খুলনা | শুক্রবার | ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ৭ ফাল্গুন ১৪৩২

কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক দামে খুলনা অঞ্চলের পাটকলে উৎপাদন বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
১২:৫৭ এ.এম | ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


খুলনা অঞ্চলের ইজারা দেয়া ও বেসরকারি পাটকলগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক মিল পাটপণ্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এতে কাজ হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক, পাশাপাশি আর্থিক লোকসানে মিলগুলোও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
খুলনার দৌলতপুর এলাকার দৌলতপুর জুট মিলে প্রায় দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কাঁচা পাটের সংকটে শ্রমিকরা প্রতিদিন মিলে এসে কাজ না করেই সময় কাটাচ্ছেন। একই অবস্থা অঞ্চলের অন্তত এক ডজন মিলের। কোথাও সীমিত আকারে উৎপাদন চললেও অধিকাংশ মিলেই কার্যক্রম বন্ধ বা স্থবির। শ্রমিকদের আশঙ্কা এভাবে চলতে থাকলে স্থায়ীভাবে কাজ হারাতে পারেন তারা।
ফরচুন গ্র“পের মালিকানায় থাকা দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিক আসাদুজ্জামান বলেন, গত প্রায় দেড় মাস ধরে মিলে আসি, বসে থাকি, কোনো কাজ নেই। কাঁচা পাট না থাকায় মালিক মিল চালাতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের কাজ থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারে। কাজ থেকে ছাঁটাই করে দিলে আমরা কিভাবে সংসার চালাবো? নতুন কোনো কাজও তো খুঁজে পাবো না।
একই মিলের আরেক শ্রমিক হাবিবুল­াহ বলেন, আমাদের দিয়ে কাজ করিয়ে মালিক ২ টাকা আয় করলে আমাদেরকে ১ টাকা দিবেন। গত তিন বছর ধরে এই মিলটা ভালোই চলছিলো। কিন্তু গত দেড় মাস আমরা বসে আছি। মালিক নিজে না বাঁচলে আমাদের বাঁচাবে কি করে? কাঁচা পাটের এই সংকট দূর করতে সরকারকেই কাজ করতে হবে।
মিল মালিকরা জানান, মৌসুমের শুরুতে যে কাঁচা পাট মণপ্রতি প্রায় ৩২০০ টাকায় কেনা হয়েছিল, বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে প্রায় ৫২০০ টাকায়। দ্বিগুণের কাছাকাছি দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু বাজারে পণ্যের মূল্য বাড়েনি সে অনুপাতে। ফলে উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। 
দৌলতপুর জুট মিলের উৎপাদন কর্মকর্তা মোঃ ইসরাফিল মলি­ক বলেন, বাড়তি দামে পাট কিনে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না, আগে ৩২০০ টাকা মণ দরে পাট কিনে প্রতিটি বস্তা আমরা ৮০ টাকা দরে বিক্রি করতাম। সবশেষ ৪০০০ টাকা দরেও পাট কিনে আমরা মিল চালিয়েছি। লোকসান হলেও শ্রমিকদের দিকে তাকিয়ে মিল চালু রেখেছিলাম। কিন্তু এখন পাটের দাম ৫২০০ টাকা প্রতি মণ। এখন একটা বস্তা তৈরিতে খরচ হচ্ছে ১২০ টাকারও বেশি। কিন্তু ৮০ টাকার উপরে বিক্রয় মূল্য নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমরা গত দেড় মাস ধরে মিলে উৎপাদন বন্ধ রেখেছি।
কাঁচা পাটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এ বছর কাঁচা পাটের উৎপাদন মোটেও গত বছরের তুলনায় কম নয়। অথচ পাট উৎপাদন কম হয়েছে জানিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধি করে রেখেছে। সরকার যদি এটা তদারকি না করে তাহলে আমাদের মিল চালানো সম্ভব হবে না।
কেউ কেউ কাঁচা পাট উৎপাদন কম হওয়ার কথা বললেও কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত দুই বছর ধরে বিভাগের ১০ জেলায় উৎপাদন প্রায় একই রয়েছে। কাঁচা পাট উৎপাদনের তথ্য নিয়ে গড়মিলের হিসেব মিলেছে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যেও। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল নিয়ে গড়া খুলনা অঞ্চলের তথ্য বলছে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৩৯ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে ৯৪ হাজার ৬৬৬ মেঃ টন কাঁচা পাট উৎপাদন হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৩৮ হাজার ২৬৮ হেক্টর জমিতে পাট উৎপাদন হয়েছে ৯১ হাজার ১৩৫ মেট্রিক টন।
এ অবস্থায় মিল মালিকদের অভিযোগ ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পাট মজুত করে সিন্ডিকেট করায় দাম বাড়ছে।
বাংলাদেশ জুট মিল এ্যাসোসিয়েশন এর পরিচালক মোঃ জহির উদ্দিন সংকট সমাধানে নতুন সরকারের কাছে বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি এবং তদারকি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের একটি অসাধু মহল কাঁচা পাট মজুত করে রেখেছে অবৈধভাবে। তারাই মূলত বাজার অস্থিতিশীল করে রেখেছে। এর ফলে দাম বেড়েছে। পাশাপাশি নানা সংকট রয়েছে এ খাতে। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যায় না ঠিকমতো। এ বিষয়গুলোকে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
অন্যদিকে বাজার পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে পাট অধিদফতর। সংস্থাটির খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরজিত সরকার বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, একজন আড়তদার বা ডিলার সর্বোচ্চ এক মাস সর্বোচ্চ ৫০০ মণ পাট মজুদ করতে পারবেন। বিষয়টি ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না তা আমরা নিয়মিত তদারকি করি। কোথাও বেশি মজুত পাওয়া গেলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। দাম সহনীয় রাখতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আশা করছি দ্রুতই পাটের বাজার সহনীয় হবে।
খুলনা অঞ্চলে ইজারাকৃত ও বেসরকারি মিল মিলিয়ে মোট ২০টি পাটকল রয়েছে। এসব পাটকলে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদিত হয়, যার বড় একটি অংশ বিদেশে রফতানি করা হয়। তবে বর্তমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও রফতানি, দুই ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ