খুলনা | শনিবার | ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১ ফাল্গুন ১৪৩২

ডিগ্রি আছে, সিদ্ধান্ত নেই: শিক্ষিত নারীর অদৃশ্য শেকল

জয়া মাহবুব |
১২:২০ এ.এম | ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


আজকের বাংলাদেশে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র-সর্বত্রই নারীর পদচারণা বাড়ছে। তবুও বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বেলায় অনেক শিক্ষিত নারী নিজেকে অসহায় ও দ্বিধাগ্রস্ত অনুভব করেন। ক্যারিয়ার, বিয়ে, সন্তান কিংবা নিজের মতো করে বাঁচার প্রশ্নে তারা প্রায়ই অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। প্রশ্ন জাগে-শিক্ষা থাকলেই কি জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আসে? এর একটি বড় কারণ আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো। শৈশব থেকেই অনেক মেয়েকে শেখানো হয় বেশি প্রশ্ন না করতে এবং বড়দের সিদ্ধান্ত মুখ বুজে মেনে নিতে। ছেলেদের যেখানে নেতৃত্ব ও ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করা হয়, মেয়েদের সেখানে শেখানো হয় ‘মানিয়ে চলতে’। এই মানসিক কন্ডিশনিং এতটাই গভীর যে, উচ্চশিক্ষিত হয়েও অনেক নারী নিজের জীবনের বিষয়ে মত প্রকাশ করতে দ্বিধায় ভোগেন; তাদের অবচেতনে কাজ করে-নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করা মানেই বুঝি ‘অবাধ্য’ হওয়া।
গবেষণার উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এই চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। আমাদের সমাজে এখনো বড় আর্থিক লেনদেন, চিকিৎসা কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীর মতামত অনেক সময়ই উপেক্ষিত থাকে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ বিবাহিত নারী নিজের স্বাস্থ্য, বড় কেনাকাটা ও আত্মীয়ের কাছে যাওয়ার মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নিজে বা স্বামীর সাথে যৌথভাবে অংশ নিতে পারেন। অর্থাৎ, বাকি ৪০ শতাংশ নারী আজও তাদের মৌলিক সিদ্ধান্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল গোষ্ঠীর মধ্যে একটি উলে­খযোগ্য অংশ-প্রায় ১৪ শতাংশ নারী এই তিনটি সিদ্ধান্তের কোনোটিতেই সামান্যতম মত দেওয়ার সুযোগ পান না, যা আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় নারীর প্রান্তিক অবস্থানকেই ফুটিয়ে তোলে। এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২৩-এর শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি, যা প্রমাণ করে যে পারিবারিক চাপে অনেক মেধাবী নারী তাদের ক্যারিয়ারের লাগাম অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কেন শিক্ষিত হয়েও নারীরা এই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন, তার একটি চমৎকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় বিশ্বব্যাংক ও ব্র্যাক-এর যৌথ সেমিনারে উপস্থাপিত “ভয়েস অ্যান্ড এজেন্সি: এমপাওয়ারিং উইমেন অ্যান্ড গার্লস ফর শেয়ারড প্রসপারিটি” শীর্ষক গবেষণায়। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গড়ে তুলতে তিনটি উপাদানের সমন্বয় প্রয়োজন-সম্পদ (শিক্ষা বা আয়), সক্ষমতা (আত্মবিশ্বাস) এবং সামাজিক সুযোগ (পরিবার ও সমাজের সমর্থন)। গবেষণার মূল বার্তা হলো-যদি তৃতীয় উপাদানটি অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক সমর্থন না থাকে, তবে প্রথম দু’টি থাকা সত্তে¡ও একজন নারী চূড়ান্ত সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি, নারীরা শিক্ষা ও সম্পদের মতো প্রথম দু’টি উপাদান অর্জন করলেও সামাজিক সুযোগের অভাবে থমকে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক বিচার ও ‘ফেইলিওর ফোবিয়া’। একজন নারী নিজের সিদ্ধান্তে কিছু ভুল করলে সমাজ তাকে যেভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, পুরুষের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। এই ব্যর্থ হওয়ার ভয় নারীদের অন্যের ঠিক করে দেওয়া 'নিরাপদ' পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। 
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নারীরা সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বেশি ইতস্তত করেন কারণ সমাজ তাদের থেকে ‘নেতৃত্ব’ নয়, বরং ‘সহনশীলতা’ আশা কর। প্রখ্যাত আমেরিকান সামাজিক মনোবিজ্ঞানী অ্যালিস ইগলি তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, সমাজ সাধারণত পুরুষদের সিদ্ধান্তমুখী এবং নারীদের সেবামূলক চরিত্রে দেখতে অভ্যস্ত। যখনই একজন নারী দৃঢ় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান, তখন তিনি এক ধরনের অদৃশ্য সামাজিক বাধার সম্মুখীন হন, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘ডাবল বাইন্ড’ বলে অভিহিত করেন। এর ফলে শিক্ষিত নারীরাও অবচেতন মনে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান, পাছে তাদের ওপর ‘অবাধ্য’ বা ‘কঠোর’ তকমা লেগে যায়। এই সংকটে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও দায়বদ্ধ; কারণ বর্তমান পাঠদান পদ্ধতি মূলত ফলাফল-নির্ভর, যা শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি করতে পারছে না। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা যদি ব্যক্তিকে তার স্বকীয়তা এবং ঝুঁকি নেওয়ার আত্মবিশ্বাস না যোগায়, তবে সেই শিক্ষা কেবল সনদ দিতে পারে, সত্যিকারের মনস্তাত্তি¡ক ক্ষমতায়ন নয়।
এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে পরিবর্তনটা শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই। কন্যাসন্তানকে ছোটবেলা থেকেই তার ব্যক্তিগত ছোটখাটো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে এবং পরিবারকে নারীর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রেখে তাকে ভুল করার বা ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা ও ক্যারিয়ারের পাশাপাশি নারীর ‘আর্থিক স্বাক্ষরতা’ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক শিক্ষিত নারী নিজের উপার্জিত অর্থ বা পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী না হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন। অর্থিক লেনদেনের জ্ঞান এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা একজন নারীকে মনস্তাত্তি¡ক দৃঢ়তা দান করে।
সবশেষে, শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষায় ভালো করার চেয়ে আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষিত নারী মানেই শুধু সনদধারী কোনো মানুষ নয়; সত্যিকারের ক্ষমতায়ন তখনই হবে, যখন একজন নারী নিজের জীবনের কম্পাস নিজেই ধরতে পারবেন। ভুল করেও শিখবেন, আবার নতুন করে দাঁড়াবেন-এই সাহসটুকুই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। তাই প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে আমরা কতজন শিক্ষিত নারী তৈরি করছি; প্রশ্নটা হলো-আমরা কি এমন সমাজ তৈরি করতে পারছি, যেখানে একজন নারী নির্ভয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

প্রিন্ট

আরও সংবাদ