খুলনা | রবিবার | ১৪ এপ্রিল ২০২৪ | ৩০ চৈত্র ১৪৩০

বন্ধুর জন্য করণীয়

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:১৩ এ.এম | ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪


ধরিত্রীতে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের যেমন খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান প্রয়োজন, তেমনি সমাজে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সৌহার্দ্য ও স¤প্রীতির। কেননা মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে চলা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আর এই সমাজবদ্ধতার প্রশ্নে মানুষ একে অপরের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। সঠিকভাবে যথার্থ বন্ধু নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে মানুষ তার সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনকে সুষ্ঠু ও নিরাপদ করে তোলে। এই বন্ধুত্বের ব্যাপারেও ইসলামের রয়েছে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি।
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, বন্ধু অবশ্যই বানাও। কারণ, বন্ধু দুনিয়াতেও উপকারে আসে এবং আখেরাতেও। (এহইয়াউ উলুমিদ্দীন)
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এক কবিতায় বন্ধুত্বের সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘সেই তোমার সত্যিকার বন্ধু যে তোমার সঙ্গে থাকে, তোমার কল্যাণের জন্য নিজের ক্ষতি করে। দৈব-দুর্বিপাকে পড়ে তোমার অবস্থা শোচনীয় হলে সে নিজের সুখ বির্সজন দিয়ে তোমাকে সুখ দান করে।’
বন্ধু নির্বাচনে কেমন ব্যক্তি অগ্রাধিকার পাবে, এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতে গিয়ে পবিত্র কোরআনে আরো সুস্পষ্ট ঘোষণা এসেছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।’ (সুরা তাওবা : ১১৯)
অন্যদিকে রসূলাল্লাহ্ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশনা প্রদান করে বলেছেন, ‘মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে সঙ্গী নির্বাচন করবে না।’ (তিরমিজি)
বন্ধু মনোনয়নে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘নির্বোধের বন্ধুত্ব থেকে দূরে থাকো। কারণ সে উপকার করতে চাইলেও তার দ্বারা তোমার ক্ষতি হয়ে যাবে। ’ (দিওয়ানে আলী)
হযরত ইমাম জাফর আস-সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, ‘পাঁচ ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করা সমীচীন নয়। তা হলো-মিথ্যাবাদী, নির্বোধ, ভীরু, পাপাচারী ও কৃপণ ব্যক্তি। ’
হযরত আউযায়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘বন্ধু বন্ধুর জন্য তালির (কাপড়ের টুকরার) ন্যায়, যদি আসল কাপড়ের মত না হয়, তো অশোভনীয় করে দেয়’। (বন্ধু ও বন্ধুত্ব)
এজন্য আমাদের উচিত হবে যে অসৎ কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করা। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন সৎ, বুদ্ধিমান, মেধাবী, ধৈর্যশীল, চরিত্রবান, ধার্মিক, সুন্দর মনের অধিকারী, পরোপকারী ও নিরলস মানুষের সাথেই বন্ধুত্ব করা উচিত এবং সারা জীবন ঐ বন্ধুত্ব অটুট রাখার জন্য চেষ্টা করাও উচিত।
ইমাম গাযযালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ‘এহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ এ বন্ধুত্বের আট’টি হকের কথা লিখেছেন, নিম্নে সংক্ষিপ্ত আকারে তা বর্ণনা করা হলঃ
প্রথম হক হচ্ছে, তোমার ধন-সম্পদে। ধন-সম্পদ দ্বারা বন্ধু-বান্ধবের সাথে সদ্ব্যবহার করার তিনটি স্তর রয়েছে।
সর্বনিম্নস্তর হচ্ছে বন্ধুকে খাদেম ও পরিচারক মনে করা এবং নিজের বাড়তি সম্পদের মাধ্যমে তার দেখাশুনা করা। সুতরাং যখন বন্ধুর প্রয়োজন দেখা দেয় এবং তোমার কাছে অতিরিক্ত ধন-সম্পদ থাকে, তখন চাওয়া ছাড়াই তা তার হাতে সমর্পণ কর। এমতাবস্থায় যদি চাওয়ার দরকার হয়, তবে ভ্রাতৃত্বের কর্তব্য পালনে তুমি ত্র“টি করেছ বলতে হবে।
দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে বন্ধুকে নিজের স্থলাভিষিক্ত মনে করা এবং ধন-সম্পদে তার শরীকানা পছন্দ করা; এমন কি, নিজের ধন-সম্পদ আধাআধি বন্টন করে দেয়া। হযরত হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পূর্র্বতীগণ বন্ধুর সাথে এরূপ ব্যবহারই করতেন। তাঁরা একটি চাদর পর্যন্ত দ্বিখন্ডিত করে অর্ধেক নিজে রাখতেন এবং অর্ধেক বন্ধুকে দিয়ে দিতেন।
তৃতীয় ও সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে বন্ধুকে নিজের উপর অগ্রাধিকার দেয়া এবং তার প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের অগ্রে স্থান দেয়া, এটা সিদ্দীকগণের স্তর। এ স্তরের পূর্ণতা হচ্ছে অপরকে নিজের উপর অগ্রাধিকার দেয়া। 
দ্বিতীয় হক হচ্ছে, সওয়াল করার পূর্বে তার অভাব দূর করা এবং নিজের বিশেষ প্রয়োজনের অগ্রাধিকার দিয়ে তাকে সাহায্য করা।
তৃতীয় হক হচ্ছে, কয়েকটি স্থানে নিশ্চুপ থাকা এবং মুখ না খোলা ।
প্রথম, তার দোষ তার সামনে বা পেছনে বর্ণনা না করা; বরং দোষত্র“টি সম্পর্কে না জানার ভান করা।
দ্বিতীয়, তার কথা খন্ডন না করা।
তৃতীয়, তার অবস্থা অন্বেষণ না করা। তাকে পথিমধ্যে অথবা কোন কাজে  দেখা গেলে এবং সে কোথা থেকে আসছে এবং কোথায় যাচ্ছে- এসব বিষয় নিজে বর্ণনা না করলে তাকে জিজ্ঞেস করার ব্যাপারে চুপ থাকবে। কেননা, মাঝে মাঝে তা বর্ণনা করা তার পক্ষে কঠিন হতে পারে অথবা ইচ্ছা পূর্বক মিথ্যার আশ্রয় নিতে হতে পারে।
চতুর্থ, বন্ধু যেসব গোপন কথা তোমার কাছে কখনও বলবে না। এমন কি, নিজের অথবা তার বন্ধুর কাছেও না। বন্ধুত্ব শেষ হয়ে গেলেও তার গোপন কথা ফাঁস করা আন্তরিক ভ্রষ্টতার লক্ষণ।
পঞ্চম, বন্ধুর আপনজন, আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার-পরিজনকে তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকবে।
ষষ্ঠ, কেউ তাকে গালি দিলে তার সামনে সেই গালির কথা বলবে না।
চতুর্থ হক হচ্ছে, মুখে কথা বলা। কেননা, বন্ধুর সামনে মন্দ কথা বলা থেকে বিরত থাকা যেমন ভ্রাতৃত্বের দাবি, তেমনি বন্ধুর পছন্দনীয় কথাবার্তা তার সামনে বর্ণনা তার দাবি।
পঞ্চম হক হচ্ছে, বন্ধুর ভুল-ত্র“টি ও অপরাধ মার্জনা করা।
ষষ্ঠ হক হচ্ছে, বন্ধুর জন্যে তার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে এমন দোয়া করা, যা নিজের জন্যে পছন্দ করা হয়। অনুরূপভাবে তার পরিবার ও আত্মীয়দের জন্যে দোয়া করা। নিজের জন্যে যেমন দোয়া করবে, বন্ধুর জন্যেও তেমনি দোয়া করবে।
সপ্তম হক হচ্ছে, ‘ওফা’ (বন্ধুত্ব রক্ষাকরণ) ও এখলাস। ওফার অর্থ হল, বন্ধুর জীবদ্দশা পর্যন্ত বন্ধুত্বের উপর দৃঢ় থাকা এবং তার মৃত্যুর পর তার সন্তান-সন্ততি, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে বন্ধুসুলভ ব্যবহার অব্যাহত রাখা।
অষ্টম হক হচ্ছে, বন্ধুকে কষ্ট না দেয়া। অর্থাৎ, তার উপর এমন কোন বোঝা চাপাবে না এবং তাকে এমন কোন ফরমায়েশ দেবে না, যাতে তার কষ্ট হয়।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সকলকে ভালো বন্ধু নির্বাচন এবং বন্ধুর হক বুঝে একে অপরের কল্যাণকামী হওয়ার তৌফিক দান করুন, আমীন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
সংকলক : লেখক ও গবেষক।

প্রিন্ট