খুলনা | শুক্রবার | ২১ জুন ২০২৪ | ৭ আষাঢ় ১৪৩১

“কবি নজরুল বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রথম বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর”

এড.এম.মাফতুন আহমেদ |
১১:৪৮ পি.এম | ২৪ মে ২০২৪


যুগে যুগে, কালের আবর্তনে এই পৃথিবীতে কিছু মানুষের আগমন ঘটে। তাঁরা একটি জাতির কান্ডারি হিসেবে আলোকবর্তিকার ভূমিকা পালন করেন। একটি জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। উন্নয়নের পথে ধাবিত করেন। তাই তাঁদেরকে বলা হয় যুগশ্রেষ্ঠ। কালের কিংবদন্তি ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। 
নজরুল ছিলেন দুঃখময় জীবনের এক প্রতীক। একটি জাতি যখন দিশাহারা, তাঁদের ইতিহাস ঐতিহ্য, কৃষ্টি সভ্যতা তম যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠিক এমনই এক ক্রান্তিলগ্নে ০০০০ বছর আগে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ তারিখে অবিভক্ত বাংলার প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত জনপদ চুরুলিয়া গ্রামের আক্ষরিক অর্থেই শ্যামল বাংলার পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে একটি মাটির ঘরে কিংবদন্তি এই কালোত্তীর্ণ ব্যক্তিত্ব জাতীয় বীরের জন্ম হয়েছিল। তিনি যুগশ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন। তিনি আমাদের অহংকার। 
আজকের এই মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কোন বিষয়ের ওপর কি লিখব, অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কারণ তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারি। একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, গায়ক, বাদক, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা ও চলচিত্র পরিচালক। তাই তিনি মুক্তির বাণী নিয়ে ধূমকেতুর মত কাজী নজরুল ইসলাম এই ধরণীতে আগমন হলেন। তাঁর জন্ম ছিল একটি নিদ্রিত জাতির মধ্যে মহাজাগরণের ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রবল উত্থানে প্রকম্পিত। অনন্য সাহিত্য পুরুষ নজরুল দ্রোহ, সাম্য, চির তারুণ্য, সকল ধর্ম ও সকল মানুষের কবি। তাঁর এক হাতে ছিল বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আরেক হাতে রণতুর্য। তাঁর সাহিত্যে মানসের মর্মকথা ছিল মানবতার মুক্তি। নজরুল নিজের একটি গানে যেন সে আবহের জানান দিয়েছেন 
“বাজল কি রে ভোরের সানাই নিদ মহলার আধারপুরে 
শুনছি আজান গগণ তলে অতীত রাতের মিনার চূড়ে।” 
তিনিই প্রথম যিনি এই উপমহাদেশের মজলুম মানুষকে সরাসরি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কলম যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার আহŸান জানিয়ে ছিলেন। দৃপ্তকণ্ঠে তিনিই সর্বপ্রথম বাঙালি যিনি উচ্চারণ করেছিলেনÑ 
‘কারার ঐ লোহ-কপাট
ভেঙে ফেল করবে লোপাট
রক্ত জমাট 
শিকল পূজায় পাষাণ বেদী। 
ওরে ও তরুণ ঈশান 
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ
ধ্বংস নিশান 
উড়–ক প্রাচীর 
প্রাচীর ভেদি। 
লাথি মার ভাঙরে তালা
যত সব বন্দী-শালায় 
আগুন জ্বালা ফেল উপাড়ি।
কিংবা 
এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল 
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবরে বিকল’। 
অবদমিত, ষড়যন্ত্র ও হিংসায় আক্রান্ত, আত্মবিস্মৃতি জাতিকে আগে কেউ এই আহŸান জানাননি। তিনিই বলেছিলেন-
“বল বীর, চির উন্নত মম শির”। 
কবির এই আহŸান ছিল পরাধীনতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ বাঙালি জাতির প্রতি স্বাধীনতার মন্ত্রে দিক্ষিত হবার আহŸান। তিনি গর্জে ওঠেছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা ও জাতির মুক্তির জন্য। কোনও অবস্থাতেই তিনি দখলদার ইংরেজ সরকারের তাবেদারি মেনে নেননি। দায়বদ্ধতার কারণে নিতে পারেননি। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পান্ডাদেরকে সমঝে চলেননি; প্রতিষ্ঠিত গোত্র বা প্রভাবশালী গোষ্ঠির পক্ষপুটে আশ্রয় নেননি। শুরু থেকে শেষতক পর্যন্ত তিনি স্বজাতির কবি ছিলেন; মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক ছিলেন; জাত-পাত-ক্ষুদ্রতার বিরোধী ও বিনাশী ছিলেন। অবিচারের বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল বরাবরই সোচ্চার। তিনি সাম্রাজ্যবাদ বা শোষক শ্রেণির কাছে নতি স্বীকার না করে অসংকোচে বলতেন 
“আপনি আপনারে ছাড়া কাহারে করি না কুর্নিশ”। 
সকল অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে সাবধান বাণী শুনিয়ে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন-

 “যেথায় ভন্ডামি ভাই
করবো সেথায় বিদ্রোহ
ধামাধরা, জামাধরা মরণভীতু
চুপ রহো”। বৈষম্যপূর্ণ সমাজের করুণ আর্তনাদই নজরুল রচনার মূল সনদ। তিনি সা¤্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। শানিত কলম উঁচু করেছেন। কাব্যে তার ভাব প্রকাশ করেছেন এভাবে। 
“প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস 
যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশা”। 
তাই ইতিহাসবেত্তা বিপিন পালও স্বীকার করেছেন যে, “নজরুলের শিকড় ছিল দেশজ সংস্কৃতির মাটিতে।” সেই দেশটিই আজকের বাংলাদেশ। 
দুঃখ, দারিদ্র্য ও কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাহিত্য সাধনার সকল তুঙ্গস্পর্শী সাফল্য ও জনপ্রিয়তা সত্তে¡ও ব্যক্তিগত বেদনার নির্বাক জীবন-যাপন শেষে ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১১ ভাদ্র সকাল ১০টা ১০ মিনিটে এই জ্যোতির্ময় সাহিত্য পুরুষ রাজধানীর বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী দুখুমিয়া নামের শিশুটি এখন ঘুমিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। 
কিন্তু আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম এবং বলিষ্ঠ প্রেরণাদানকারী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেন আজ অনাদরে? কেন আজ তার প্রতি এত অবহেলা? 
তিনি বলেছিলেন “আমি চির তরে দূরে চলে যাব 
তবুও আমারে দেব না ভুলিতে”। 
কবির এমন আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে জাতীয় প্রচেষ্টার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। কবির নামে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যদিও ময়মনসিংহে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। জাতীয় কবির মাযার ঘিরে জাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পপনা আলোর মুখ কবে দেখবে তা কেউ জানে না। জাতীয় কবি হিসেবে তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি আজও মেলেনি। চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নজরুল চেয়ার’ স্থাপন করা হলেও তার কোন কার্যক্রম নেই। নজরুল ইনস্টিটিউটও চলছে গঁৎ বাঁধা ছকে। জাতীয় কবির প্রতি এতো অবজ্ঞা, এতো অবহেলা কেন? নজরুলভক্ত সহ সুধীমহল আজকের এই জন্মবার্ষিকীকে সামনে রেখে এর অবসান চান।  
লেখক : আজাদ বার্তা সম্পাদক ও সিনিয়র আইনজীবী।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ