
(লেখক : বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ