খুলনা | শুক্রবার | ০৭ মে ২০২১ | ২৪ বৈশাখ ১৪২৮ |

Shomoyer Khobor

‘শাহী ফরমান’ কুরআনের মাস রমজান: অর্থ জানা কেন জরুরি

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী | প্রকাশিত ৩০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:৫২:০০

কুরআন একটি আরবি শব্দ। এর বেশ কয়েকটি অর্থ আছে। তার মধ্যে একটি অর্থ হলো, যা বেশি মাত্রায় পড়া হয়। পবিত্র কুরআন এমন একটি কিতাব বা বই যেটা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত এবং সর্বাধিক মাত্রায় পঠিত। কুরআন হলো একটি জীবন্ত মো’জেজা। এটিই পৃথিবীর একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা এখনও অবিকল অবস্থাই আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এটি বিস্ময়কর, মহাবিজ্ঞানময়, অনন্ত রহস্যময় এক কিতাব। কুরআন শুধুমাত্র একটি কিতাব বা বই নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা বা কোড অব লাইফ যা মানুষকে চির সত্যের পথ দেখায়। এর তেলওয়াতের মাধ্যমে আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল­াহর নির্দেশনা সম্পর্কে জানা যায়। কুরআনের শুরুর দিকেই আল­াহ তায়ালা ঘোষণা করেছেনঃ আলীফ-লাম-মিম। এ সেই কিতাব যাতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। পথ প্রদর্শণকারী তাদের জন্য যারা আল­াহকে ভয় করে চলে (সূরা বাকারা: ১-২)। পূর্বের জমানায় কুরআনকে শাহী ফরমান মনে করা হতো, এক একটি আয়াত নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা হতো। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কুরআনের অর্থ বুঝতেন, তার মর্মার্থ উৎঘাটনের চেষ্টা করতেন। শাহী ফরমান মনে করার কারণে কুরআনের প্রভাব তাদের দিলে বসতো, চেহারার রং বদলিয়ে যেত। কিন্তু আজ আমরা কুরআনকে শাহী ফরমান মনে করি না, শুধু মাত্র পড়ার একটি কিতাব বানিয়ে নিয়েছি। সন্দেহ নেই যে, অর্থ না বুঝলেও কুরআন তেলওয়াতের অনেক ছওয়াব রয়েছে। কিন্তু কুরআন নাজিল হয়েছে শুধুমাত্র পড়ার জন্য নয়, বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর জন্য। আমরা যদি কুরআনের অর্থ, আদেশ-নিষেধ বুঝতাম তাহলে আমাদের জীবনই বদলে যেতো। কুরআনে অসংখ্য আয়াত শুরু করা হয়েছে এভাবে, ইয়া আইয়্যুহাল­াজীনা আ-মানু অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ..। হে ঈমানদারগণ বলে সম্মোধন করে তার পরে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। যেমনঃ হে ঈমানদারগণ তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে; হে ঈমানদারগণ তোমাদের ওপর ব্যবসা হালাল করা হয়েছে, আর সুদকে হারাম করা হয়েছে; হে ইমানদারগণ জেনে শুনে সত্য গোপন করো না; হে ঈমানদারগণ মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিও না..ইত্যাদি। কিন্তু আমরা এগুলোর অর্থ না জানার কারণে তা আমাদের জীবনে কোন প্রভাব ফেলে না। ঈমাম সাহেব যখন আরবিতে কুরআনের আয়াত উলে­খ করে দোয়া করেণ তখন মুসল­ীরা চুপ থাকেন, চোখে কোন পানি আসে না। কিন্তু ঈমাম সাহেব আবার যখন সেই আয়াতগুলোই বাংলায় পড়ে দোয়া করেণ তখন সমবেত মুসল­ীগণ হাউ-মাউ করে কাঁদতে থাকেন। কারণ তারা তখন তার অর্থ বুঝতে পারেন। নামাজে ঈমাম সাহেব সাধারণত কুরআনের শেষ দিকের ছোট ছোট সূরাগুলো পড়ে থাকেন। এগুলোর অর্থ কি আমরা সাধারণ মুসল­ীরা বুঝি? বুঝলে ভয়ে দীল কেঁপে উঠত, চোখে পানি চলে আসত। উদাহরণস্বরুপ, নামাযে বহুল পঠিত যিলযাল (ভূমিকম্প), তাকভীর (গুটিয়ে নিস্প্রভ করে ফেলা), ইনফিতার (বিদীর্ণকরা), আল ক্বরিয়াহ (করাঘাতকারী মহাসংকট) প্রভৃতি সূরাতে কেয়ামতের যে ভয়াবহ বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতে কোন মুমিনের অন্তর প্রকম্পিত না হয়ে পারে না। সূরা মাউন (আরআইতাল­াজি) জানেন না এমন মুসলি­ খুব কম আছেন। কিন্তু অর্থ জানেন কয় জন? এই একটি ছোট্ট সূরা মানুষের আখলাককে পরিবর্তন করতে পারে, পারে গরীব ও প্রতিবেশীর প্রতি তার মনোভাবকে পরিবর্তন করতে। মাউন শব্দের বাংলা অর্থ, সামান্য সহযোগিতা, যেমন নিত্য প্রয়োজনীয় কোন জিনিস প্রতিবেশীকে ধার দেয়া। এ প্রসঙ্গে মহান আল­াহ কি বলেন দেখুন- “ আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে বিচার দিবসকে মিথ্যা বলে? সে সেই ব্যক্তি, যে এতিমকে গলা ধাক্কা দেয় এবং মিসকীনকে অন্ন দিতে উৎসাহিত করে না। অতএব দুর্ভোগ সে সব নামাযীর, যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর, যারা তা লোক দেখানোর জন্য করে এবং নিত্য ব্যবহার্য বস্তু অন্যকে দেয় না (সূরা মাউন:১-৭)”। কি চিত্তাকর্ষক বাণী তাই না? এই সূরাতে এতিম ও গরিবদের সাহায্য করার পাশাপাশি নিত্য ব্যবহৃত জিনিস, যেমন পানি, লবণ, কাস্তে, কোদাল, বাসনপত্র ইত্যাদি প্রয়োজনের সময় প্রতিবেশীকে ধার দেবার উৎসাহ দেয়া হয়েছে। আসলেই, আমরা যদি অর্থ জেনে কুরআন পড়ি তাহলে তা আমাদের জীবনকে বদলিয়ে দিতে পারে। সংশোধন হতে পারে আমাদের খারাপ চরিত্র। কুরআনের অর্থ কেন জানা দরকার তা বুঝানোর জন্য আমি একটি ঘটনা প্রায়ই বলে থাকি। অনেক দিন আগের কথা। আমি একবার ক্লাসের এক ছাত্রকে জিজ্ঞাস করলাম, তোমার নাম কি? সে বলল, মুতাফফিফীন। আমি বললাম, বেশ সুন্দর নাম তো, তা এর অর্থ কি? সে বলল, আমি এর প্রকৃত অর্থ জানিনে, তবে এই নামে কুরআনে একটি সূরা আছে, আমার আব্বু এই নামটি রেখেছেন। আমিও বললাম, ভেরি গুড (খুব ভাল)। আমি আসলে না বুঝেই বলেছিলাম, ভেরি গুড। অনেক দিন পর যখন এই সূরাটির অর্থ আমি বাংলায় দেখলাম তখন তো আমার চোখ ছানাবড়া। কয়েকবার বললাম, আসতাগফিরুল­াহ (আমি আল­াহর কাছে মাফ চাচ্ছি)। আসলে মুতাফফিফীন শব্দের বাংলা অর্থ প্রতারক বা যে ওজনে কম দেয়। মুতাফফিফীনরা ধ্বংস হোক, এই কথা পবিত্র কুরআনে মহান আল­াহ রব্বুল আলামীন ঘোষণা করে এরশাদ করেছেন, “যারা মাপে কম করে, তাদের জন্যে দুর্ভোগ, যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে। সেই মহা দিবসে, যে দিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্ব পালনকর্তার সামনে। এটা কিছুতেই উচিত নয়, নিশ্চয় পাপাচারীদের আমলনামা সিজ্জীনে থাকবে (সূরা মুতাফফিফীন:১-৭)”। এখন তাহলে আমার মত পাঠক বুঝতে পেরেছেন এই ‘মুতাফফিফীন’ নামটা কত মারাত্মক। অনেক ব্যবসায়ী মুসল­ী আছেন যারা এই সূরা নামাজে শুনছেন, আবার ঠিক একটু পরেই দোকানে গিয়ে মাপে কম দিচ্ছেন। তারা যদি এই সূরার অর্থ মাতৃভাষা বাংলায় বুঝতেন তাহলে হয়তবা তারা মাপে কম দেয়া ছেড়ে দিতেন। প্রকৃত পক্ষেই আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় কুরআন বুঝা এবং জীবনে তার বাস্তবায়ন করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। চলছে কুরআনের মাস রমজান। রমজান বছরের মধ্যে সবচেয়ে বরকতময় ও দামী মাস। আর এই দাম পবিত্র কুরআনের কারণে। কারণ, এই রমজান মাসেই মহা গ্রন্থ আল কুরআন নাজিল হয়। আল­াহ তায়ালার ঘোষণা, রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য পথ যাত্রীদের জন্য স্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী (বাকারা: ১৮৫)। শুধু তাই নয়, অন্যান্য বড় বড় আসমানী কিতাবও এই মাসেই নাজিল হয়। বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর সহীফাসমূহ এই মাসের ১ অথবা ৩ তারিখে নাজিল হয়। হযরত দাউদ (আঃ) কে ১২ অথবা ১৮ রমজান যাবূর কিতাব দেওয়া হয়। হযরত মুসা (আঃ) কে ৬ রমজান তাওরাত কিতাব দেওয়া হয়। হযরত ঈসা (আঃ) কে ১২ অথবা ১৩ রমজান ইঞ্জীল কিতাব দেওয়া হয়। এতে বোঝা যায় যে, আল­াহ পাকের কিতাবের সাথে এই মাসের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তাই আসুন, ‘শাহী ফরমান’ কুরআনের এই মাসে আমরা বেশি বেশি কুরআন তেলওয়াতের সাথে সাথে তার অর্থও বুঝার চেষ্টা করি। 
(লেখক: মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ



রোজার শারীরিক উপকারিতা

রোজার শারীরিক উপকারিতা

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০











ব্রেকিং নিউজ