খুলনা | সোমবার | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১১ আশ্বিন ১৪২৮

চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা, বাড়ি ছাড়ছে অনেকে

জোয়ার-ভাটায় বসবাস প্রতাপনগরের পাঁচ গ্রামের মানুষের : চারিদিকে শুধু পানি আর পানি

রুহুল কুদ্দুস, সাতক্ষীরা |
১২:৪৯ এ.এম | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

খোলপেটুয়া নদীর প্রবল জোয়ারের তোড়ে বিকল্প রিং বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের অসংখ্যা ঘরবাড়ি। গত চারদিনে ওই বিকল্প রিংবাঁধ সংস্কার না হওয়ায় লবণ পানিতে থৈ থৈ করছে পুরো এলাকা। নদীর স্রোতে চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে বসত ভিটা। ফলে শেষ সম্বল হারিয়ে পৈতৃক ভিটা ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন অসহায় গৃহহীন অনেক পরিবার।
ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠার আগেই ইয়াসের আঘাত। সর্বশেষ ১০ সেপ্টেম্বর খোলপেটুয়া নদীর প্রবল জোয়ারের তোড়ে প্রতাপনগর গ্রামের মানিক হাওলাদারের বাড়ি সংলগ্ন মসজিদের পাশের বিকল্প রিং বাঁধ ভেঙে ফের প্লাবিত হয় প্রতাপনগর, তালতলা, মাদারবাড়িয়া, কুড়িকাহনিয়া ও কল্যাণপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রতিদিন দুপুরে ও রাতের জোয়ারে নিয়ম করে পানিতে ভাসছে ওই পাঁচ গ্রামের মানুষ, আর ভাটায় সবকিছু ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে নদীতে ।
খোলপেটুয়ার লবন পানিতে গৃহহারাদের একজন প্রতাপনগর হওলাদার বাড়ি এলাকার কালাম ঘোরামী ৫ সন্তানের জনক। সর্বস্ব হারিয়েছেন, কোথায় যাবেন, কি করবেন কিছুই জানে না। আক্ষেপ করে বললেন, তিন পুরুষ ধরে বসবাস করছি এখানে। রিং বাঁধ ভেঙে সবকিছু তলিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব জানিনা। কালাম ঘরামীর মতো অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে এভাবেই এলাকা ছাড়ছে।
গত শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরের জোয়ারের সময় প্রতাপনগর মানিক হাওলাদারের বাড়ির উত্তর পাশের বিকল্প রিং বাঁধে প্রথমে সামান্য ঘোগা হয়। পরে ওই ঘোগাটি বড় আকার ধারণ করে। এ সময় খোলপেটুয়া নদীর প্রবল জোয়ারের তোড়ে প্রায় ৫০ ফুট এলাকা জুড়ে বিকল্প রিং বাঁধটি ভেঙে প্রতাপনগর ইউনিয়নের পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে করে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে উপজেলাগামী প্রধান সড়কের চলমান সংস্কার কাজটি স্রোতের টানে আবারও বিলীন হয়ে গেছে। জোয়ারের পানিতে বিলিন হওয়ার উপক্রম হয়েছে ওই এলাকায় থাকা মসজিদটি। এখানকার কিছু পরিবারের ভিটামাটি চলে গেছে নদীগর্ভে। ভাঙন কবলিত বিকল্প রিং বাঁধটি গত চারদিন ধরে মেরামত না হওয়ায় ওই এলাকায় জোয়ারভাটা অব্যাহত রয়েছে। পাঁচ গ্রামের প্রায় ৪/৫ হাজার  মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। ফলে গৃহহারা অনেকই বাব দাদার রেখে যাওয়া বসত ভিটা ফেলে অন্যত্রে চলে যাওয়ার জন্য নৌকায় তাদের মালামাল তুলছেন।
প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে প্রতাপনগর ইউনিয়নের বন্যাতলা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। বাঁধটি এখনো সংস্কার করা সম্ভব না হওয়ায় স্থানীয় গ্রামবাসীদের উদ্যোগে প্রতাপনগর গ্রামের সামনে দিয়ে বিকল্প রিং বাঁধ নির্মাণ করা হয়। খোলপেটুয়া নদীর প্রবল জোয়ারের চাপে ৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় জব্বার মাস্টারের বাড়ির সামনে থেকে বাঁধটি ভেঙে যায়। এ সময় গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে দ্রুত ভাঙন পয়েন্টটি মেরামত করা হয়। দুপুরের জোয়ারের তোড়ে শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) জুম্মার নামাজের পর প্রতাপনগর মানিক হাওলাদারের বাড়ির উত্তর পাশে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় বিকল্প রিং বাঁধটি সামান্য ভেঙে যায়। কিন্তু রাতের জোয়ারে ভাঙন পয়েন্টটি আরো বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় একশ’ ফুট রান্তা ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রতাপনগর তালতলা, মাদার বাডড়িয়া, কুড়িকাহনিয়া, কল্যাণপুরসহ পাঁচটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত এলাকার মধ্যে প্রতাপনগর পশ্চিম, মাদার বাড়িয়া গ্রামের কয়েকশ’ বিঘার মৎস্য ঘের তলিয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে কয়েকশ’ পরিবারের ঘর বসতবাড়ি। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। বাড়িঘর ডুবে থাকায় অনেকে প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
তিনি আরো বলেন, বিকল্প রিং বাঁধটি ভাঙার বিষয়টি আমি স্থানীয় প্রশাসন ও পাউবো কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বাঁধটি সংস্কারে প্রয়োজনীয় কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে আগের মত জোয়ার ভাট হচ্ছে ওই এলাকায়। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর থেকে প্রতাপনগরের মানুষের মাঝে নেমে আসে দুর্বিষহ দুর্ভোগ। কোনভাবেই যেন তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জনগনের জানমাল রক্ষায় দ্রুত বাঁধটি সংস্কারের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ