খুলনা | রবিবার | ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ২ ফাল্গুন ১৪৩২

নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান

জনগণকে ‘কনভিন্স’ করাটাই আমাদের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’

খবর প্রতিবেদন |
০১:১১ এ.এম | ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


নির্বাচনে দুই শতাধিক আসনে জয় পেতে কোনো ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক বিএনপি’র চেয়ারম্যান রহমান বলেছেন, “আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং করেছি, জনগণকে কনভিন্স করার ইঞ্জিনিয়ারিং। জনগণকে আমাদের পক্ষে আনা এটাই ছিল আমাদের সাফল্য।” সেটাতে আলহামদুলিল্লাহ আমরা সফল হয়েছি।’
শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দিনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
নির্বাচনের আগে থেকে তারেক রহমান বলে আসছিলেন, এই নির্বাচন বিএনপি’র জন্য সহজ হবে না, এই কথা উল্লেখ করে নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ঠিকানার সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের প্রশ্ন ছিল, ‘অভয় দিলে জানতে চাই, নির্বাচনে আপনার দল যে ২১২টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, এতগুলো আসন পেতে আপনাদের নির্বাচনে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং করতে হয়েছে কি না?’ 
জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণকে কনভিন্স করাই আমাদের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। আমরা জনগণের কাছে বারবার গিয়েছি, কথা বলেছি। তাদের কনভিন্স করাই আমাদের সফলতার মূলমন্ত্র।’ তিনি বলেন, জনগণকে কনভিন্স করে একটি সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করাটাই কঠিন ছিল। যেকোনো ভালো কাজ, গোল অ্যাচিভ (লক্ষ্য অর্জন) করতে গেলে তো কষ্ট তো হবেই।
এর আগে সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে ইংরেজিতে বক্তব্য পাঠ করেন তারেক রহমান। তারপর বক্তৃতা করেন বাংলা ভাষায়। এরপর তিনি দেশি-বিদেশি অতিথিদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন।
এ সময় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং ইসলামী আন্দোলনসহ যেসব দল অংশ নিয়েছিল, সব দলকে অভিনন্দন এবং সাধুবাদ জানান তারেক রহমান।
অন্যদিকে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও নির্বাচন কমিশনের সকল সদস্যদের প্রতি তিনি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন সরকার গঠনের পথে। ভোটের দুদিন পর তিনি দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।
সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকেরা বিএনপি’র পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক খাতের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারেক রহমানকে প্রশ্ন করেন।
ভারতীয় সাংবাদিক অশোক রাজ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপি’র চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই বিএনপি তাদের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করবে।
ভারত, পাকিস্তান এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা কীভাবে হবে, তা জানতে চান যুক্তরাজ্যের দ্য ইনডিপেনডেন্টের সাংবাদিক আলিশা রহমান সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ভাগ্নি যুক্তরাজ্যের এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে চলা দুর্নীতির মামলা এগিয়ে নিয়ে যাবে কি না, সেই প্রশ্নও করেন তিনি।
এই প্রশ্নের দেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্রনীতি সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। কোনো নির্দিষ্ট দেশকে কেন্দ্র করে হবে না।
সরকার গঠন করার পর বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ কী হবে, তা জানতে চান কাতারভিত্তিক আল-জাজিরার একজন সাংবাদিক। তারেক রহমান বলেন, বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে রয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে ঠিক করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বিগত সরকার প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকীকরণ করেছে। সে জন্য সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের উন্নয়ন এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ কৌশলকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য কীভাবে দেখছেন-চীনের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করব, যা কিছু বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে না, স্বাভাবিক ভাবেই আমরা সেদিকে যাব না।’ বেল্ট এ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা যদি দেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক হয়, তখন সিদ্ধান্ত নেব।
তরুণদের বিএনপি কতটা গুরুত্ব দেবে, এমন প্রশ্ন করেন একজন বিদেশি সাংবাদিক। তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা অবশ্যই তরুণদের কথা শুনব। কিন্তু সমাজে আরও অনেকে রয়েছেন। সবার কথা ভাবতে হবে। আমাদের ইশতেহারেও আমরা সবার কথা বলেছি। সেখান তরুণের কথা আছে, বয়স্কদের কথা আছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা আছে, নারীদের কথা আছে।’
শেখ হাসিনার বিচার এবং সার্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে জানতে চান পাকিস্তানের জিও নিউজের সাংবাদিক এজাজ সাইদ। তারেক রহমান বলেন, সার্ক গঠনের উদ্যোগ বাংলাদেশের ছিল। তাদের সরকার সার্ককে সক্রিয় করতে চায়। সরকার গঠনের পর তারা এ বিষয়ে আলোচনা করবেন। শেখ হাসিনার বিচারের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এটা আইনি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে।’
সংবাদ সম্মেলনে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কোন খাতকে বেশি সম্ভাবনাময় মনে হচ্ছে, তা জানতে চান চীনের আরেকজন সাংবাদিক। তারেক রহমান বলেন, ‘অনেকের মতো চীনও বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার। আমরা আশা করছি ভবিষ্যতে দুই দেশই একসঙ্গে কাজ করবে।’
ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের সাংবাদিক ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে চাঙা করতে বিএনপি’র পরিকল্পনা জানতে চান। তারেক রহমান বলেন, তাঁরা আরও বেশি ব্যবসা নিয়ে আসবেন এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবেন।
গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে বিগত সরকারের কর্মী-সমর্থকেরা রয়েছেন। তাঁদের মূল ধারায় ফেরানোর পরিকল্পনা জানতে চান একজন বিদেশি সাংবাদিক। জবাবে তারেক রহমান আইনের শাসন নিশ্চিত করার কথা বলেন। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আইন সবার জন্যই সমান। আমরা চেষ্টা করব আইন যেন আইনের মতো করে চলে।’
বিগত সরকারের আমলে অলিগার্ক তৈরি করে অর্থনীতি ধ্বংস করা হয়েছে। এ বিষয়ে নতুন সরকার কী পদক্ষেপ নেবে জানতে চান চ্যানেল ২৪-এর সাংবাদিক জহিরুল আলম। জবাবে তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক অর্থনীতি হবে। সবাই সবার যোগ্যতা এবং মেধা ভিত্তিকে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। কোনো বিশেষ মহলকে সুযোগ দেওয়া হবে না।
বিএনপি’র চেয়ারম্যান বলেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভঙ্গুর অর্থনীতি ও পুঁজির সংকট মোকাবিলা। তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, তারল্য সংকট নিরসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হবে অগ্রাধিকার। পাশাপাশি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দলীয়করণের শিকার হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারিত্ব ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তারেক রহমান বলেন, সরকার কেবল তরুণদের নয়, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেবে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও নারীদের কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আঞ্চলিক কূটনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) বাংলাদেশের উদ্যোগেই যাত্রা শুরু করেছিল। তাই বিএনপি সরকার চাইবে সার্ক আবার সক্রিয় ও কার্যকর হোক।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবে বলেও জানান তিনি।
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বেল্ট এ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, চীন বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। তবে যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিআরআই দেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক হলে সরকার ইতিবাচকভাবে এগোবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, মেজর (অবঃ) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ডাঃ এজেডএম জাহিদ হোসেন।
বিএনপি’র মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ আহমেদ পাভেল ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাঈল জবিউল্লাহর সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, জয়নুল আবেদিন, শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, বিএনপি’র যুগ্ম-মহাসচিব হুমায়ুন কবির ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন। এর পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ