খুলনা | শনিবার | ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১ ফাল্গুন ১৪৩২

খাতাই খুলতে পারেনি জাতীয় পার্টি

খবর প্রতিবেদন |
০৫:৪০ পি.এম | ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে চার দশকের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে নজিরবিহীন ভরাডুবি হয়েছে জাতীয় পার্টির। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ১৯৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটিতেও জয়ের দেখা পায়নি লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীরা। এমনকি দলটির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত রংপুরের কোনো আসনেই জয় পায়নি দলটি। এই ভরাডুবির মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে এসেছে খোদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর শোচনীয় পরাজয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিজ নিজ আসনে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন দুই শীর্ষ নেতা।

রংপুর শহরেই জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়ি। সেই সূত্রে রংপুর অঞ্চলে বরাবরই জাপার শক্ত ভিত্তি ছিল। কিন্তু এবার দলটির দুর্গে হানা দিয়েছে জামায়াত জোট। রংপুরের ছয় আসনের সবকটিতে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে এই জোটের প্রার্থীরা। এমনকি ভোট অংশ নিয়ে তৃতীয় হয়েছেন দলীয় চেয়ারম্যান জিএম কাদের।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে ২২১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৩৫টিতে জয় পেয়েছিল জাপা।

১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে দলটি যথাক্রমে ৩২ এবং ১৪টি আসন পেয়েছিল। জাপা ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অধীনে অংশ নেয় এবং ২৭টি আসনে জয় পায়।

২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে জাপার ৩৪ জন প্রার্থী বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অধীনে নির্বাচনে দলটি ২২টি আসনে জয় পায়।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ১১টি আসনে জয় পেলেও এবারের নির্বাচনে ১৯৬ আসনের একটিতেও খাতাই খুলতে পারেনি এরশাদের হাতে গড়া জাতীয় পার্টি। কোনো আসনেই দলটি তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারেনি।

রংপুর-৩ আসনটি একসময় জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানে সংসদ সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাপার প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পরে তার ছেলে সাদ এরশাদ, এবং একবার উপনির্বাচনে রওশন এরশাদ নির্বাচিত হন। এই আসন জাপার জন্য ছিল সাংগঠনিক ও ভোটব্যাংকের মূল কেন্দ্র। এবার জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গে জয়ী হয়েছে, যা রংপুরের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

রংপুর-৩ সদর আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃতীয় হয়েছেন দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের। আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৫ হাজার ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচন হয়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সামসুজ্জামান সামু পেয়েছেন ৮৪,৫৭৮ ভোট। চেয়ারম্যান জিএম কাদের এই আসনে পেয়েছেন মাত্র ৪৩,০০০ ভোট, যা দলের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে অচল করে দিয়েছে।

জানা গেছে, নির্বাচনের দিন জিএম কাদের ভোট দিতে যাননি। পুরো দিন তিনি নিউসেনপাড়া মহল্লার বাসায় অবস্থান করেছেন এবং কোনো কেন্দ্র পরিদর্শন করেননি। এই অনুপস্থিতি ভোটের মাঠে দলের পরাজয়কে আরও স্পষ্ট করেছে এবং ভোটারদের মনোবল কমিয়েছে।

গাইবান্ধা-১ আসনে মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীও তৃতীয় হয়েছেন। সেখানে সংসদ সদস্য হয়েছেন জামায়াতের মো. মাজেদুর রহমান। দ্বিতীয় হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী। শামীম হায়দার হয়েছেন তৃতীয়।

জাতীয় পার্টির ভরাডুবির কারণ
জাতীয় পার্টির এই ঐতিহাসিক পরাজয়ের পেছনে কয়েকটি মূল কারণ কাজ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে দলের রাজনৈতিক কৌশল ও কর্মকাণ্ড ভোটারদের আস্থা হারিয়ে দিয়েছে। বিশেষত, দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকা জাতীয় পার্টির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ভোটারদের মধ্যে এখন তারা একটি স্বতন্ত্র ও সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা হয় না।

দলের অভ্যন্তরে কোন্দল ও নেতৃত্ব সংকটও একটি বড় কারণ। দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসংগতি এবং নেতৃত্বের অভাব দলের কার্যকর প্রচারণা ও মাঠ রাজনীতিকে দুর্বল করেছে।

এছাড়া নির্বাচনী মাঠে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তেমন সক্রিয় না হওয়া এবং অনুপস্থিতি ভোটারদের মনোবলকে প্রভাবিত করেছে। চেয়ারম্যান ও মহাসচিব ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত না থাকায় দলের প্রচারণা সীমিত হয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেননি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ