খুলনা | শুক্রবার | ০৪ এপ্রিল ২০২৫ | ২০ চৈত্র ১৪৩১

আশাশুনির বিছটে খোলপেটুয়া নদীর ভেড়িবাঁধ ভেঙে ১০ গ্রাম প্লাবিত

দক্ষ শ্রমিক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে বিকল্প রিংবাঁধ নিমার্ণে কাজ চলছে ধীরগতিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা ও আশাশুনি প্রতিনিধি |
০১:৩৬ এ.এম | ০৩ এপ্রিল ২০২৫


সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বিছট গ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবে) ভেড়িবাঁধ ভাঙনের ৪৮ ঘন্টা পর বুধবার সকালে ভাটার টানে প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামার সময় ধীরগতিতে ভাঙন পয়েন্টে একটি বিকল্প রিংবাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও সেনাবাহিনীর তত্ত¡াবধায়নে যশোরের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ব্রাউন ফিল্ড-এর মালিক জনৈক জাহিদ এই ভেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ করছেন।
এদিকে ভেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় আনুলিয়া ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম আংশিক ও একটি গ্রাম সম্পূর্ণ খোলপেটুয়া নদীর পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে করে ওইসব গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্লাবিত এলাকার পঞ্চাশের অধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। পানিবন্দি পরিবারের অনেকেই এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। নদীর লোনা পানিতে ডুবে গ্রামের নিম্মাঞ্চলে লাগানো বোরো ধানে পচন ধরেছে। অনেকে আবার পানিতে নিমজ্জিত কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছে। প্লাবিত এলাকা থেকে বয়ষ্ক লোকদেরকে আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পোশা গরু ও ছাগল উঁচু ভেড়িবাঁধের উপর বেধে রাখা হয়েছে। অনেকে গবাদিপশু নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছে।  তারা সাথে গো খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। পানিতে ডুবে যাওয়ায় অনেক পরিবার বাড়িতে চুলা জ্বালাতে পারছেন না। ফলে বিছট গ্রামের বেশ কিছু পরিবার তাদের বাড়িঘর ছেড় দিয়েছেন।
বিছট গ্রামের আব্দুস সবুর গাজী (৭৩) তাঁর বাড়ি দেখিয়ে বলেন, পানিতে ডুবে যাওয়ায় বাড়িঘর ছেড়ে দিয়েছেন। গত রোববার রাতে ভাত খেয়েছিলেন। তারপর শুকনা খাবার খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে আছেন। ছোট ভাই শওকত হোসেনের দোতলা বাড়ি দেখিয়ে বলেন, ওই বাড়িটিও ঝুঁকিতে পড়েছে।
একই গ্রামের আবদুল করিম জানান, বাড়ির কোথাও শুকনা জায়গা নেই যে চুলা জ্বালিয়ে বাচ্চা-কাচ্চাদের খাবার রান্না করে দেবেন। মুড়ি-চিড়া খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। শিশুদের নিয়ে সবাই সমস্যায় রয়েছেন।
বল­ভপুর গ্রামের রমজান মোড়ল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কাঁচা ধান কাটচ্ছিলেন। তিনি জানান, তিন বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন ধান ভালোই হয়েছিল। ৬০ থেকে ৭০ মণ ধান হবে বলে আসা করছিলেন। বাধ্য হয়ে কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছেন, যদি দু-চার বস্তা ধান পাওয়া যায়, এ আশায়।
বিছট গ্রামের জয়নাল মোল­া জানান, নদীর পানিতে বাড়ি ঘর তলিয়ে গেছে। উঠানে হাটুর উপরে পানি। আমার সহ আশেপাশের প্রতিবেশীর বেশ কয়েকটি কাঁচা ঘর ধসে পড়েছে। আমার বড় ভাই বৃদ্ধ কাসেম আলী মোল­াকে বাড়ি থেকে সরিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে এসেছি।
বল­ভপুর গ্রামের আফছার আলী গাজী বলেন, আমার বয়স ৬১ বছর চলে। জীবনে এরকম নদী ভাঙন আর পানি দেখেনি। রাতে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় নদীর লোনা পানিতে সবকিছু ডুবে গেছে। জিনিসপত্র গুলো ঘর থেকে সরানোর সময় পাইনি। 
বিছট গ্রামের রুহুল আমি মোড়ল জানান, রাতে জোয়ারে পুরো এলাকা পানিতে টইটম্বুর হয়ে পড়ে। বুধবার সকালের ভাটায় গ্রামগুলো থেকে পানি নদীতে নামতে শুরু করে। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিছট গ্রামের ভাঙন পয়েন্টের উত্তর-পশ্চিম পাশ দিয়ে বিকল্প রিং বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করা হয়। শ্রমিক সংকটের কারণে বাঁধ নির্মাণের কাজ ধীর গতিতে চলতে থাকে। দুপুরের দিকে জোয়ারের পানিতে ফের পুরো এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ে। 
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে আনুলিয়া ইউপির চেয়ারম্যান মোঃ রুহুল কুদ্দুস জানান, গত সোমবার রাত থেকে তাঁর ইউনিয়নের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। ঈদে তাঁর ইউনিয়নের মানুষ আনন্দ করতে পারেনি। ইতিমধ্যে বিছট, নয়াখালী, বল­ভপুর, আনুলিয়া, চেঁচুয়া ও কাকবাসিয়া গ্রামের নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হযেচে। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। চার শতাধিক মাছের ঘের ভেসে গেছে। শতাধিক বিঘার বোরো ধানের খেত তলিয়ে গেছে। শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে গেছে।
তিনি আরো জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিং বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করা হয়। জিওটিউব দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে ন্যুনতম পাঁচটি বাল্কহেড দরকার, সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড সরবরাহ করেছে মাত্র দু’টি। এ জন্য কাজ চলছে ধীরগতিতে। যত সময়ক্ষেপণ হবে, ততই বাঁধের ভাঙনের পরিধি বাড়বে।
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাল্কহেড পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না দক্ষ শ্রমিক। তারপরও আজ সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিং বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করেছেন। আধুনিক পদ্ধতির জিওটিউব দিয়ে বাঁধের কাজ চলছে। এটি সফল হলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পানি আটকানো সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
আশাশুনি : আমাদের প্রতিনিধি জানান উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছটে খোলপেটুয়া নদীর ভেড়িবাঁধ ভেঙে ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি, মৎস্য ঘের ও পোল্টি মুরগির খামার। প্লাবিত এলাকার বানভাসি মানুষ সহায় সম্বল হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ভাঙ্গণ পার্শ্ববর্তী পাউবো বাঁধের উপরে। মানুষ ও গো-খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় সূত্রে ও সরজমিন ঘুরে জানা গেছে, বিছট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন পশ্চিম ধারে পাউবো'র বেড়ী বাঁধে বেশ কিছু দিন পূর্বে ফাটল দেখা দিয়েছিল। এতে বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হলে স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে থাকে। অবশেষে গত ৩১ মার্চ সোমবার (ঈদ-উল-ফেতরের দিন) সকাল ৮টার দিকে জোয়ারে চাপে বাঁধ ছাপিয়ে খোলপেটুয়া নদীর লোনা পানি ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে। স্থানীয়রা জানতে পেরে পানি রক্ষা করার চেষ্টা করার আগেই বাঁধের ১০/১৫ হাত ভেঙে নদীগর্ভে চলে যায়। ফলে নদীর পানি প্রবল বেগে ভেতরে প্রবেশ করে বিছট গ্রাম প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি, মৎস্য ঘের, ফসলি জমি, পুকুর, পোল্টি ফার্ম।
ঈদ-উল-ফেতরের নামাজরত অবস্থায় মুঠোফোনে খবর পেয়ে আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস, ইউপি সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছে তড়িত সিদ্ধান্তে ৯টার দিকে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ শুরু করে প্রাথমিকভাবে ছোট করে রিং বাঁধ দেয়। কিন্তু দুপুর ১২ টার দিকে জোয়ারের পানি অধিক ফেপে রিং বাঁধ ছুটে গিয়ে মুহুর্তের মধ্যে ৪০/৫০ ফুট বাঁধ ভেঙে যায় এবং প্রবল বেগে ভেতরে পানি প্রবেশ করতে থাকে। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কৃষ্ণা রায়, সাতক্ষীরা থেকে পাউবো কর্তৃপক্ষ উপজেলা পর্যায়ের বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। জোয়ারের পানি ভেতরে প্রবেশ ও ভাটায় নদীতে পানি নিস্কাশনকালে বাঁধের ভাঙন বাড়তে বাড়তে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত  (১ এপ্রিল সন্ধ্যা) বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩০০ ফুট নদীগর্ভে চলে গেছে। ইউনিয়নের বিছট, নয়াখালী, বল­ভপুর, আনুলিয়া, কাকবাসিয়াসহ ১০ গ্রাম পানিতে ডুবে প্লাবিত হয়ে পানি বন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ১২শ’ পরিবার। পানিতে ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বিঘা মৎস্য ঘের, ২১ হেক্টর ফসলি জমি, পুকুর, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামার। ১০০ অধিক কাচা ঘর বাড়ী পানিতে ডুবে ভেঙে গেছে। এসব প্লাবিত এলাকার মানুষের রান্না খাবার, হাঁস-মুরগি ও গো খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে। প্লাবিত এলাকার বানভাসি মানুষ পার্শ্ববর্তী আশ্রয়কেন্দ্র ও পাউবো’র বাঁধে খোলা আকাশের নীচে আশ্রয় নিয়েছে। আবার কেউ কেউ অন্য গ্রামে আত্মীয়ের বাড়ি উঠেছে। মাঝে মাঝে বেশ কিছু যুবককে পানি বন্দি এলাকার মানুষের মাঝে শুকনা খাবার সরবরাহ করতে দেখা গেছে।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিত মজুমদার জানান, নদীর পানিতে এ পর্যন্ত ৩০০ থেকে ৩৫০টি মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। প্রায় ৪৫০০ বিঘা জমির মৎস্য ঘেরের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শুভ্রাংশু শেখর দাশ বলেন, প্রাথমিক হিসাবে ২০ হেক্টর জমির ধান ক্ষেত ও দেড় হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বাঁধ রক্ষা না হলে এলাকার ধান, সবজী, তরমুজ চাষিরা চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ জানান, পাউবো’র ১ ও ২ নং পোল্ডারের কর্মকর্তাদের একসাথে হয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করে দ্রুত বাঁধ বাধার কাজ সম্পন্ন করতে বলেছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাঁধ বাধা হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। পাউবো'র নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, বাঁধ বাধার কাজ সম্পন্ন করার দ্রুত পরিকল্পনা চালাচ্ছি। আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি সকলকে আশ্বস্ত করেন। 
ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস জানান, আগামী ৪/৫ দিনের মধ্যে যদি বাঁধ বাধা সম্ভব না হয় তাহলে পার্শ্ববর্তী খাজরা, বড়দল ও প্রতাপনগর এলাকা প্লাবিত হবে। ভাঙনস্থান পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার কৃষ্ণা রায়, আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপি'র সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস, প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদ ঢালী, উপজেলা বিএনপি’র সাবেক আহবায়ক স, ম হেদায়েতুল ইসলাম, উপজেলা জামায়াতের কর্ম পরিষদ সদস্য মাওঃ নুরুল আফসার মুরতাজাসহ স্থানীয় জনপ্রতিধি, উপজেলা ও ইউনিয়ন বিএনপি এবং জামায়াতের নেতা-কর্মীবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। 

্রিন্ট

আরও সংবদ