খুলনা | শুক্রবার | ২৬ জুলাই ২০২৪ | ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

মহানবীর মি’রাজ: মহাকাশ বিজ্ঞানীদের জন্য চ্যালেঞ্জ

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী |
১২:৫৯ এ.এম | ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪


বর্তমান বিজ্ঞান যেখানে প্রথম আকাশের খবরই জানে না, সেখানে মুহাম্মদ (সাঃ) সপ্ত আকাশে ঘুরে এসেছেন আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের ভাষ্যমতে, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) হিজরতের বছর খানেক আগে কোন এক রাতে পবিত্র মক্কা নগরী থেকে প্রথমে ফিলিস্তিনের বায়তুল মোকাদ্দস মসজিদ, তারপর সেখান থেকে উর্ধ্বাকাশে সপ্তম আসমান পর্যন্ত পরিভ্রমণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটা মিরাজ নামে পরিচিত। এটাকে বলা যায় রাতের বেলায় মহানবীর মহাকাশ ভ্রমণ। বিশ্বের ইতিহাসে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ইসরা ও মিরাজ।
মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের হেদায়তের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রসূল প্রেরণ করেছেন। প্রত্যেক নবীকেই আল্লাহপাক বিশেষ বিশেষ অলৌকিক মু’জেজা দান করেছেন, যা ওই সময়ের জন্য বিস্ময়কর। শ্রেষ্ঠ নবী ও শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-কেও আল্লাহ তায়ালা অনেক মু’জেজা দান করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হল মহানবীর মি’রাজ বা বিস্ময়কর মহাকাশ ভ্রমণ। মি’রাজ শুধু বর্তমান বিজ্ঞানীদের জন্যই নয়, অনাগত বিজ্ঞানীদেরও এক চ্যালেঞ্জ ও ইসলামের সত্যতার অকাট্য প্রমাণ। 
বিস্ময়কর মহাকাশ ভ্রমণ: 
স্বপ্নে নয়, নবী (সাঃ)-এর ইসরা ও সিরাজ স্ব-শরীরে জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল। কুরআন ও হাদিসে তার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত-যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই” (বনী ইসরাঈল:১ )। মহাকাশ ভ্রমণকালে তিনি মহান আল্লাহর সঙ্গে কোনরূপ দোভাষী ছাড়াই সরাসরি (পর্দার ব্যবধান থেকে) কথা বলেন। এছাড়াও তিনি সমস্ত ফেরেশতাদের সর্দার জীবরাঈল (আঃ) কে স্বচক্ষে দেখেন।  এর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা কুরআনে এভাবে দেয়া হয়েছে: “তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি; এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। কুরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়। তাঁকে শিক্ষা দান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা, সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল। উর্ধ্ব দিগন্তে, অতঃপর নিকটবর্তী হল ও ঝুলে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম। তখন আল্লাহ তাঁর দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করবার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। রসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে? নিশ্চয় সে তাকে (জীবরাঈল আঃ কে) আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুলমুন্তাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার, তদ্দারা আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয় নি এবং সীমালঙ্ঘনও করেনি। নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে” (সূরা নাজ্ম: ১-১৮)। সহীহ হাদীসের আলোকে জানা যায়, মহানবী (সাঃ) মিরাজের রাতে কাবা শরিফের চত্ত¡রে (হাতিমে) অথবা কারও কারও মতে, উম্মে হানির গৃহে শায়িত ও নিদ্রিত ছিলেন। এমন সময় ফেরেশতা জিব্রাইল (আঃ) সেখানে এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগালেন, অজু করালেন, সিনা চাক করলেন এবং ‘বোরাকে’ চড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাস পৌঁছালেন। সেখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সকল নবীর ইমাম হিসেবে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন। এরপর তিনি আবার বোরাকে চড়ে সপ্তাকাশ পরিভ্রমণ করলেন এবং সেখান থেকে সপ্তম আকাশের ওপর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ নামক স্থানে পৌঁছালেন, যেখানে ফেরেশতা জিব্রাইল (আঃ) থেমে গেলেন এবং নবী করিম (সাঃ) এরপর ‘রফরফে’ চড়ে ‘বায়তুল মামুরে’ উপনীত হলেন। এই বায়তুল মা’মুরে দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের বারবার প্রবেশ করার সুযোগ আসবে না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্বচক্ষে জান্নাত ও দোজখ দেখেন। সে সময় তাঁর উম্মতের জন্য প্রথমে ৫০ ওয়াক্তের নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ হয়। এরপর তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং বোরাকে সওয়ার হয়ে অন্ধকার থাকতেই মক্কায় পৌঁছে যান।
ইসলামের সত্যতার অকাট্য প্রমাণ: 
মিরাজ শেষে মুহাম্মদ (সাঃ) যখন পরের দিন এই কথা বললেন যে, গতকাল তিনি এক রাতের মধ্যে মক্কা থেকে জেরুজালেমের বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত এবং পরে সপ্ত আকাশ ভ্রমণ করেছেন, তখন মক্কার কাফির মুশরিকরা তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করল। তাকে আটকানোর জন্য তারা বায়তুল মোকাদ্দাস সম্পর্কে খুঁটি-নাটি প্রশ্ন করল, যা কোন মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু মুহাম্মদ (সাঃ) তো কোন সাধারণ মানুষ ছিলেন না; তিনি ছিলেন আল­াহর সত্য নবী। মহান আল্লাহতায়ালা তার এই বিপদের মুহূর্তে সাহায্য করলেন এবং বায়তুল মোকাদ্দাসকে তার সামনে তুলে ধরলেন। এর ফলে মহানবী (সাঃ) বায়তুল মোকাদ্দাসের হুবুহু বর্ণনা দিয়ে দিলেন। এ প্রসঙ্গে এক হাদিসে রসূলুল্লাহ বলেন, “যখন কুরাইশরা মিরাজের ঘটনায় আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে লাগলো, তখন আমি হিজরে দাঁড়ালাম। আল্লাহ তায়ালা বায়তুল মুকাদ্দাস কে আমার সামনে উন্মুক্ত করে দিলেন। আমি তা দেখে দেখে তার সকল চিহ্ন তাদের বলে দিতে লাগলাম” (সহীহ বুখারী)। এই ঘটনা স্পষ্ট প্রমান করে যে মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর প্রকৃত রসূল ছিলেন এবং তার প্রদর্শিত ইসলাম অকাট্যভাবে বিশ্ব প্রতিপালকের তরফ থেকে এসেছে। কারণ ওই জমানায় মক্কা থেকে ২০০০ কিলোমিটারেরও বেশী দূরত্বে অবস্থিত বায়তুল মোকাদ্দাসের হুবহু বর্ণনা কোন মানুষ বা সৃষ্টির পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়।  বর্তমানে বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে মানুষ কতটুকু মহাকাশ ভ্রমণ করেছে? শুধুমাত্র ছোট্ট একটি চাঁদে মানুষ যেতে সক্ষম হয়েছে। বাকি রয়েছে, কোটি কোটি অগণিত নক্ষত্র মন্ডল। এক এক নক্ষত্র মন্ডলে আবার আছে কোটি কোটি নক্ষত্র বা তাঁরা। অথচ, সমস্ত তাঁরা বা নক্ষত্র মন্ডল আছে প্রথম আকাশের নিচে। এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে, “তিনি সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন...আমি সর্বনিম্ন আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুসজ্জিত করেছি (সূরা মুলক:৩-৫)। আল্লাহর অলৌকিক নিদর্শন ও কুদরত প্রত্যক্ষ করানো, ঊর্ধ্বলোক সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান প্রদান, সৃৃষ্টিজগতের রহস্য উন্মোচন ও স্বচক্ষে বেহেশত-দোজখ দেখানো ছিল মিরাজের অন্যতম উদ্দেশ্য। মি’রাজ বর্তমান ও ভবিষ্যত মহাকাশ বিজ্ঞানীদের জন্য এক চ্যালেঞ্জ ও ইসলামের সত্যতার অকাট্য প্রমাণ। 
(লেখক: মৎস্য-বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, পোস্ট-ডক্টরাল ভিজিটিং ফেলো, সিডনী)

প্রিন্ট

আরও সংবাদ