খুলনা | রবিবার | ১৪ এপ্রিল ২০২৪ | ৩০ চৈত্র ১৪৩০

মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ, নানা অনুষ্ঠান

একুশ বাঙালি জাতির অহঙ্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক |
১২:৪৭ এ.এম | ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪


আজ মহান শহিদ দিবস। একই সঙ্গে দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও পালিত হবে বিশ্বজুড়ে। জাতীয় জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন এটি। 
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর থেকেই পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিকে তাদের অধীন করে রাখার পরিকল্পনা করেছিল। এর অংশ হিসেবে প্রথমেই তারা বাঙালিদের ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রভাষা-এ বাস্তব সত্য অস্বীকার করে বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল তারা। উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষা কেড়ে নিয়ে বাঙালির জাতিসত্তাকে পঙ্গু করে দেয়া। কিন্তু এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে বাঙালি। শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এরই একপর্যায়ে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্র“য়ারি বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হয় গুলি। শহিদ হন বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারসহ অনেকে।
৫২’র একুশে ফেব্র“য়ারি বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। শহিদদের রক্ত তাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে প্রেরণা জোগায়। এর পরের ইতিহাস পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের।
’৫৪-র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভ এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাঙালির স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
বাঙালি মুক্ত হয় ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাই একুশ আমাদের জাতীয় জীবনে এক অন্তহীন প্রেরণার উৎস।
খুলনা প্রশাসন : দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচির আলোকে খুলনায় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথম প্রহরে মঙ্গলবার দিবাগত ১২টা ১ মিনিটে খুলনা শহিদ হাদিস পার্কে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ এবং শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনার মাধ্যমে শহিদ দিবসের কর্মসূচির সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
বাদ জোহর বা সুবিধামত সময়ে সকল মসজিদে শহিদদের রুহের মাগফিরাত, দেশের শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া এবং মন্দির, গীর্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে। বিকেল চারটায় বয়রাস্থ বিভাগীয় গণ-গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে অমর একুশের বইমেলার মঞ্চে বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন বিষয়ক আলোচনা সভা, সন্ধ্যা ছয়টায় শহিদ হাদিস পার্কে খুলনা জেলা তথ্য অফিসের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও একুশের পোস্টার প্রদর্শনী। 
শহিদ হাদিস পার্কে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণ। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে স্থানীয় পত্রিকাগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। 
এছাড়া গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে নির্মিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালে মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন : দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।  কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দিবসের প্রথম প্রহর ১২টা ১ মিনিটে শহিদ হাদিস পার্কস্থ শহিদ মিনারে সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক-এর নেতৃত্বে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নগর ভবনসহ কমিউনিটি সেন্টার ও কেসিসি পরিচালিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা এবং শহিদ হাদিস পার্কসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়সমূহ বাংলা বর্ণমালা ও ফেস্টুন দ্বারা সজ্জিত করা হবে। 
সকাল ৯টায় নগর ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং শিশুদের চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্লে থেকে নার্সারী ‘ক’ বিভাগ, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি ‘খ’ বিভাগ এবং তৃতীয় শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ‘গ’ বিভাগে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। ‘ক’ বিভাগের জন্য বিষয় উম্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং ‘খ’ বিভাগের জন্য ‘গ্রামবাংলা’ ও ‘গ’ বিভাগের জন্য ‘একুশের ভাষা আন্দোলন’ বিষয়ের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। 
এছাড়া ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ‘ঘ’ বিভাগে ‘একুশের চেতনা ও বর্তমান বাংলাদেশ’ এবং ৯ম ও ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ‘ঙ’ বিভাগে ‘জাতীয় জীবনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অবদান’ বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। 
সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করবেন। 
খুলনা বিশ^বিদ্যালয় : দিবস পালন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে শহিদ তাজউদ্দীন আহমেদ ভবনের সম্মুখে কালোব্যাজ ধারণ, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালোপতাকা উত্তোলন, এর পরপরই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ, সকাল ৯টায় সাংবাদিক লিয়াকত আলী মিলনায়তনে আলোচনা সভা, বাদ যোহর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দোয়া মাহফিল ও কেন্দ্রীয় মন্দিরে প্রার্থনা, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে প্রদীপ প্রজ্বলন। এছাড়াও বিকেল ৪টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মুক্তমঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : দিবস পালন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ১১টায় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রথম প্রহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থী কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ কারা হয়। 
২১ ফেব্র“য়ারি সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পতাকা উত্তোলন (জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন), সকাল ৯টায় শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ, সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়ামে আলোচনা সভা, আসর বাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ভাষা শহিদগণের রুহের মাগফিরাত এবং দেশের শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া। 
মহানগর আ’লীগ: দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ০১ মিনিটে শহিদ হাদিস পার্কের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ২১ ফেব্র“য়ারি সকাল ৭টায় দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, প্রভাত ফেরি। প্রভাত ফেরী শেষে দলীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা। 
জেলা আ’লীগ : দিবস উপলক্ষে কর্মসূচির মধ্য রয়েছে একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১মিনিটে নগরীর শহিদ হাদিস পার্কে অবস্থিত শহিদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। একুশে ফেব্র“য়ারি ভোর সাড়ে ৬টায় সংগঠনের জেলা কার্যালয়সহ জেলার আওতাধীন সংগঠনের সকল শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় কালো ব্যাজ ধারণ, বিকেল সাড়ে ৩টায় দলীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা। 
খুলনা বিএনপি: দিবস উপলক্ষে একুশের প্রথম প্রহরে (১২.০১ মিনিটে) শহিদ হাদিস পার্কের শহিদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে নেতা-কর্মীরা।
ভোর ৬টায় কেডি ঘোষ রোডস্থ দলের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন, বুধবার বেলা ১১টায় দলীয় কার্যালয়ে ভাষা শহিদদের স্মরনে আলোচনা সভা ও দোয়া । 
খুলনা বিএনপি’র সাবেক নেতৃবন্দ: দিবস উপলক্ষে বুধবার সকালে নগরীর শহিদ হাদিস পার্কের শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।  কর্মসূচি সফলের লক্ষ্যে খুলনা বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল নেতা-কর্মীদের  সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে নগরীর স্যার ইকবাল রোডস্থ গোলকমনি শিশু পার্কে উপস্থিত হওয়ার আহŸান জানানো হয়।
খুলনা প্রেসক্লাব: দিবস উপলক্ষে কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে প্রথম প্রহরে শহিদ হাদিস পার্কের শহিদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় ক্লাবের হুমায়ুন কবীর বালু মিলনায়তনে আলোচনা সভা।
মহানগর নগর যুবলীগ : দিবস উপলক্ষে কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে প্রথম প্রহরে শহিদ হাদিস পার্কের শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বুধবার সকাল সাতটায় দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ