খুলনা | রবিবার | ১৪ এপ্রিল ২০২৪ | ৩০ চৈত্র ১৪৩০

সত্য বাবুর কাছে অভিযোগ দিলাম, উত্তর পেলাম না

এ্যাডভোকেট এম মাফতুন আহমেদ |
০১:৩৮ এ.এম | ২০ মার্চ ২০২৪


আমার জন্মের চার বছর পর। অর্থাৎ ১৯৬৮ সাল। একটি জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা। নাম “এতটুকু আশা”। গানটি’র শিরোনাম ছিল ‘তুমি কি দেখেছো কভু’। গায়ক মরমী কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার। আজ তিনি মরহুম। এই সিনেমাটি’তে তিনি গেয়েছিলেন.....
“প্রতিদিন কত খবর আসে যে কাগজের পাতা ভরে
জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে
কেউ তো জানেনা প্রাণের আকুতি
বারে বারে সে কি চায়
স্বার্থের টানে প্রিয়জন কেন
দূরে সরে চলে যায়”..।
আসলে প্রতিদিন অনেক খবর আসে; কাগজের পাতা ভরে। চোখ বুলিয়ে পড়ি আর দেখি। মগজে সঠিক উত্তর মেলে না। হিসাবের অংকে মিল খায় না। তবে এতোটুকু বুঝি এসব খবর রয়ে যায় বড় সাহেবের অগোচরে। এক সময় অসৎ দুনীর্তিবাজদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোন অভিযোগ বা পত্রিকার খবর প্রকাশিত হলে সত্য বাবুরা নড়েচড়ে বসতেন। দ্রুত ব্যবস্থা নিতেন। এ সবের এখন আর কোন বালাই নেই।
আইনগত বাধা যাই থাকুক না কেন জনমনে বদ্ধমূল ধারণা এখন আর পেপার-পত্রিকায় রিপোর্ট দিয়ে কোন কাজ হয় না। তার মানে কোন মেধাবী লেখক, সাংবাদিক সাহিত্যিক কী এদেশে নেই? তাঁরা কী লিখতে পারেন না। অবশ্যই মেধাবী সাংবাদিক, কলামিষ্ট এদেশে এখনও আছে। শৃঙ্খলা বা জবাবদিহিতা নেই বলে আগেভাগে সত্য বাবুর সাথে আধারে সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যায়। তাই হতাশার গহব্বরে থেকে অপরিসীম ব্রেন চর্চা করে স্পষ্টভাষী অনুসন্ধানী কলাম এখন আর পাঠক সমাজে কেউ প্রকাশ করতে চায় না।
ভাবখানা এমনই যে জনসাধারণ নয়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেত্বত্ব ঠিক থাকলে তার চাকুরী ঠিক থাকবে। তাই রাজনৈতিক নেতাদের পোষা গোলাম সাজে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী যদি বেশি আনুগত্য দেখায় সেখানে কেউ যে কারোর খবর রাখবে না এটাই স্বাভাবিক? জনমনে একরাশ আকুতি কেন সে জানবে? জানার ইচ্ছে প্রকাশ করবে। পাওয়ার হাউজ ঠিক থাকলে সব ঠিক। তাই স্বার্থের টানে দূরে সরে চলে যায়। এক পর্যায়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে ন্যায্য অধিকার আদায়ে মানুষ বিপ্লবী হয়ে উঠে।
নাগরিক হিসেবে দেশের এবং আমজনতার প্রতি সবার কমবেশি দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ থাকে। সাংবিধানুযায়ী জবাবদিহিতা, সকল দুনীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে উচ্চকিত কণ্ঠে প্রতিবাদ করার অধিকার আছে সকল নাগরিক সমাজের। বলা যায় এটি দেশপ্রেমের একটি অংশ। মগজে উত্তর না মিললেও একথা দ্বিধাহীনচিত্তে প্রতিবাদ করা সকল বিবেকের দায়িত্ব।
আসলে আমার মতো মশা মাছি ক্ষুদ্র প্রাণীর উত্তর দেবার কী আছে? নতুন করে জাতিকে আলোর দিশা দেখানোর বা কী মেধা আছে? চলমান সমাজ ব্যবস্থায় কি বা প্রয়োজন আছে। হাতে গুণ্ডা, হুন্ডা, কলম, ক্ষমতা, টাকা, কড়ি কিছুই নেই। বলা যায় এ সমাজে সব থেকে অসহায়,অপাংক্তেয় নিঃস্ব, রিক্ত আমি একজন।
সাংবিধানিকভাবে এই জাতি রাষ্ট্রের একজন নগন্য মানুষ, এতটুকু পরিচয়। করার কোন ক্ষমতা না থাকলেও বলার কিছু তো আছে। তবে বলতে তো পারি না। কারণ আমি যে বোবা! অন্যায়ভাবে লাল দালানের ভাত কে খাবে? জেলের ঘানী কে টানবে? তবুও বিবেক থাকলে, দেশের প্রতি অফুরন্ত মায়া-মমতা থাকলে কিছু একটা বলতে হবে। দেশপ্রেমের মমত্বে কথার ঝংকার শুনাতে হবে।
কারণ দুষ্ট চক্র, অনিষ্টসাধনকারী, কালোবাজারী, মজুদদারী, ঘুষখোর, সুদখোর, দুনীর্তিবাজ, রাজনৈতিক পা চাটা গোলামরা সমাজের আনাচে-কানাচে, ডাস্টবিনে গুই মাছির মতো কিলবিল করছে। এরা দেশটাকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যেতে চায়। তারপর রাজশক্তি বলে একটা কথা আছে। এদের ক্ষমতার দম্ভ এতই বেশী যে, ফু দিলে কোন আসমানে যেয়ে পড়তে হবে তার কোন ইয়াত্তা নেই।
মশা-মাছি আনাচে-কানাছে ভৌ ভৌ করে। ক্ষুদ্র মশা মাছির মতো সমাজের জীর্ণ-শীর্ণ মানুষ হয়ে অন্যায়, অনিয়মের বিরুদ্ধে ভৌ ভৌ করার মতো ক্ষমতা এতোটুকো তো আছে। মনে রাখতে হবে আপনি জাতির বিবেক। একজন বিবেকের কাজ কী? লুটপাট করে বউ পোলাপান নিয়ে প্রাসাদোপম অট্টালিকায় থাকা, দেশকে ধ্বংস করা, রাষ্ট্রীক স্বাধীনতাকে অপরের হাতে তুলে দেয়া, দেশের টাকা পাচার করে বিদেশের মাটিতে বিত্তবৈভব গড়ে তোলা।
এ সব অনৈতিক কাজ। কোন দেশপ্রেমিক এ কাজকে সমর্থন করেন না। আপনি, আমি অসুর শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করি আগামী প্রজন্মের কাছে কী কৈফিয়ত দেবো? জিজ্ঞেস করলে কী বলবো? বলবো সুদ, ঘুষ, দুনীর্তি, কালোবাজারী, মজুদকারী এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলাম? নীতি বিরুদ্ধ কাজকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলাম। হয়তবা পারিনি। তবুও মনের কাছে অজুত সান্তনা দেশপ্রেমিক একজন যোদ্ধা হিসেবে মরণপণ সংগ্রাম করেছি। 
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী, কলামিষ্ট ও সম্পাদক আজাদবার্তা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ