খুলনা | সোমবার | ২২ জুলাই ২০২৪ | ৭ শ্রাবণ ১৪৩১

হজ মুসলমানদের বিশ্ব সম্মেলন

|
১২:০৭ এ.এম | ১৫ জুন ২০২৪


ইসলামের পাঁচটি রুকনের মধ্যে হজ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন, যেটি পালন করতে একজন মুসলিম তার যাবতীয় চাহিদার সর্বস্ব ত্যাগ করে মালিকের ডাকে সাড়া দিয়ে কালো গিলাফে আবৃত কাবার সামনে হাজির হয়।
হাজিরা তাদের রবের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে রবের একাত্মবাদের স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি রবকে বিনয় সুরে বলে লাব্বাইক আল­াহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নি’মাতা লাকা ওয়াল মূলক, লা শারিকা লাক। অর্থাৎ ‘হাজির হে আল­াহ! আমি হাজির। হাজির! তোমার কোনো অংশীদার নেই, নিশ্চয়ই সব গুণকীর্তন ও প্রশংসা, সব নিয়ামত এবং সব ক্ষমতা একমাত্র তোমার। তোমার কোনো শরিক নাই’।
হজের প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শুরু আরাফার ময়দানে অবস্থানের মাধ্যমে। এর আগে হাজিদের নিজ নিজ মিকাত অতিক্রম করার সময় হজের প্রথম ফরজ ‘ইহরাম বাঁধা’ শেষ করতে হয়। ইহরাম বাঁধার নিগূঢ় রহস্য হলো, আপনার যতই প্রভাব ও প্রতিপত্তি থাকুক না কেন? আপনাকে রিক্ত হস্তে সেলাইবিহীন কাপড় পরে ফকিরের বেশেই মহান বাদশাহ আল­াহর সামনে হাজির হতে হবে আজকের মতো-আগামী দিনেও।
কেবল বাহ্যিক ফকিরই নয়, আন্তরিকভাবেও ফকির হতে চেষ্টা করতে হবে। রঙিন কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ সব পোশাক খুলে রেখে, মরার আগে মরার মতো হতে হবে। বাহ্যিক জীবনে যখন এরূপ বেশ ধারণ করা হবে, তখন মনের ওপরও তার গভীর ছাপ মুদ্রিত হবে। ভেতর থেকেও আপনার মন সত্যিকারভাবে ‘ফকির’ হয়ে ুউঠবে।
নিজের অন্তরে পুষে থাকা আমিত্ব ও গৌরব দূরীভূত হবে, গরিবানা ও শান্তি-প্রিয়তার ভাব ফুটে উঠবে। 
হজের প্রধান ফরজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা থেকে শিখতে হবে, কেয়ামতের মাঠে মহান রাজাধিরাজ আল­াহর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর মতো করে।পৃথিবীর বুকে নির্মিত প্রথম ঘর পবিত্র ‘কাবা শরিফকে’ বিশ্বের কেন্দ্রভূমি হিসাবে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যেন মানবদেহের মধ্যে হৃদয়ের অবস্থান। দেহে যতই রোগাক্রান্ত হোক না কেন, যতদিন হৃদয়ের স্পন্দন থেমে না যায়, ততদিন যেমন মানুষের মৃত্যু হয় না, ঠিক তেমনিভাবে হজের এ সম্মেলন ব্যবস্থা যতদিন কায়েম থাকবে, ততদিন মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি ধূলিসাৎ হবে না।
ওআইসির সদস্যভুক্ত মুসলিম ৫৭টি রাষ্ট্র ছাড়াও পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন অমুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো থেকেও প্রতিবছর লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলিম নর-নারী আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মহান আল­াহর নির্দেশে আহŸানকারী হজরত ইবরাহিম (আঃ)-এর ডাকে সাড়া দিয়ে পবিত্র কাবার প্রাঙ্গণে হজের কাফেলায় সমবেত হয়। 
হজ মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক হওয়ার উলে­খযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো এই- ক. কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ, উঁচু-নিচু, অভিজাত ধনী, গোত্র, বর্ণ সবকিছু ভুলে গিয়ে একই প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে হজের সব কার্যক্রম পালনের মাধ্যমে ঐক্যের ঘণ্টা ধ্বনিত হয়। খ. মুসলমান পরস্পর পরস্পরের ভাই হিসাবে সৌহার্দ আর স¤প্রীতিসুলভ আচরণ প্রস্ফুটিত হয়।
দুনিয়ার সব মুসলমানের মুখে লাব্বাইক আল­াহুম্মা লাব্বাইকের সুরের ব্যঞ্জনা ও সাদা দুখানি কাপড়ের সাদৃশ্য যেন ঘোষণা করে একই আদমের সন্তান মোরা এক আল­াহর গোলাম। বিশ্ব মুসলিমের এ সম্মেলনে সমস্বরে আল­াহর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণায় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয় এবং মুসলিম উম্মাহর শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এক দেশের মানুষের সঙ্গে অন্য দেশের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উন্নতির পথ সুগম হয়।
সর্বোপরি, সবার প্রভু এক। এক নবির উম্মত। সবার জীবন বিধান কুরআন এক। সবার কেবলা, সবার ইমাম, সবার রুকু-সেজদা, সবার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। এভাবেই আগত লাখ লাখ জনতার দেশীয় ভাষা, আঞ্চলিক জাতিসত্তা, দেশ, বংশগোত্র ও বর্ণের কৃত্রিম বৈষম্য চূর্ণ-বিচূর্ণ করে একাকার হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর এক অপ্রতিরোধ্য সিসা ঢালা প্রাচীর নির্মিত হয় হজে।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ