খুলনা | রবিবার | ২৪ অক্টোবর ২০২১ | ৮ কার্তিক ১৪২৮

বিদ্বেষ

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:১৮ এ.এম | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

‘কীনা’ আরবি শব্দ, অর্থ হলো পরশ্রীকাতরতা, গোপন শত্র“তা, সঙ্কীর্ণমনতা। পরিভাষায় কীনা হচ্ছে, অন্যের প্রাপ্তি বা সফলতায় দুঃখিত বা কাতর হওয়া। কীনা দোষে দুষ্ট ব্যক্তি সব কিছুই নিজের জন্য চায় এবং সর্বদা অন্যের অপ্রাপ্তি ও ব্যর্থতা কামনা করে অন্যকে কষ্ট দেওয়ার পন্থা অন্বেষণ করে।
আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল­াহি আলাইহি বলেছেন, কীনা হল স্বেচ্ছায় কারো অকল্যাণ কামনা অন্তরে পোষণ করা এবং তাকে কষ্ট দেওয়ার পন্থা অন্বেষণ করা। (আনফাসে ঈসা)
সায়েখুল ইসলাম আল­ামা মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেছেন, কারো দ্বারা যদি আপনি কষ্ট পেয়ে থাকেন এবং এর কারণে তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়, আর এই ঘৃণার কারণে তার ক্ষতিতে আপনার মনে আনন্দ জাগে তাহলে একে ‘হিকদ’ বলা হয়। অর্থাৎ আপনার মনে কীনা রয়েছে। কীনার ব্যাখ্যা এই যে, কোন ব্যক্তি আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, যার কারণে আপনার মনে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগ্রত হয়েছে, কিন্তু যেমন প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছা ছিল তা নেওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই আপনার মনে চাপা ক্রোধ ও ঘৃণা সৃষ্টি হল। এখন তার কোন ক্ষতির সংবাদ আপনাকে আনন্দিত করছে। আপনি তার ক্ষতি কামনা করছেন। এই অবস্থাটাকে কীনা বলা হয়। (ইসলাম আওর হামারী যিন্দেগী)
ইমাম গাযযালী রহমাতুল­াহি আলাইহি বলেছেন, যখন মানুষ ক্রোধের প্রতিশোধ নিতে অসমর্থ হয়, তখন ক্রোধ হজম করে নিতে হয়, ফলে তা অন্তরে পতিত হয়ে বিদ্বেষ হয়ে যায়। বিদ্বেষের অর্থ হচ্ছে কাউকে অসহ্য মনে করা এবং তার প্রতি অন্তরে শত্র“তা ও ঘৃণা পোষণ করা। (এহইয়াউ উলুমিদ্দীন)
কেউ কাউকে কষ্ট দিলে যদি সঙ্গে সঙ্গে সে ওই কষ্টের প্রতিশোধ নিয়ে নিতে পারে তাহলে মনে আর ক্ষোভ থাকে না। কিন্তু আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যদি কোনো কারণে কেউ প্রতিশোধ নিতে না পারে, তাহলে অন্যায়কারীর প্রতি মনে ক্ষোভ জন্ম নেয়। আর এ ক্ষোভ নিরসনের কোনো পথ যখন তার সামনে থাকে না, তখনই ধীরে ধীরে এ ক্ষোভ বিদ্বেষে রূপ নেয়। যখন নিজে প্রতিশোধ নিতে না পারে তখন কামনা করে, তার যদি কোনো ক্ষতি হতো। পাশাপাশি এ অপেক্ষায়ও থাকে যে, যদি কখনো সুযোগ পায় তাহলে আমি তাকে দেখে নেব! আমাকে সে আর কতটুকু ভুগিয়েছে, আমি তাকে এর দশগুণ ভোগাব! এটাই হচ্ছে বিদ্বেষের কুফল। মোটকথা চাপা ক্ষোভ আর বিদ্বেষের ফলে মানুষ যখন প্রতিশোধ নেয় তখন সে আঘাতপ্রাপ্ত থাকার পরিবর্তে আঘাতকারী হয়ে পড়ে এবং সাধারণত মাত্রা রক্ষা করতে না পেরে সীমালঙ্ঘন করে ফেলে।
এছাড়াও বিদ্বেষের ফলে, পারস্পরিক হিংসা, শত্র“তা, সম্পর্ক ছিন্ন করা, অপরের গীবত করা, গোপন তথ্য ফাঁস করা, দৈহিক কষ্ট দেওয়া, কিছু প্রাপ্য থাকলে তা শোধ না করা এবং অপরকে নিকৃষ্ট ও হেয় মনে করার মত জঘন্য কার্ম গুলি সংঘটিত হয়।
হাদীস শরীফেও বিদ্বেষ পোষণকারীদের উদেশ্যে বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিভিন্ন উপস্থাপনায় সতর্কবানী উচ্চারিত হয়েছে। বিদ্বেষের ভয়াবহতা আমরা একটি হাদীস থেকে কিছুটা আন্দাজ করতে পারি। হযরত রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বলেছেন, অর্ধ শাবানের রাতে (অর্থাৎ শবে বরাতে) আল­াহ তা’য়ালা তাঁর সকল সৃষ্টিকেই ক্ষমা করে দেন। তবে তিনি মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারীকে ক্ষমা করেন না।(সুনানে ইবনে মাজাহ)
আরেক হাদীসে রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বলেছেন- প্রতি বৃহস্পতিবার ও সোমবার মানুষের আমল (আল­াহ তা’য়ালার সামনে) পেশ করা হয়। তখন আল­াহ এমন সকল মানুষকে ক্ষমা করে দেন, যে তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না। তবে এমন দু’জনকে তিনি ক্ষমা করেন না, যাদের অন্তরে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ রয়েছে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়-তাদের দু’জনকে দেখো, তারা একে অন্যের সঙ্গে মিলে যায় কি না। (মুসলিম)
এই বিদ্বেষ বান্দার আমল কবুল হওয়ার পথে এক শক্ত দেয়াল। প্রতি সপ্তাহে দু’দিন যখন বান্দার যাবতীয় আমল আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়, আর আল­াহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে ঘোষিত হয় সাধারণ ক্ষমা, তখনো বিদ্বেষ পোষণকারীরা বঞ্চিত। (বিদ্বেষ : আমল কবুলের এক শক্ত অন্তরায়)
যা বিদ্বেষ নয় : এখানে একটি বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার যে, অনেক সময় আমরা বিদ্বেষ নয় এমন বিষয় সমূহকে বিদ্বেষ মনে করে থাকি। বস্তুত বিদ্বেষ তখনি অবয়ব পায় যখন একজন অন্য জনের ক্ষতি করার জন্য প্রস্তুত হয় এবং পরিকল্পনা করে কষ্ট দিতে থাকে। তখন একে বিদ্বেষ বলে। কিন্তু শুধু এতটুকু অবস্থা যে, তার সঙ্গে স্বভাব ও রুচিবোধের মিল হয় না এবং তার সঙ্গে মিলিত হতে ইচ্ছা হয় না। তাহলে এটা বিদ্বেষ নয়, স্বভাবের দূরত্ব। অতএব কারো সঙ্গে সাক্ষাত, মেলামেশা ইত্যাদিতে অস্বস্তিবোধ হলে সাক্ষাত নাই করলেন কিন্তু তার ওয়াজিব হক গুলো আদায় করতে হবে। যেমনঃ দেখা হলে সালাম করা, সালাম দিলে উত্তর দেওয়া, অসুস্থ হলে খোঁজ-খবর নেওয়া, ইন্তেকাল হয়ে গেলে জানাযায় শরীক হওয়া, তার সুখে-দুঃখে সহমর্মিতা প্রকাশ করা। এটা অপরিহার্য নয় যে, তার সাথে মেলামেশা করতে হবে, সকাল সন্ধা তার সাথে মজলিসে বসতে হবে, হাশি-তামাশা করতে হবে। তবে এটা অপরিহার্য যে, তার অনিষ্ট কামনা হতে বিরত থাকতে হবে।
এই কথাটাই হযরত আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল­াহি আলাইহি এক মালফুযে উলে­খ করেছেন, ‘যদি কারো পক্ষ থেকে কষ্টের কোন বিষয় ঘটে এবং তার সাথে মেলামেশা ভাল না লাগে তাহলে এটা স্বভাবজাত দূরত্ব ও আড়ষ্টতা, এটা গোনাহ নয়’।(আনফাসে ঈসা, ইসলাম আওর হামারী যিন্দেগী)
যে বিদ্বেষ নিন্দনীয় নয় : বিদ্বেষের আরেকটি দিক আছে, যেটা নিন্দনীয় নয় মোটেও। বরং শরীয়তের দৃষ্টিতেই তা খুবই পছন্দনীয়। সেটার শিরোনাম দেয়া যায়- ‘আলহুব্বু ফিল­াহ ওয়াল বুগযু ফিল­াহ’ অর্থাৎ আল­াহর জন্যেই ভালোবাসা এবং আল­াহর জন্যেই বিদ্বেষ। দ্বীনের জন্যে, আল­াহ তা’য়ালার জন্যে কেউ যদি কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তাহলে তা পুরস্কারযোগ্যও। আল­াহ তা’য়ালার হুকুম যারা হরহামেশা অমান্য করে চলে, যারা তাঁর অবাধ্য, সাধারণ মুসলমানদের ঈমানের পথে আমলের পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাদের প্রতি মুমিন বান্দার অন্তরে বিদ্বেষ থাকাই স্বাভাবিক। এ বিদ্বেষ ঈমানের দাবি।
হাদীস শরীফে রসূলাল­াহ্ সল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম বলেছেন, যে আল­াহর জন্যেই ভালোবাসে, আল­াহর জন্যেই বিদ্বেষ পোষণ করে, আল­াহর জন্যেই দান এবং আল­াহর জন্যেই দান থেকে বিরত থাকে, সে তো ঈমানকে পূর্ণ করে নিল। (সুনানে আবু দাউদ)
আল­াহই সর্বজ্ঞ। মহান আল­াহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে বিদ্বেষমুক্ত হওয়ার তৌফিক দান করুন। (আমিন)।
লেখক : বায়োকেমিস্ট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয়, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ