খুলনা | শনিবার | ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১ ফাল্গুন ১৪৩২

খুলনায় আলোচিত কৃষ্ণ নন্দীর ভরাডুবি, পরওয়ার ও মঞ্জুর পরাজয়

এন আই রকি |
০১:০৮ এ.এম | ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটি আসনে জয়লাভ করেছে বিএনপি এবং দু’টিতে জামায়াতে ইসলামী। আসনগুলোর ভিতরে যারা পরাজিত হয়েছেন তার মধ্যে সব থেকে বড় ব্যবধানে হেরেছেন জামায়াতের আলোচিত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী। তিনি প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপি’র প্রার্থী আমীর এজাজ খানের কাছে হেরেছেন। এছাড়া অপ্রত্যাশিত পরাজয় হয়েছেন সাবেক দুই সংসদ সদস্য। এর মধ্যে খুলনা-৫ আসনে হেরেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও হেভিওয়েট প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং খুলনা-২ আসনে বিএনপি’র খুলনা বিভাগীয় সাবেক সংগঠনিক সম্পাদক ও নগর সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সদ্য সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে যতো হেভিওয়েট প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গোলাম পরওয়ার ও নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এদের মধ্যে গোলাম পরোয়ার ভোট পুনরায় গণনার আবেদন করতে পারেন বলে জামায়াতের একটি সূত্র  জানিয়েছে।
কৃষ্ণ নন্দীর বিশাল ব্যবধানে হার : খুলনা-১ (বটিয়াঘাটা-দাকোপ) আসনে বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খান পেয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫২ ভোট এবং জামায়াত প্রার্থী  কৃষ্ণ নন্দী পেয়েছে ৭০ হাজার ৩৪৬ ভোট। ব্যবধান ৫১ হাজার ছয় ভোটের। কৃষ্ণ নন্দী জামায়াত ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিন্দু ধর্ম ধর্মাবলম্বী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পান। তিনি জামায়াত ইসলামের ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পেশার ব্যবসায়ী এবং তার বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে আসনটিতে মোট ১২ জন প্রার্থী প্রতিযোগিতা করেছিলেন। মোট ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার ১০৩ জন। এখানে প্রায় এক লাখের বেশি ভোট রয়েছে হিন্দু স¤প্রদায়ের। ১২ জনের ভিতর আটজনই হিন্দু স¤প্রদায়ের। ডুমুরিয়ার বাসিন্দাকে খুলনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী করায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি স্থানীয় ভোটাররা। পাশাপাশি হিন্দু স¤প্রদায়ের ভোট বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। আসন্ন থেকে জয়ী আমীর এজাজ খান বিগত দিনে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচন করেছে। এই প্রথম তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। খুলনায় যতগুলো বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করেছেন তার ভিতরে আমীর এজাজের ভোটের অবদান সব থেকে বেশি।
তীরে এসে তরী ডুবলো পরওয়ারের: খুলনা-৫  (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে পরাজিত হয়েছে জামায়াত ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। আসনটিতে জয়লাভ করেছেন বিসিবির সাবেক পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আসগার লবি। মাত্র ২ হাজার ৬০৮ ভোটে তিনি জয়লাভ করেছেন। বিএনপি’র প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আসগার লবি পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮৫৪ এবং জামায়াতের প্রার্থী  মিয়া গোলাম পরওয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬। আসনটিতে মোট চারজন প্রার্থী ছিলেন। অন্য দু’জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। চার লাখ দুই হাজার ভোটের ভিতর এই আসনটিতে ও হিন্দু স¤প্রদের ভোট একটা ফ্যাক্ট ছিল। 
২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকারের আমলে গোলাম পরওয়ার আসনটি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলী আসগার লবি দলীয় সিদ্ধান্তে খুলনা-৫ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন।  অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি জামায়াতের এই হেভিওয়েট নেতাকে হারিয়ে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি তিনি নিজে ফোন করে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জানিয়েছেন। যার ভিডিও সোশ্যাল মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। 
এদিকে জামায়াতের একটি সূত্র জানিয়েছে, গোলাম পরওয়ার ভোট পুনঃ গণনার জন্য আবেদন করতে পারেন। কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল এবং বাজেয়াপ্ত ভোটগুলো নিয়ে তিনি সন্ধিহান। সেখানে তুলনামূলক কম ভোট পেয়েছেন গোলাম পরোয়ার। ডুমুরিয়া উপজেলায় হিন্দু স¤প্রদায়ের ভোটারদের বসবাস বেশি। সেখানে তুলনামূলক কম ভোট পেয়েছেন গোলাম পরোয়ার। 
ভোটারদের দাবি, হিন্দু ভোটারদের সমর্থনে এবং নতুন একজন সংসদ সদস্যকে বেছে নিতেই তারা লবিকে জয়ী করেছেন। জামায়াতের এই হেভিয়েত নেতার পরাজয় সহজে মেনে নিতে পারছেন না দলটির নেতাকর্মীরা। 
খুলনা-২: বিএনপি’র ঘাঁটিতে জামায়াতের হানা : খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে পরাজিত হয়েছেন বিএনপি’র সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা  নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি পেয়েছেন ৮৮ হাজার ১৯৭ ভোট। সাবেক এই সংসদ সদস্যকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছেন কেসিসির ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও জামায়াত নেতা শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। তিনি পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৭৭৯ ভোট। ব্যবধান ৫ হাজার ৫৮২ ভোট। 
নজরুল ইসলাম মঞ্জু ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজানকে পরাজিত করেছিলেন। ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আসনটি থেকে জয়লাভ করেছিলেন।  
এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে আসনটি বিএনপি’র দখলে ছিল। তখন দু’বারই এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন সাবেক স্পীকার এড. শেখ রাজ্জাক আলী। এই আসনটি খুলনা বিএনপি’র ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই ঘাঁটিতে আঘাত এনেছে জামায়াত ইসলামীর খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও আইনজীবী শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পরাজয়ের পিছনে দলীয় কোন্দল বড় ফ্যাক্ট। বিশেষ করে তার নির্বাচনী কাজে নগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। 
অন্যদিকে তার প্রতিদ্ব›দ্বী জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীকে খুব বেশি গুরুত্ব না দেওয়া আরেকটি কারণ হতে পারে বলে অভিযোগ করেন অনেকে বিএনপি নেতা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ