খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৫ এপ্রিল ২০২৪ | ১১ বৈশাখ ১৪৩১

রোগাক্রান্ত হচ্ছেন জিম্মি নাবিকরা, জলদস্যুদের সঙ্গে সমঝোতা কতদূর?

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪১ পি.এম | ০২ এপ্রিল ২০২৪


সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে এমভি আবদুল্লাহর নাবিকদের বন্দিদশার তিন সপ্তাহ পার হতে চলেছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাসহ বিভিন্ন সংকটের মধ্যে দীর্ঘ এই সময় পার করতে হচ্ছে তাদের। সবশেষ দেখা দিয়েছি সুপেয় পানির সংকট। এছাড়া একই জায়গায় গাদাগাদি করে থাকায় চর্ম রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন নাবিকদের কেউ কেউ। উৎকণ্ঠার শেষ নয় এখানেই, পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে নাবিকদের দেশে ফেরা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে— কতদূর পৌঁছেছে জলদস্যুদের সঙ্গে সমঝোতা?

যদিও জাহাজটির মালিকপক্ষ বলছেন, নাবিকদের দ্রুত মুক্ত করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। তবে দেখার বিষয় কতটা কাজে দেবে সেই প্রচেষ্টা।

ভারত মহাসাগর থেকে এমভি আবদুল্লাহ ছিনতাই হওয়ার প্রথম আটদিন ‘চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কেটেছে জিম্মি নাবিকদের পরিবারগুলোর। এরপর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল ৯ দিনের মাথায়। সেদিন সোমালিয়ান জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় জাহাজের মালিকপক্ষের। এতে কিছুটা আশার সঞ্চার হয় নাবিক পরিবারে।

সে কথায় বলছিলেন এমভি আবদুল্লাহর চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খানের মা শাহানুর বেগম। তিনি বলেন, দস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার পর থেকে আমরা অধীর অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছি, কখন ছেলেটা মুক্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসবে। তিনি বলেন, আমি চাই আমার ছেলে ঈদের আগেই ঘরে ফিরে আসুক।

এমভি আবদুল্লাহর মালিকপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের আগে নাবিকদের মুক্ত করতে তারা সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম বলেন, আমরাও চাচ্ছি ঈদের আগেই এই জিম্মিদশার অবসান হোক এবং সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

তবে নাবিকদের দেশে ফেরার বিষয়ে আশার আলো দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ঈদের আগে মুক্তি পেলেও এমভি আবদুল্লাহর নাবিকদের দেশে ফেরানো কঠিন হবে।

ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। তিনি বলেন, জাহাজটি এখন যেখানে অবস্থান করছে, মুক্তি পেলেও ঈদের আগে সেখান থেকে বাংলাদেশে আসা সম্ভব হবে না বললেই চলে।

সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে
এদিকে প্রতিদিনই জিম্মি জাহাজ এমভি আবদুল্লায় সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খানের মা শাহানুর বেগম। রোববার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যায় মা শাহানুরের সঙ্গে সবশেষ কথা হয় জিম্মি এই নাবিকের। সে সময় তিনি জানিয়েছেন, খাবারের সংকট আপাতত নেই, তবে পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। তিনি বলেন, পানি শেষ হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে এখন নাবিকরা রেশনিং করে অল্প পানি ব্যবহার করছে।

জাহাজের মালিকপক্ষ জানিয়েছে, মোজাম্বিক থেকে প্রায় ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাইয়ে যাওয়ার পথে গত ১২ মার্চ ২৩ জন নাবিকসহ এমভি আবদুল্লাহকে জিম্মি করে সোমালি জলদস্যুরা। তখন জাহাজটিতে প্রায় ২০০ টন বিশুদ্ধ পানি এবং মাসখানেকের হিমায়িত খাবার মজুত ছিল।

মালিকপক্ষ আরও জানিয়েছে, নির্ধারিত ওই খাবার পানির বাইরে কিছু শুকনাও খাবার মজুত ছিল। ফলে খাবার এবং পানি নিয়ে নাবিকরা সংকটে পড়বেন না বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু জিম্মি করার পর অন্তত ২০ জলদস্যুর সবাই যখন নাবিকদের খাবারে ভাগ বসান, তখনই মূলত খাবার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

এদিকে জিম্মির আট দিন পর জলদস্যুদের সঙ্গে মুক্তিপণের বিষয়ে সমঝোতা শুরু হয় জাহাজের মালিকপক্ষের। ততক্ষণে এমভি আবদুল্লাহও সোমালিয়ার উপকূলে পৌঁছে যায়। ফলে জলদস্যুরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করায় নাবিকদের মধ্যে খাবার নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমে।

আতিকুল্লাহ খানের মা জানান, দস্যুরা খাবার পানি এখনও জাহাজ থেকেই নিচ্ছে। সেই কারণেই পানির তীব্র সংকটে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানান, মুক্তি পাওয়ার পর জাহাজ নিয়ে রওনা হতে গেলেও সুপেয় পানির প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, জাহাজের ইঞ্জিন স্টার্ট করতে গেলেও বেশ ভালো পরিমাণে ফ্রেশ ওয়াটারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সোমালিয়ায় ফ্রেশ ওয়াটার অতটা সহজলভ্য নয়। কাজেই এটি নিয়ে নাবিকদের দুশ্চিন্তা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।

অন্যদিকে একই জায়গায় গাদাগাদি করে থাকা এবং লোনাপানিতে গোসল করার কারণে জিম্মি নাবিকদের অনেকের শরীরে চুলকানির মতো চর্মরোগ দেখা দিয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। আতিকুল্লাহ খানের মা জানান, ‘আমার ছেলের আগে থেকেই এলার্জির সমস্যা। ওর শরীরে নাকি এখন চুলকানি হয়ে গেছে।

তবে মুক্তিপণের বিষয়ে জাহাজের মালিকপক্ষের সাথে সমঝোতা আলোচনা শুরু হওয়ার পর জলদস্যুরা জিম্মি নাবিকদের সাথে তুলনামূলক ভালো ব্যবহার করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সমঝোতা কতদূর?
কয়লাসহ জাহাজ এবং জিম্মি নাবিকদের মুক্ত করতে গত ২০ মার্চ থেকে জলদস্যুদের সাথে সমঝোতা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এমভি আবদুল্লাহর মালিকপক্ষ কবির গ্রুপ। মূলত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া তৃতীয় একটি পক্ষের সহায়তায় সমঝোতা আলোচনাটি চালানো হচ্ছে।

কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম বলেন, আলোচনায় বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে। তিনি দাবি করেন— আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে বলেই জলদস্যুরা জিম্মি নাবিকদের সাথে ভালো ব্যবহার করছেন।

তিনি আরও বলেন, আলোচনা ঠিকমত না এগোলে জলদস্যুরা এতদিনে হয়তো নাবিকদের উপর অত্যাচার শুরু করে দিত।

এর আগে ২০১০ সালে এমভি জাহান মনি নামে কবির গ্রুপের আরও একটি জাহাজ ছিনতাই করেছিল সোমালি জলদস্যুরা। তখনও মুক্তিপণ দিয়ে ১০০ দিনের মাথায় সেটি মুক্ত করা হয়েছিল।

এমনকি সম্প্রতি সোমালি জলদস্যুদের কাছ ভারতীয় নৌবাহিনীর সদস্যরা ‘এমভি রুয়েন’ নামে মাল্টার পতাকাবাহী যে জাহাজটি জব্দ করেছে, ছিনতাইয়ের পর সেটির মালিকপক্ষের কাছেও মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল।

ভারতীয় নৌবাহিনী জানিয়েছে, এমভি রুয়েনের মালিকপক্ষের কাছে প্রায় ৫০০ কোটি ভারতীয় রুপি সমমানের মুক্তিপণ চেয়েছিল সোমালি জলদস্যুরা। কিন্তু এমভি আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে জলদস্যুরা কতটাকা মুক্তিপণ চাচ্ছে, সে বিষয়ে মুখ খুলছে না কবির গ্রুপ। এমনকি জলদস্যুদের পক্ষ থেকে এখনও মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট করা হচ্ছে না।

মিজানুল ইসলাম বলেন, শুধু এতটুকুই বলতে পারি, জিম্মি নাবিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা করার দরকার, সব চেষ্টায় আমরা করছি। এ সময় তিনি জানান, জিম্মি নাবিকদের সাথে মালিকপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।

শিগগিরই তারা এমভি আবদুল্লাহকে জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ঈদের আগে ফেরা কঠিন কেন?
জিম্মি করে সোমালিয়া উপকূলে নেওয়ার পর বেশ কয়েকবার অবস্থান পরিবর্তন করতে দেখা গিয়েছিল এমভি আবদুল্লাহকে। ছিনতাই হওয়ার পর থেকেই স্যাটেলাইট ইমেজ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাহাজটির অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন।

সংস্থাটি বলছে— এমভি আবদুল্লাহ বর্তমানে সোমালিয়ার গদবজিরান এলাকার জিফল উপকূল থেকে প্রায় দেড় নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, মুক্ত হওয়ার পর জাহাজটির প্রথম কাজ হবে নিকটস্থ পোর্টে গিয়ে ফুয়েল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাপ্লাই নেওয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোমালিয়া উপকূল ছেড়ে আসার পথে জ্বালানি নিতে হলে এমভি আবদুল্লাহকে থামতে হবে ওমানের সমুদ্র বন্দরে। সেখানে পৌঁছাতে অন্ততপক্ষে তিন দিন সময় লাগবে। তারা জানান, তখন মালিকপক্ষ চাইলে ওমানে জাহাজের নাবিকদের দল চেঞ্জ করতে পারবেন।

তবে সেজন্য আগে থেকেই নাবিকদের নতুন দলকে ওমানে প্রস্তুত রাখতে হবে। তারা জাহাজের দায়িত্ব বুঝে নিয়ে জাহাজের গন্তব্যস্থল দুবাইয়ের উদ্দেশে রওনা হবে। কারণ হিসেবে ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, জাহাজের মালগুলো দুবাইয়েই পৌঁছানোর কথা ছিল এবং যেভাবেই হোক সেটি পৌঁছে দিতে হবে। এটাই আন্তর্জাতিক রীতি।

অন্যদিকে ওমানে নেমে যাওয়া নাবিকরা শারীরিক পরীক্ষা ও অন্যান্য আইনগত বিষয় মিটিয়ে তারপর চাইলে বিমানে করে দেশে ফিরতে পারবেন। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ কয়েকদিন সময় লেগে যাবে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।

সব মিলিয়ে ঈদের আগে মুক্তি পেলেও বাড়িতে ফিরতে নাবিকদের আরও প্রায় দেড়-দুই সপ্তাহ সময় বেশি লেগে যাবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 
সূত্র: বিবিসি

প্রিন্ট

আরও সংবাদ