খুলনা | শুক্রবার | ২১ জুন ২০২৪ | ৭ আষাঢ় ১৪৩১

বাজেট নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া : ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সংবিধান পরিপন্থি’

প্রস্তাবিত বাজেট গণবিরোধী, গভীর ঋণের ফাঁদে পড়বে দেশ : বিএনপি

খবর প্রতিবেদন |
০১:১৫ এ.এম | ১০ জুন ২০২৪


২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিএনপি প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই বাজেট একটা কল্পনার ফানুস, এটি গণবিরোধী ও দেশবিরোধী। 
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও বাজেটের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় দলটি মনে করে, ‘প্রস্তাবিত এই বাজেট কালো টাকাকে সাদা করার বাজেট। কালো টাকায় ঢালাও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’
রোববার বিকেলে প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে সংবাদ সম্মেলনে আয়োজন করে বিএনপি। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার সঙ্গে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিউল­াহ।
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল উলে­খ করেন, ‘কালো টাকায় ঢালাও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ১৫ শতাংশ কর দিয়ে ব্যক্তির সঙ্গে যেকোনও কোম্পানিকেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের কোনও সংস্থাই কালো টাকা সাদাকারীদের কোনও ধরনের প্রশ্ন করতে পারবে না। অর্থাৎ দায়মুক্তি বা আইনি ছাড় দেওয়া হলো। এর ফলে সৎ ও বৈধ আয়ের করদাতাদের নিরুৎসাহিত এবং দুর্নীতিকে সরকারি ভাবে উৎসাহিত করা হলো।’
‘দুর্নীতি করার এহেন লাইসেন্স প্রদান অবৈধ, অনৈতিক ও অসাংবিধানিক। ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার বিপরীতে সৎ করদাতাদের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ হারে কর দেওয়ার বিধান বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক। এই পদক্ষেপ সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি।’
তিনি বলেন, ‘‘কথায় কথায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্সের’ বুলি যারা আওড়ায়, তাদের পক্ষে রাজস্ব বৃদ্ধির খোঁড়া যুক্তিতে দুর্নীতির বৈধ লাইসেন্স প্রদান যে অনৈতিক ও সাংঘর্ষিকতা জেনে শুনেই দুর্নীতিবাজ সরকার অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীদের দুর্নীতির এই লাইসেন্স দিচ্ছে। সরকারের আনুকূল্যে বেড়ে ওঠা আজিজ-বেনজীরদের মতো দুর্নীতিবাজদের কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ সৃষ্টির জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’’ ‘তবে এই অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কিছু রাজস্ব আদায় হলেও এতে সার্বিকভাবে রাজস্ব আহরণ ব্যাহত হবে। এই বাজেট দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দখলদার আওয়ামী সরকার ও তাদের মাফিয়া গুরুদের মাঝে ভাগাভাগির এক সুনির্দিষ্ট ইজারাপত্র মাত্র’ বলে জানায় বিএনপি।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই বাজেটে কর্মসংস্থান তৈরির কোনো দিক নির্দেশনা নেই। ডলার সংকটের কথা বলে আমদানি সংকুচিত করায় ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং র-মেটারিয়ালস আমদানি প্রায় অবরুদ্ধ। যার ফলে শিল্প কারখানা বন্ধের পথে। সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু নেই বাজেটে। তিনি বলেন, শূন্যের ওপর দাঁড়ানো এই বাজেট কর ও ঋণনির্ভর। এই বাজেট লুটেরা বান্ধব। আওয়ামী লীগ নিজেদের চুরি হালাল করার জন্য এই বাজেট প্রস্তাব করেছে।
ফখরুল বলেন, বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো স্বস্তি নেই। বর্তমান লুটেরা সরকারের এ বাজেট কেবল গুটিকয়েক অলিগার্কের জন্য। যারা শুধু চুরিই করছে না, তারা ব্যবসা করছে, তারাই নীতি প্রণয়ন করছে, আবার তারাই দেশ চালাচ্ছে।
দেশ দেউলিয়াত্বের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, রিজার্ভ ও ডলার বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সংকট। এই সংকট কাটিয়ে ওঠার কোনো রোডম্যাপ বাজেটে নেই।
বিএনপি আমলে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান প্রতি বাজেটের আগে ভিক্ষার থালা নিয়ে ঘুরতেন আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, এবারের বাজেট দেখেই বোঝা যায় কারা ভিক্ষার থালা নিয়ে ঘুরছে। পুরো বাজেটই ভিক্ষার, তার মধ্যে নিজস্ব কিছুই নেই। ঘাটতি বাজেট মেটানো হবে ঋণ দিয়ে। একদিকে বৈদেশিক ঋণ, আরেক দিকে অভ্যন্তরীণ ঋণ। দেশের মানুষ ইতোমধ্যে খাদে পড়ে গেছে, তাদের ওপর চেপে বসেছে বাজেটের হাতি। তাদের কাছ থেকেই আরও ঋণ নেওয়া হবে।
বাজেট গণমানুষের অর্থনৈতিক দুরাবস্থার সঙ্গে নিষ্ঠুর তামাশা দাবি করে বিএনপির এই নেতা বলেন, অসহনীয় মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। কীভাবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা হবে তার কোনো পথনির্দেশনা নেই। সরকারি আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিছু সিন্ডিকেটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। তাদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাজেটে সে আলোচনা নেই।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই বাজেট কালো টাকা সাদা করার বাজেট। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ায় সৎ ও বৈধ করদাতারা নিরুৎসাহিত হবে। দুর্নীতিকে এখানে উৎসাহিত করা হয়েছে। দুর্নীতি করার এই লাইসেন্স দেওয়া অবৈধ, অনৈতিক ও অসাংবিধানিক।
সরকারের আনুকূল্যে বেড়ে ওঠা আজিজ-বেনজীরদের মতো দুর্নীতিবাজদের কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ সৃষ্টির জন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন মির্জা ফখরুল।
বাজেটে ঋণ করে তা পরিশোধের ফন্দি করা হয়েছে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতি মেটানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ঋণ নিয়ে। সরকার কঠিন শর্তের বৈদেশিক ঋণের দিকে আরও ঝুঁকবে। দেশ আটকা পড়বে আরও গভীর ঋণের ফাঁদে। যার বোঝা চাপবে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। বর্তমানে দেশের প্রতিটি নবজাতক শিশুকে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জন্ম নিতে হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, এ বাজেট শুধু গণবিরোধী না, বাংলাদেশবিরোধী। অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প বন্ধ রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষির মতো জনকল্যাণমুখী খাতে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু সেটা করলে দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে, তাই পুরো বাজেট করা হয়েছে মেগা চুরি ও দুর্নীতির জন্য।
তিনি আরও বলেন, বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশ যাবে বেতন-ভাতা, প্রণোদনা, ভর্তুকির মতো অনুৎপাদনশীল খাতে। পুলিশ ও প্রশাসনের একমাত্র কাজ বিরোধীদলকে নির্যাতন করা। তাদের খাতেই বেশি খরচ করা হচ্ছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ