খুলনা | বুধবার | ০৪ মার্চ ২০২৬ | ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২

থামছেই না বন্যপ্রাণী শিকার-পাচার হুমকিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:২৪ এ.এম | ০৪ মার্চ ২০২৬


দেশে বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারের দৌরাত্ম্য কমছেই না। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য বলছে, প্রতিবছর গড়ে চার হাজারের বেশি বন্যপ্রাণী শিকার বা পাচারের শিকার হচ্ছে। এর বড় একটি অংশই আসে সুন্দরবন থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর ভাবে এসব অপরাধ ঠেকাতে বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব দফতরের সমন্বিত ও সক্রিয় ভ‚মিকা প্রয়োজন।
পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। এটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নয়, হাজারো বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। নদীবেষ্টিত এই বনে হরিণ, বানর, বন্য শূকরসহ নানা প্রজাতির প্রাণী পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
তবে এই জীববৈচিত্র্যই চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের টার্গেট। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য বলছে, ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ৬০ হাজার ২০৯টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। দুই হাজারের বেশি ঘটনায় মামলা হলেও গ্রেফতার হয়েছে মাত্র ২৩১ জন। 
তথ্য বলছে, শিকার বা পাচারের শিকার হওয়া প্রাণীর মধ্যে ৩৫ শতাংশই বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। শুধু ২০২৫ সালেই ৩ হাজার ৫২০টি পাখি উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। এছাড়া তালিকায় রয়েছে ২৮ শতাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণী, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিকার হয় চিত্রা হরিণ। মাঝে মধ্যেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকারের ঘটনাও সামনে আসে, যা পরিবেশবিদদের উদ্বিগ্ন করছে। 
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ জানায়, গত পাঁচ বছরে সুন্দরবনে বাঘ, হরিণ, শ‚কর ও বানরসহ কয়েকটি প্রজাতির সংখ্যা বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক শিকার ও পাচারের ঘটনা এই ইতিবাচক অগ্রগতিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিশেষজ্ঞ মোঃ মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, একদিকে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি সুন্দরবনের জন্য ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। অন্যদিকে পাচার ও শিকারের ঘটনা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে সুন্দরবন থেকে হরিণ পাচার বা শিকার বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ একটি প্রজাতি কমে গেলে পুরো জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব পড়ে। তাই এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি এ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম মনে করেন, শুধু আইন থাকলেই হবে না, কঠোর প্রয়োগ ও জনসচেতনতা দু’টিই বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বন্যপ্রাণী উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও অপরাধ কমছে না। এজন্য বন বিভাগকে আরও সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি বননির্ভর ও বনসংলগ্ন এলাকার মানুষদের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে যুক্ত করতে হবে। এতে অপরাধ কমবে এবং তাদের বিকল্প আয়ের সুযোগও তৈরি হবে। 
সুন্দরবনে গড়ে ওঠা বনদস্যুরাও এসব অপরাধে জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে বনদস্যুর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানা গেছে। তবে নতুন সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুন্দরবনে অপরাধ কমাতে সরকার বদ্ধপরিকর। বন বিভাগসহ কোস্ট গার্ড, র‌্যাব, নৌ-পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারা অপরাধ দমনে কাজ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অফ নেচারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৬১৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে।
 

প্রিন্ট