খুলনা | রবিবার | ১৪ এপ্রিল ২০২৪ | ৩০ চৈত্র ১৪৩০

ছাত্ররাজনীতি ফেরাতে একগুচ্ছ কর্মসূচি ছাত্রলীগের

ছাত্ররাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাসের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি বুয়েট শিক্ষার্থীদের

খবর প্রতিবেদন |
১২:৫৩ এ.এম | ০৩ এপ্রিল ২০২৪


ছাত্ররাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস চেয়ে এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আরজি জানালেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা। তাঁরা বলেছেন, ছাত্ররাজনীতি বিহীন বুয়েটের পরিবেশ ছিল সর্বোচ্চ নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব। মৌলবাদী শক্তিকেও রুখে দিতে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁদের সবিনয় অনুরোধ, প্রয়োজনে আইন সংস্কার করে হলেও বুয়েটকে যাতে ছাত্ররাজনীতির বাইরে রাখা হয়। প্রধানমন্ত্রী যেন তাঁদের পাশে থাকেন।
বুয়েটের ড. এম এ রশীদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লেখা একটি খোলা চিঠি পড়ে শোনানো হয়। এই চিঠিতে শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁদের আরজি তুলে ধরেন।
ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার শিকার হওয়ার পর ক্যাম্পাসে ২০১৯ সালের অক্টোবরে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। গতকাল সোমবার আদালতের সিদ্ধান্তের পর এই ক্যাম্পাসে আবার চালু হতে যাচ্ছে ছাত্ররাজনীতি। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে উপাচার্যসহ শিক্ষকদের প্রতি বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ রাখতে উদ্যোগী হওয়ার আরজি জানান। আজ সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে একই আরজি জানালেন।
সংবাদ সম্মেলনে খোলা চিঠি পড়ে শোনান বুয়েটের পাঁচ শিক্ষার্থী। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘আমরা ত্রাসের রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝি না; আমরা শুধু দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতে জানি। নিজেদের কাজ দিয়ে তা আমরা প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আমাদের সবার অভিভাবক, দেশের অভিভাবক। আমরা জানি দেশের কোথাও কোনো দুঃখজনক পরিস্থিতি চললে, কোথাও সংকট চললে আপনার হৃদয়ে গভীর রক্তক্ষরণ হয়।’ চিঠিতে বলা হয়, ‘বিগত বছরগুলোতে আমরা বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির নামে ক্ষমতার নেতিবাচক দিকগুলোই প্রত্যক্ষ করেছি। ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের মাঝে সূচনা ঘটেছে আধিপত্য, দাপট, র‌্যাগিং, শিক্ষকদের অপমান, চাঁদাবাজি, শিক্ষার্থী নিপীড়ন ও খুনোখুনিতে মেতে ওঠার মতো ঘটনার। ঘটেছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও।’
খোলা চিঠিতে বলা হয়, ‘ছাত্ররাজনীতি বিহীন বুয়েটের পরিবেশ ছিল সর্বোচ্চ নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব। মৌলবাদী শক্তিকেও রুখে দিতে আমরা ঐক্যবদ্ধ।’ চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বুয়েট শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হওয়ার পর থেকে আজ অবধি প্রতিটি জাতীয় দিবস সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে বুয়েট প্রাঙ্গণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করা হচ্ছে। আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের জাতীয় মূল্যবোধ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মনে-প্রাণে ধারণ করি।’
শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে কতিপয় ব্যক্তি বা গণমাধ্যমের তৎপরতায় ছাত্ররাজনীতি বিহীন বুয়েট ক্যাম্পাসকে জাতীয় চেতনার বিরোধী মতাদর্শের স্থান হিসেবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বিষয়টিতে আমরা অত্যন্ত ব্যথিত। আমরা বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের ব্যাপারে যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। তাই দেশের যেকোনো স্থানের মতো আমাদের ক্যাম্পাসকে আমরা অবশ্যই যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস, মৌলবাদ বা নিষিদ্ধ গোষ্ঠী থেকে নিরাপদ রাখতে সর্বদা তৎপর।’ 
শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা আপনাকে নির্দ্ধিধায় বলতে চাই, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেকোনো মুহূর্তে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যেকোনো কার্যকলাপ ক্যাম্পাসে দেখলে শিগগিরই তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেব এবং প্রশাসনকে অবহিত করব। এমনকি ভবিষ্যতে যদি ক্যাম্পাসে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সেটার বিরুদ্ধেও আমাদের দৃঢ় অবস্থান থাকবে।’
বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিহীন চার বছর শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে কাটিয়েছেন বলেও খোলা চিঠিতে উলে­খ করা হয় । প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলা হয়, ‘আমাদের মতো দেশজুড়ে লাখো শিক্ষার্থী এমন একটা ক্যাম্পাসের স্বপ্ন নিয়েই বাড়ি ছাড়ে, যেখানে তাদের ওপর অকারণে জুলুম হবে না, নির্যাতিত হতে হবে না, দিন-রাত কারও ভয়ে তটস্থ থাকতে হবে না, বাবা-মাকে দুশ্চিন্তায় চোখের পানি ফেলতে হবে না। চার বছর আগে আপনার দৃঢ় এবং দ্রুত হস্তক্ষেপে আমরা নতুন করে এই ক্যাম্পাসে বাঁচতে শিখেছি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এই ছোট্ট একটা চাওয়ার কারণে আমরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছি হুমকি, হচ্ছি লাঞ্ছিত ও অপদস্ত। আমরা, আমাদের ছোট ভাইবোনেরা আরও একবার সেই অন্ধকার দিনগুলোর সাক্ষী হতে চাই না। আমাদের মাননীয় উপাচার্য ও সব শিক্ষকের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। তাঁরা তাঁদের সন্তানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় সর্বদা সচেষ্ট আছেন এবং থাকবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে সবিনয়ে অনুরোধ, আপনি আমাদের পাশে দাঁড়ান। আপনি সব সময় শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছেন। আমরা জানি, এই দুর্দিনে আপনি আমাদের ছেড়ে যাবেন না।’
বুয়েট শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে আরও বলেন, ‘বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতির বাইরে রাখুন, প্রয়োজনে আইন সংস্কার করে হলেও। কারণ, সুবিচারের জন্যই আইনের সৃষ্টি। আমাদের অনুরোধ, আপনি দয়া করে আমাদের ক্যাম্পাসে আসুন। ছাত্ররাজনীতিহীন বুয়েট গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থীদের জন্য যে আদর্শ ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে, সেটা আমরা আপনাকে দেখাতে চাই। আমরা আপনাকে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছি, আমরা প্রযুক্তিবিদ্যায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে দেব শিগগিরই। আমাদের এই পথচলা আপনিই নির্বিঘœ রাখতে পারেন। সেই আশাতেই এই চিঠি। আমরা আপনার হাজারো সন্তান, আপনার সহযোগিতার প্রতীক্ষায় আছি।’
ছাত্ররাজনীতি ফেরাতে একগুচ্ছ কর্মসূচি ছাত্রলীগের : মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেশ কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে রয়েছে ইমতিয়াজ হোসেন রাহিম রাব্বীর আবাসিক হল ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে বুয়েট শহিদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি। নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতি প্রতিষ্ঠার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে বুয়েট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতামত আহŸান ও আলোচনা। সা¤প্রদায়িক-মৌলবাদী-জঙ্গি কালো ছায়া থেকে বুয়েটকে মুক্ত করতে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন। বুয়েটে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা।
সাদ্দাম বলেন, তারিখগুলো আমরা পরবর্তী সময়ে জানিয়ে দেব। যেহেতু বুয়েটে পরীক্ষা চলছে। তাদের একাডেমিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়-এ ধরনের কর্মসূচি ছাত্রলীগ গ্রহণ করবে না। কর্মসূচি এমন সময় পালন করব, যেন বুয়েটের একাডেমিক কার্যক্রম নির্বিঘেœ চালু থাকে। 
তিনি বলেন, আমরা কোনো ধরনের তাড়াহুড়োর মধ্যে নেই। সাংগঠনিক কমিটি গঠন যতটা না আমাদের লক্ষ্য, তার চেয়ে বৃহত্তর লক্ষ্য ছাত্র রাজনীতি থেকে যেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বিযুক্ত না থাকে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন, সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতসহ বিভিন্ন ইউনিটের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সাদ্দাম হোসেন আরও বলেন, বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি পুনরায় শুরু হবে। কিন্তু সেটি কোন ছাত্র রাজনীতি তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এই রাজনীতি অবশ্যই ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ, সেশনজট, র‌্যাগিং-বুলিং, দখল-বাণিজ্য, হত্যা-সন্ত্রাসের ছাত্র রাজনীতি নয়। এই ছাত্র রাজনীতি হবে আধুনিক, যুগোপযোগী, বৈচিত্র্যময়-সৃষ্টিশীল, জ্ঞান-যুক্তি-তথ্য-তত্ত¡নির্ভর।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ