খুলনা | শুক্রবার | ২১ জুন ২০২৪ | ৭ আষাঢ় ১৪৩১

আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাসে অভিযুক্ত

ইউপি নির্বাচনে বারবার পরাজয়ের কারণে কুপিয়ে হত্যা করা হয় নড়াইলের আনিচুরকে

নড়াইল প্রতিনিধি |
০২:০৮ পি.এম | ১১ জুন ২০২৪


ভুক্তভোগী নড়াইল জেলার নড়াগাতী থানার কলাবাড়িয়া গ্রামের শেখ আনিচুর রহমানের (৪১) ভাই শেখ সোহেল রানার কাছে বারবার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে পরাজিত হয়ে আসছিলেন প্রতিদ্ব›দ্বী জুলফিকার। নির্বাচন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তাদের দুইপক্ষের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক ছিল। পূর্ব শত্র“তার জেরে ভুক্তভোগী আনিচুরকে ৬ মাস আগে হত্যার পরিকল্পনা করেন জাহিদুল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩১ মে বিকেলে ভুক্তভোগীকে ইটের ভাটায় ডেকে নিয়ে শামীম শেখ ও জুলফিকারের নেতৃত্বে হাত-পায়ের রগ কেটে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
সোমবার রাতে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় র‌্যাব-৩ ও র‌্যাব-৬ এর যৌথ অভিযানে প্রধান আসামিসহ ১৩ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। আসামিরা হলেন মূল পরিকল্পনাকারী ও অন্যতম প্রধান আসামি জাহিদুল শেখ (৫০), শামীম শেখ (২৫), হাছানুর রহমান রিপন (৫০), জুলফিকার (৪৫), রাশিদুল শেখ (২৪), লিটু (২৮), হিটু (২৫), আজিজ শেখ (২৫), হানিফ শেখ (২৮), মুশফিকুর রহিম (২২), তৈয়েবুর রহমান (৫৫), শরিফুল শেখ (৩৮) ও সাইফুল শেখ (৪০)।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ ফিরোজ কবীর এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, গত ৩১ মে নড়াইল জেলার নড়াগাতী থানার কলাবাড়িয়া এলাকায় শেখ আনিচুর রহমানকে আধিপত্য বিস্তার এবং পূর্ব শত্র“তার জের ধরে ধাওয়া করে ইট-ভাটায় নিয়ে হাত ও পায়ের রগ কেটে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ২ জুন ভিকটিমের ভাই শেখ সোহেল রানা বাদী হয়ে নড়াগাতী থানায় ৩১ জন এবং অজ্ঞাতনামা ৭/৮ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডটি দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিরা নিজ এলাকা ছেড়ে রাজধানীতে আত্মগোপন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব-৩ এর গোয়েন্দা দল পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে র‌্যাব-৩ এর ও র‌্যাব-৬ এর যৌথ অভিযানে সোমবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীসহ মোট ১৩ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়।
র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক মোঃ ফিরোজ কবীর বলেন, ভিকটিমের ভাই ও মামলার বাদী শেখ সোহেল রানা কলাবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য। আসামি জুলফিকার তার নির্বাচনী প্রতিদ্ব›দ্বী ছিলেন। নির্বাচন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে তাদের দুইপক্ষের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক ছিল। পূর্ব শত্র“তার জের ধরে ভিকটিম আনিচুরকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য গ্রেফতার জাহিদুল তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে গ্রেফতার মূল পরিকল্পনাকারী জাহিদুল তার সহযোগী হাছানুর রহমান রিপন এবং মঞ্জুর শিকদারের সহায়তায় সুপরিকল্পিতভাবে গত ৩১ মে বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে ভিকটিমকে নিজ বাড়ি থেকে ডেকে টুকু মোল­ার ফোর ব্রাদার্স নামের ইটভাটার ভেতরে নিয়ে যান। ইটভাটার ভেতরে ভিকটিম গ্রেফতার শামীম শেখ ও জুলফিকারের নেতৃত্বে রাশিদুল, রহিম, লিটু, হিটু, আজিজ, শহীদ শেখ, ইরফান শেখসহ ১২-১৩ জনের একটি দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত দলকে দেখে প্রাণের ভয়ে দৌড়ে ভাটার পাশে বাঁশের বেড়া দেওয়া একটি ঘরে আশ্রয় নেন। যেখানে ওৎ পেতে ছিল গ্রেফতার হানিফের নেতৃত্বে মনিরুজ্জামান, সেকন শেখ, নাইম শেখসহ ৪-৫ জনের একটি দল। তারা তাকে ধরতে গেলে ভিকটিম বেড়া ভেঙে পাশের জমিতে পড়ে যান। তখন ওসিকুর রহমানের নির্দেশে ও মূল পরিকল্পনাকারী জাহিদুলের নেতৃত্বে হাছানুর, শামীম শেখ, জুলফিকার, রাশিদুল ও শিহাব শেখ চাপাতি ও রামদা দিয়ে নৃশংসভাবে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।
হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে লেঃ কর্নেল ফিরোজ বলেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ছয় মাস আগে। হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন গ্রেফতার জাহিদুল ও নির্দেশদাতা ছিলেন ওসিকুর। ছলেবলে পরিকল্পিতভাবে সুবিধাজনক স্থানে নেওয়ার দায়িত্ব ছিল হাছানুর এবং মঞ্জুরের। ইটভাটায় হত্যার প্রথম প্রচেষ্টা ছিল শামীম শেখ ও জুলফিকারের নেতৃত্বাধীন ১২-১৩ জনের একটি দলের, দ্বিতীয় প্রচেষ্টা বাস্তবায়নের নেতৃত্বে ছিল গ্রেফতার হানিফের নেতৃত্বাধীন ৪-৫ জনের একটি দল।  শেষে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করে মূল পরিকল্পনাকারী জাহিদুল ও তার সহযোগী হাছানুর, শামীম শেখ, জুলফিকার, রাশিদুল ও শিহাব শেখসহ অন্য আসামিরা।
গ্রেফতার আসামিদের বিষয়ে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, আসামি জাহিদুল আনিচুর হত্যা মামলা ছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয় কাবাডি দলের খেলোয়াড় কাইয়ুম শিকদার হত্যাসহ ধর্ষণ মামলা ও যৌতুকের মামলার আসামি। জাহিদুল শেখ পেশায় একজন খাবার হোটেল ব্যবসায়ী। আসামি শামীম শেখও জাতীয় কাবাডি দলের খেলোয়াড় হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে নড়াগাতী থানায় চারটি মামলা রয়েছে। আসামি শামীম পেশায় স্থানীয় একটি স্কুলের অফিস সহায়ক। আসামি জুলফিকারও বাংলাদেশ জাতীয় কাবাডি দলের খেলোয়াড় কাইয়ুম শিকদার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। তার বিরুদ্ধে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নড়াগাতী থানায় দু’টি মামলা আছে, তিনি পেশায় একজন কৃষক। গ্রেফতার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানান র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্ন জবাবে ফিরোজ কবীর বলেন, আসামিরা পেশাদার খুনি। তারা বিভিন্ন এলাকায় টাকার বিনিময় হত্যাকাণ্ড চালিয়ে থাকেন।
র‌্যাব বলছে, গ্রেফতারকৃত জাহিদুল এই হত্যা মামলা ছাড়াও ২০২০ সালে নড়াগাতী থানায় বাংলাদেশ জাতীয় কাবাডি দলের খেলোয়াড় কাইয়ুম শিকদার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে কুষ্টিয়ার খোকশা থানায় একটি ধর্ষণ মামলা ও যৌতুকের জন্য মারপিটের মামলা রুজু করা হয়। তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী সহিংসতা ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০০২ ও ২০২৩ সালে পৃথক মামলায় গুরুতর জখম করার অভিযোগ পাওয়া যায়। জাহিদুল শেখ পেশায় একজন খাবার হোটেল ব্যবসায়ী।
গ্রেফতারকৃত শামীম শেখও আলোচিত কাইয়ুম শিকদার হত্যা মামলার অন্যতম এজাহারনামীয় আসামি। তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে নিহতের ভাই সোহেল রানাকে মারধরের নড়াগাতী থানায় ৪টি পৃথক মামলা রয়েছে। গ্রেফতারকৃত শামীম ২০১৪ সালে নড়াগাতী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। পেশায় সে স্থানীয় একটি স্কুলের অফিস সহায়ক।
গ্রেফতারকৃত জুলফিকারও বাংলাদেশ জাতীয় কাবাডি দলের খেলোয়াড় কাইয়ুম শিকদার হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। তার বিরুদ্ধে প্রতিবেশী জনৈক গাউশেখকে গুরুতর জখম ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে নড়াগাতী থানায় পৃথক ২টি মামলা হয়। তিনি পেশায় একজন কৃষক।
এছাড়াও গ্রেফতারকৃত হাছানুরের নামে কাইয়ুম হত্যা মামলা, প্রতিবেশী জনৈক রফিকুল ও আবুল হাসনাতকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গুরুতর জখম ও মারধরের ২০১৯, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের নড়াগাতী থানায় পৃথক তিনটি মামলা রয়েছে। তিনি পেশায় একজন ঘের ব্যবসায়ী। 
এছাড়াও গ্রেফতারকৃত রাশিদুলের বিরুদ্ধে ১টি হত্যা ও ১টি মারামারির মামলা, আজিজের বিরুদ্ধে ১টি হত্যা ও ১টি মারামারির ২টি মামলা, তৈয়েবুর এর বিরুদ্ধে ১টি হত্যা ও ৪টি মারামারিসহ মোট ৫টি মামলা, শরিফুলের বিরুদ্ধে ১টি হত্যা ও ২টি মারামারিসহ ৩টি মামলা, সাইফুল এর বিরুদ্ধে ১টি হত্যা ও ২টি মারামারিসহ মোট ৩টি মামলা রয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। 
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ