খুলনা | শুক্রবার | ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

থামছে না নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা : পুরুষ শূন্য ঝিনাইদহের ২ গ্রাম, আতঙ্কে নারী-শিশুরা

খাইরুল ইসলাম নিরব, ঝিনাইদহ |
০২:১২ এ.এম | ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ঝিনাইদহে থামছে না নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা। ঝিনাইদহ-৪ আসনের সদর উপজেলার ফুরসন্দি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে বিএনপি’র দুই গ্র“পের সংঘর্ষে বাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর এবং পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলা হলেও তা ফলপ্রসু নয় বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এক পক্ষ ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ইউনিয়ন বিএনপি’র আহŸায়ক জাহিদ বিশ্বাস এবং অপর পক্ষ স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাপ-পিরিচ প্রতীকের পক্ষে ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি সাহাবুর রহমান নির্বাচনে প্রচারণা চালান। ভোটকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ পরিস্থিতিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অভিযোগে দু’টি গ্রামের অন্তত ৫০ পরিবারের পুরুষ সদস্যরা গ্রামছাড়া হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রামে অবস্থানরত নারী ও শিশুরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সরেজমিনে সদর উপজেলার ফুরসন্দি ইউনিয়নের মাড়ুন্দি বনকুমড়াপাড়া ও  ফুরসন্দি ল²ীপুর গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি সাহাবুর রহমানের গ্রæপের প্রায় প্রতিটা বাড়িতে রয়েছে হামলা ও ভাঙচুরের ক্ষত। এই দুই গ্রামের অন্তত ৫০ পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। নারী ও শিশুদের অভিযোগ, রাত হলেই প্রতিপক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে গ্রামের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। পুরুষ সদস্য কাউকে পেলেই মারধর করছেন। এই দু’টি গ্রামের কেউ ভয়ে একা ফসলের ক্ষেতেও যেতে পারছেন না।
মাড়ুন্দি বনকুমড়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মশিউর রহমান বলেন, ২২ ফেব্র“য়ারি ভোরে ইউনিয়ন বিএনপি’র আহŸায়ক জাহিদ বিশ্বাসের সমর্থক ইউপি সদস্য হায়দার আলীর নেতৃত্বে কয়েকশ’ লোক ঢাল-সড়কি নিয়ে গ্রামে হামলা করেন। সামনে যাকে পান তাকেই মারধর করেন। তাঁরা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণও ঘটান। তিনিও তাঁদের হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন দুইদিন। পুলিশের উপস্থিতিতেই তাঁরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ছয়জন আহত হন।
গোলাম নবী মন্ডল নামের এক ব্যক্তির স্ত্রী মাজেদা খাতুন বলেন, ‘আমরা স্বামী প্রায় ১০ বছর ধরে হার্টের রোগী। সে এখন হামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা সবাই বিএনপি করি, কিন্তু আমরা এই নির্বাচনে কাপ-পিরিচে ভোট দিয়েছি। আমার স্বামী কাপ-পিরিচের পক্ষে প্রচারণা করেছিল। সেই কারণে ভোটের দিন রাত থেকেই বাড়িঘরে হামলা করছে। রাতে বাড়ির বাইরে বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে রাখলেও তারা এসে খুলে নিয়ে যাচ্ছে।’
রিপন মন্ডলের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘আমাদের বাড়ির কোনো পুরুষ মানুষ বাড়িতে নেই। আমি মহিলা মানুষ হয়েও বাড়িতে পুরুষ লোক না থাকায় ধানের খেতে সেচ দিয়ে আসলাম। না হলে ধানের খেত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দিনের মধ্যে কয়েকবার জাহিদ বিশ্বাস ও হায়দার মেম্বারের গ্র“পের লোকজন হাতে দা-সড়কি নিয়ে খুঁজতে আসছে।’
বাশারুল মন্ডলের স্ত্রী শাহানাজ পারভীন বলেন, ‘বিকেলে ইফতার তৈরি করছিলাম। আমার পাঁচ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী ছেলে ঘরের বারান্দায় শুয়ে ছিল। সে হাঁটতে পারে না। হঠাৎ প্রতিপক্ষ দলের লোকজন ঢাল-সড়কি ও রামদা নিয়ে এসে আমাদের ঘরের দরজা ও চালে কোপানো শুরু করে। আমরা ছেলেকে ঘরের বারান্দা থেকে ঠেলে উঠানে ফেলে দেয়। তখন আমার শ্বশুর তাদের কাছে করজোড়ে মিনতি করলে তারা বাড়ি থেকে চলে যায়।’
মাড়ুন্দি বনকুমড়াপাড়ার আলী হাসানের স্ত্রী শর্মিলা খাতুন বলেন, ‘ভোরে অন্য গ্রামের শত শত লোক এসে আমাদের গ্রামে হামলা চালায়। বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়।’
এই গ্রামের জাহাঙ্গীর মন্ডল বলেন, ‘ভোটের দিন-রাত থেকেই আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। ফুরসুন্ধি ল²ীপুর গ্রামের অনেক বাড়ি ভাঙচুর করেছে জাহিদ বিশ্বাস ও হায়দার মেম্বরের লোকজন। তারা প্রতিনিয়ত ঢাল-সড়কি নিয়ে গ্রামের মধ্যে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। কাপ-পিরিচের ভোট করা কাউকে পেলেই মারধর করছে।’
এ বিষয়ে ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি সাহাবুর রহমান বলেন, ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ইউনিয়ন বিএনপি’র আহŸায়ক জাহিদ বিশ্বাসের লোকজন মাড়ুন্দি বনকুমড়াপাড়া ও ল²ীপুরে হামলা চালিয়ে ৫০-৬০টি বাড়ি ও কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করেছে।
অপর দিকে ইউনিয়ন বিএনপি’র আহŸায়ক জাহিদ বিশ্বাস বলেন, ‘সাহাবুরের লোকজনের ভয়ে আমার লোকেরা বাড়িতে থাকতে পারছে না। তার লোকজনের হামলায় আহত হয়ে কেউ মাগুরায়, কেউ ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।’
জাহিদ বিশ্বাস বলেন, ‘সারা ইউনিয়ন আমি ভালো রেখেছি। কিন্তু এই দুই গ্রামের লোকজন তাদের সামাজিক কারণে হামলা ও পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে। উভয় পক্ষের লোক আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে সামাজিক দ্ব›দ্ব ছিল।’ জাহিদ বিশ্বাস আরও বলেন, হায়দার মেম্বারের ওপর যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটাও সত্যি নয়। হায়দার মেম্বর ভালো মানুষ।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘সামাজিক দ্ব›েদ্বর জেরে এই ঘটনা ঘটেছে। ওই এলাকায় পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় নারিকেল বাড়িয়া ক্যাম্পে জনবল বাড়ানো হচ্ছে। আমি নিজেও ওই এলাকায় গিয়েছি। আমরা লোকজনকে বুঝিয়েছি, তারা যেন কোনো প্রকার সহিংস ঘটনায় আর না যায়। গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেব। তবে বাড়িতে যাঁরা থাকতে পারছেন না, তাঁদের তথ্য আমাদের কাছে নেই। তাঁরা অভিযোগ করলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’
প্রসঙ্গত, ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের ৪টি ইউনিয়ন) আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন পান গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া মোঃ রাশেদ খান। বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে কাপ-পিরিচ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ