খুলনা | রবিবার | ২৪ অক্টোবর ২০২১ | ৮ কার্তিক ১৪২৮

হিংসা

ডঃ মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:০৪ এ.এম | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১

পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল­াহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘সে বলল (ইবলিস), দেখুন তো, এই কি সেই সৃষ্টি, যাকে আপনি আমার ওপর মর্যাদা দান করেছেন?’ (সূরা ইসরা; ৬২)। হিংসা’র আরবী প্রতিশব্দ হলো হাসাদ।  
শরী‘আতের পরিভাষায় হাসাদ হচ্ছে, কারো উন্নতি, প্রাচুর্য, সমৃদ্ধি বা বিত্ত-বৈভবের ভাল অবস্থা দেখে অন্তর্জ্বালায় ভুগতে থাকা এবং মনে মনে এই কামনা করা যে, তাঁর এই ভাল অবস্থাটি বিনষ্ট হয়ে যাক।
এর দৃষ্টান্ত এই যে, আমার একজন সহপাঠী আছে। সে পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে। এতে আমার মনটা জ্বলতে লাগল এবং আমি ভাবতে লাগলাম যে, সে কেন বেশি নাম্বার পেল? কেন সে আমার চেয়ে অগ্রসর হয়ে গেল? এরপর কামনা করতে লাগলাম, তার পরীক্ষা খারাপ হোক, নম্বর কম পাক, আগামী পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার না করুক, আমি প্রথম হতে পারি কী না পারি, সে যেন প্রথম না হয়। এই যে অকল্যাণ কামনা এটাই হিংসা। 
কিংবা একব্যক্তি খুব সম্পদশালী। তার উন্নতি দেখে আমার অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি হলো এবং আমি কামনা করতে লাগলাম, তার সম্পদ শেষ হয়ে যাক। উপার্জন কমে যাক। মনের এই মন্দ আকাঙ্খাই হিংসা ।
কিংবা ধরুন, সমাজে কারো সুনাম রয়েছে। লোকেরা তাকে সম্মান করে এবং পরামর্শ সহযোগিতা ইত্যাদির জন্য তার শরণাপন্ন হয়। এখন কারো অন্তরে মর্মজ্বালা উপস্থিত হলো যে, কেন লোকেরা তার কাছে যায়, কেন তাকে ভালোবাসে, এরপর এই আকাঙ্খাও জাগল যে, তার মান সম্মান নষ্ট হয়ে যাক। এটাও হিংসা । 
মানুষের অন্তরের অন্যতম একটি খারাপ গুণ হলো এই হিংসা। যা এক ভয়ানক ব্যাধি। মানুষের হীন মনমানসিকতা, শত্র“তা, অহঙ্কার, ঈর্ষাপরায়ণতা, কুটিলতা, নেতৃত্ব ও সুখ্যাতি অর্জণের লোভ, নিজের ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার ভয়, সম্পদের মোহ, পদমর্যাদার লোভ-লালসা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়, সর্বপরি ঈমানের দূর্বলতা তথা আল­াহর বিচার, ক্ষমতা ও হিকমতের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব থেকে হিংসার উৎপত্তি ও বিকাশ হয়।  
বলা হয়, হিংসা হলো পৃথিবীর প্রথম পাপ, যা আসমানে করা হয়েছিল আর তা দুনিয়ারও প্রথম পাপ। আদম আলাইহিসসাল­ামের প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়েই ইবলিশ আল­াহর অবাধ্য হয়েছিল। ইবলিসকে বলা হলো আদম আলাইহিসসাল­ামকে সিজদা দিতে। আদম আলাইহিসসাল­ামের উচ্চ মর্যাদা দেখে ইবলিস হিংসায় জ্বলে ওঠে এবং তাকে সিজদা করতে অস্বীকার করে। আর জমিনে সর্বপ্রথম হত্যাকান্ডের যে ঘটনাটি ঘটেছিল তার মূলেও ছিল হিংসা। 
হযরত ইউসূফ আলাইহিসসাল­ামের জীবন কাহিনীতেও আমরা লক্ষ্য করবো তাঁর ভাইয়েরা হিংসা করেই তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আবু জাহেল শেষ নবী মুহাম্মাদ সল­াল­াহু আলাহি ওয়া সাল­ামকে সত্য বলে স্বীকার করেও মেনে নেয়নি কারণ রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­ামের জন্ম বনু মখযূম গোত্রে না হয়ে হয়েছিল বনু হাশেম গোত্রে।
হিংসা একটি চরম ঘৃণিত বদখাসলত। যাবতীয় গুনাহের সূতিকাগার। হিংসা প্রথমে হিংসুকের নিজের জীবনটাকে তিক্ত, অতিষ্ঠ এবং বেদনাপূর্ণ করে তুলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়, তারপর পুরো সমাজ ব্যবস্থায়। হিংসা থেকে সৃষ্টি হয় গিবত ও চোগলখোরি নামের দুইটি বদখাসলত। ফলে মানুষ ঘৃণা করতে থাকে হিংসাকারীকে। মানুষের কাছে থাকেনা তার সামাজিক মর্যাদা। ছিন্ন হয় আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে তার সম্পর্ক। পরিণতিতে জুলুম, শত্র“তা, চুরি, রাহাজানি, বিশ্বাসঘাতকতার মত হেন কোনো অপরাধ নেই যা করতে সে দ্বিধা করে। অনেক সময় ভয়াবহ দ্বন্দ-কলহ ও খুনাখুনির মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়। 
হিংসা নেক আমলকে নষ্ট করে। শুকনো ঘাস আর লাকড়ি যেমন আগুনের সামনে অসহায়, হিংসার আগুনের সামনে মানুষের নেক আমলও তেমনি অসহায়। হিংসার আগুন গ্রাস করে নেয় ব্যক্তির যাবতীয় নেক আমল।
রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম ইরশাদ করেছেন, যে হিংসা মারাত্মক এক অগ্নিশিখা। এই আগুন হিংসুকের ঈমানের শেকড়গুলো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। (সুনান আবু দাউদ)
তিনি অন্যত্র বলেছেন, কোনো বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও হিংসা একত্রিত হতে পারে না। (সুনানে নাসাঈ) 
অর্থাৎ অন্তরে হয় ঈমান থাকবে, নয় হিংসা থাকবে। ঈমানদারের অন্তরে হিংসা থাকবে না, হিংসুকের অন্তরে ঈমান থাকবে না। মুমিন কখনো হিংসুক নয়, হিংসুক কখনো মুমিন নয়। অর্থাৎ পূর্ণ মুমিন নয়।
হিংসার কঠিন পরিণতি সম্বন্ধে মহানবী সল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম ইরশাদ করেছেন, ‘প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমলগুলো পেশ করা হয় এবং সব মুমিন বান্দার গুনাহখাতা মাফ করে দেওয়া হয়; কিন্তু যাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও দুশমনি আছে, তাদের ক্ষমা করা হয় না। তাদের সম্পর্কে আল­াহ তা’য়ালা বলেছেন, তাদের ছেড়ে দাও, যেন তারা ফিরে আসে অর্থাৎ মিলে যায়।’(মুসলিম)
এখানে প্রাসঙ্গিক আরো একটি বিষয়ে আলোচনা করে নেওয়া প্রয়োজন তা হচ্ছে, গীবতা বা ঈর্ষা । মানুষের ভাল অবস্থা দর্শনে অন্তরে এক প্রকার অবস্থা তৈরী হয়ে থাকে এই প্রকারের নাম হলো গীবতা তথা ঈর্ষা।
ঈর্ষা হলো অন্যের ভিতর কোন নিয়ামত দেখে নিজে উৎসাহিত হওয়া বা প্রভাবিত হওয়া এবং নিজেকেও অন্যের কৃতকার্যতার সাথে তুলনা করে আরো এগিয়ে নেয়ার মনোভাব। যেখানে কারও কোন অমঙ্গল কামনা নেই। কারও ভিতর কোনো নিয়ামত দেখে তার বিনাশ নয়, বরং নিজেরও উক্ত নিয়ামত অর্জিত হোক অনুরূপ কল্যাণ কামনা করা। যা প্রশংসনীয়।
আল­াহই সর্বজ্ঞ।
মহান আল­াহ তা’য়ালা আমাদেরকে সমস্ত প্রকার হিংসা থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন। 
লেখক: বয়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ