খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১৩ ফাল্গুন ১৪৩২

পিলখানা ট্র্যাজেডি’র পুনঃতদন্ত, সত্য ধামাচাপা নয়, আরো স্পষ্ট হোক

|
১২:৩১ এ.এম | ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


ফেব্র“য়ারির ২৫ তারিখ, জাতির ইতিহাসে এক বেদনার দিন। ২০০৯ সালের এই দিনে পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের সদর দফতরে নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। তাতে ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। এই দিনটি কেবল একটি বাহিনীর নয়, পুরো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব্যের ওপর গভীর আঘাতের প্রতীক। দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি। শহিদ পরিবারের চোখের পানি, বেঁচে ফেরা সদস্যদের বেদনা জেগে আছে এখনো।
এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় নতুন করে তদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন তদন্তের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। আশা করি অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় হওয়া তদন্তে যেসব প্রশ্নের জবাব এখনো বের হয়ে আসেনি, সেগুলোও এই তদন্তে স্পষ্ট হবে। এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, কোনোভাবেই যেন আগের তদন্তের স্পষ্ট প্রতিভাত বিষয়গুলো ঢেকে দেয়া বা দুর্বল করার কাজ না হয়। নতুন তদন্ত যেন কোনো সত্য আড়াল করার কৌশলে পরিণত না হয়। প্রমাণভিত্তিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্যকে আরো স্পষ্টভাবে সামনে আনতে হবে। সত্য চাপা দিলে ক্ষত সারে না, অবিশ্বাস ও বিভাজন গভীর হয়। রাষ্ট্রের শক্তি থাকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায়। তাই নতুন কমিশনের দায়িত্ব হবে, অতীতের অনুসন্ধানকে পরিপূরক তথ্য ও বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ করা।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে কেবল ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে দেখা হয়নি; বরং রাষ্ট্র ও বাহিনীকে দুর্বল করার একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্র হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ, গোয়েন্দা ব্যর্থতার দিক এবং বহিরাগত সম্পৃক্ততার বিষয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্ব প্রশংসনীয়। বিশেষ করে বাইরের শক্তির সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নটি তিনি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করেছেন। সেটি জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষণে উপেক্ষা করার মতো নয়। এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে আবেগ নয়, প্রমাণ ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা হওয়া উচিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
পিলখানা ট্র্যাজেডি’র পর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিডিআরের নাম পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু ‘বিডিআর’ নামটি শুধু একটি প্রশাসনিক পরিচয় ছিল না; এটি সীমান্তরক্ষার গৌরব ও আত্মত্যাগের স্মারক। এই নামের সাথে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্য, মনোবল ও আত্মমর্যাদা। নির্বাচনের আগে ‘বিডিআর’ নাম পুনর্বহালের প্রতিশ্র“তি ছিল বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। নাম পরিবর্তন করে অতীতের দুঃখ মুছে ফেলা যায় না, তবে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ঠিক রেখে কাঠামোগত সংস্কার ও পেশাদারিত্ব জোরদার করা প্রয়োজন। ইতিহাসকে অস্বীকার নয়, সঠিকভাবে ধারণ করাই পরিপক্বতার পরিচয়।
২৫ ফেব্র“য়ারি আমাদের জন্য কেবল শোকের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও অঙ্গীকারের দিন। শহিদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে তখনই, যখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে। আশা করি নতুন তদন্ত কমিশন অন্ধকারের ভেতর থেকে আরো সত্যকে সামনে আনার উদ্যোগ নেবে। সত্য প্রতিষ্ঠা পেলে বাহিনীর মর্যাদা পুনরুদ্ধার হবে, জাতির আস্থা দৃঢ় হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ