খুলনা | শনিবার | ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১ ফাল্গুন ১৪৩২

টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদন

তারেক রহমানের সামনে অর্থনীতি কূটনীতিসহ ৫ চ্যালেঞ্জ

খবর প্রতিবেদন |
০১:১২ এ.এম | ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরেন তারেক রহমান। এর দেড় মাসের মাথায় তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল দেখাচ্ছে, বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। টাইম সাময়িকী গত জানুয়ারিতে দলটির নেতা তারেক রহমানের মুখোমুখি হয়েছিল। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, প্রথম অগ্রাধিকার নিয়ে। জবাবে তিনি আইনের শাসন নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। তাঁর কাছে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হলো অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তৃতীয়ত, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। তারেক রহমান বলেছেন, যতই রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা নীতি নেওয়া হোক না কেন, ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
আস্থা ফিরিয়ে ঐক্যবদ্ধ করা : ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশে অন্তত ১ হাজার ৪০০ লোক প্রাণ হারায়। এর আগে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিচারবহির্ভূতভাবে গুমের শিকার হয় সাড়ে তিন হাজার মানুষ। সেই ক্ষতগুলো এখনও বেশ তাজা। শেখ হাসিনার সময় যেসব প্রতিষ্ঠানে রাজনীতিকরণ হয়েছিল সেগুলোর ওপর এখন মানুষের আস্থা ফেরাতে তারেক রহমানকে কাজ করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে সেনাবাহিনী, আদালত, সিভিল সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এর আগে ক্ষমতায় বসেছিল ২০০১ সালে। এর পরপরই আওয়ামী লীগ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে ফিরে আসার পর থেকে তারেক রহমান ঐক্যের বাণী প্রচার করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিহিংসা কিছুই ফিরিয়ে আনবে না। বরং আমরা যদি এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, তাহলে হয়তো ভালো কিছু পাব।’
অর্থনীতির মেরামত : আওয়ামী লীগের আমলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল দ্রুত বর্ধনশীল। জিডিপি ২০০৬ সালের ৭১ বিলিয়ন থেকে ২০২২ সালে ৪২০ বিলিয়নে পৌঁছায়। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বৈষম্য ও বেকারত্বের কারণে দলটির বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পরও মানুষের জীবনযাত্রার মানের খুব একটা উন্নতি হয়নি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ পরিবারগুলোর প্রকৃত আয় সংকুচিত হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। অথচ যুব বেকারত্বের হার বর্তমানে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছে। এটি জ্বালানি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রায় ৪ কোটির বেশি বাংলাদেশি চরম দারিদ্রতার মধ্যে বসবাস করছে। এ অবস্থায় বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারে নারীদের ভাতা ও বেকারদের ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ প্রতিশ্র“তি দিয়েছে। কিন্তু এতে অর্থায়ন কীভাবে হবে তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন আছে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল অর্থনীতিতে যুক্ত করতে তারেক রহমান সংযোগ ব্যবস্থা জোরদার করতে চান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্যোক্তাদের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের উদারীকরণও তাঁর লক্ষ্য। বর্তমানে বিদেশে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী আছেন। তারা যাতে ভালো বেতনের চাকরি পান সেজন্য দক্ষ করে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে তারেক রহমানের। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ভাষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে পারি।’
ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক : বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের উন্নয়ন করতে দু’টি শক্তিধর দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করা জরুরি। একটি প্রতিবেশী দেশ ভারত, অন্যটি বাংলাদেশি পণ্যের অন্যতম শীর্ষ আমদানিকারক যুক্তরাষ্ট্র। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দিলি­র সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে অবনতি ঘটেছে। ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়াটা এই উত্তেজনার সবশেষ উদাহরণ। বাংলাদেশও আইপিএল স¤প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কিন্তু এখনও বিএনপির সঙ্গে ভারতের কাজ করার আগ্রহের কিছু ইঙ্গিত আছে। গত ডিসেম্বরে ঢাকা সফরের সময় তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তবে তিস্তা নদীসহ বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। কারণ, বিএনপি ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষরের মাধ্যমে ‘পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি’ করে আসছে।
তারেক রহমান বলেছেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সঠিক পুনর্গঠনের জন্য আগেকার চুক্তির সংশোধন প্রয়োজন। শেখ হাসিনার সময়ে হওয়া অনেক চুক্তিতে অসামঞ্জস্যতা আছে। আমরা প্রতিবেশী হলেও বাংলাদেশের ও মানুষের স্বার্থ রক্ষা করাটা সবার আগে। এরপর সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক। আলোচনার মাধ্যমে চলতি মাসে তা ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। কিন্তু এর বিনিময়ে মার্কিন পণ্যের জন্য বাজার আরও উন্মুক্ত করতে রাজি হয়েছে ঢাকা। এছাড়া, মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য এখন শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে।
এটি একটি অগ্রগতি, তবে তারেক রহমানের লক্ষ্য হলো দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে শুল্কের ক্ষেত্রে আরও ছাড় পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। সম্ভবত বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ ও মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মাধ্যমে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রসঙ্গে তারেক বলেন, ‘আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারি।’
ইসলামপন্থীদের উত্থান সামলানো : বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে আসন প্রাপ্তির সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির গঠনতন্ত্রে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থাকলেও কট্টরপন্থী অবস্থান কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে। এখন তারা সামাজিক কল্যাণ ও নিজেদেরকে ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী’ হিসেবে প্রচারের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। কিন্তু সমালোচকরা মনে করেন, ‘স্বভাব কখনও বদলায় না’। নারীদের নিয়ে দলটির আমির শফিকুর রহমানের মন্তব্য মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
জামায়াত এক সময় বিএনপি’র নির্বাচনী জোট সঙ্গী ছিল। এবার জাতীয়তাবাদী দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, দেশ পরিচালনায় ইসলামপন্থীদের প্রভাব সীমিত থাকবে। কিন্তু ভবিষ্যতের রাজনীতিতে জামায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবেই থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান বলেছেন, ‘বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য সব দলের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা জরুরি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এটি কেবল বিএনপি’র দায়িত্ব নয়, বরং গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকারে বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। আমাদের একত্রে কাজ করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যাতে আমরা ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে না যাই। মানুষ যাতে তাদের রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে পারে সেজন্য আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’
শিক্ষার্থীদের জন্য কী? : শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল চাকরিতে কোটা বৈষম্য ঘিরে। তারা অন্তর্বতী সরকারের সময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল। কিন্তু ছাত্র নেতাদের গঠন করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের নির্বাচনী জোট সঙ্গী হওয়ায় অনেক নারী ও সংখ্যালঘু সদস্য মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারী ছাত্রদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী আধিপত্য অনেক তরুণকে হতাশ করেছে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের সময় সামনের সারিতে থাকা নারীরা সংস্কার প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে অবহেলিত হয়েছেন।
এনসিপির সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা বলছেন, তিনি বিশ্বাস করেন এখনও প্রকৃত রাজনৈতিক বিকল্পের আশা আছে। তবে তা রাতারাতি তৈরি হবে না। এ জন্য কিছু মানুষকে পেশাগত সততা নিয়ে রাজনীতিতে এসে, নীতিতে অবিচল থেকে মানুষের মাঝে ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করতে হবে। এমনকি যদি একটি আসনেও কেউ সফল হয়, সেটিও প্রমাণ করবে, পুরনো রাজনৈতিক নেতৃত্বই একমাত্র ভবিষ্যৎ নয়।
নিজের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেছেন, যারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের প্রতি সম্মান জানাতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি এক গভীর দায়িত্ব আছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ