খুলনা | বুধবার | ০৪ মার্চ ২০২৬ | ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২

ঘাতকদের লোমহর্ষ জবানবন্দি

দেড় বছর পর কাজিবাছা নদী থেকে উদ্ধার মাথাবিহীন নারীর পরিচয় শনাক্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০২:০০ এ.এম | ০৪ মার্চ ২০২৬


খুলনার কাজিবাছা নদী থেকে গত বছরের ১৯ আগস্ট মাথা ও পোশাকবিহীন এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। হাত পচে যাওয়ায় আঙুলের ছাপ দিয়ে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। এ ঘটনায় ২০ আগস্ট বটিয়াঘাটা থানায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে অজ্ঞাত পরিচয় লাশটি দাফন করা হয় নগরীর গোয়ালখালী কবরস্থানে। এরপর সবাই বিষয়টি ভুলে গিয়েছিল।
মরদেহ উদ্ধারের দেড় মাস পর গত ৮ অক্টোবর খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সাজিয়াড়া গ্রামের সালেহা বেগম নামের এক নারীকে অপহরণের অভিযোগ তুলে নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন তাঁর ছেলে শামীম ফকির। আদালত মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। দায়িত্ব পান সংস্থার উপ-পরিদর্শক রেজোয়ান। 
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলার বাদী তাদের জানান, তাঁর মা ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সৌদে আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। দেশে ফিরে ২০২৪ সালে ঢাকায় আরেক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে যান। গত ১৯ আগস্ট থেকে তাঁর মোবাইল নম্বর বন্ধ পাচ্ছেন। প্রতিবেশী লালন গাজীর সঙ্গে তাঁর মায়ের ভালো সম্পর্ক ছিল। এজন্য তাঁরা লালনকে সন্দেহ করছেন।
পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে ওই নারীর মোবাইল কললিস্ট উদ্ধার করা হয়। তাতে দেখা যায়, এক বছর ধরে নম্বরটি পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে ছিল; যার সর্বশেষ অবস্থান ছিল বটিয়াঘাটার গজালিয়া গ্রামে। ওই নারীর ছবিসহ ইন্দুরকানীর চারাখালী বালুর রাস্তা এলাকায় পাঠানো হয় তাঁর ছেলেকে। স্থানীয় মুদি দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সালেহা বেগম এক বছর ধরে তাঁর স্বামীর সঙ্গে ওই এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়া ছিলেন। 
খবর পেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ওই ভাড়া বাড়িতে যান। সালেহা বেগম এবং লালনের ছবি দেখানো হলে প্রতিবেশীরা তাদের শনাক্ত করেন। তারা জানান, ওই নারী একাই বাড়িতে থাকতেন। ১০/১৫ দিন পরপর স্বামী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি ওই বাড়িতে আসতেন। গত ১৯ আগস্ট তারা একসঙ্গে মামা বাড়িতে বেড়াতে যান। এরপর ২৫ আগস্ট লালন একা ফেরত এসে ঘরের মালপত্র নিয়ে বাড়ি ছেড়ে দেন। মুদি দোকানের বাকি টাকাও পরিশোধ করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক রেজোয়ান বলেন, ‘সন্দেহজনক তথ্য পেয়ে আমরা বটিয়াঘাটার সর্বশেষ লোকেশন খুঁজতে থাকি। সেই সঙ্গে থানায়ও খোঁজ নেই। তখন জানতে পারি ১৯ আগস্ট রাতে নদী থেকে এক নারীর মাথাবিহীন লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। থানায় সংরক্ষণ করা ছবি দেখে পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। তখন তাঁর হাতের একটি ছবি পাওয়া যায়, সেখানে মেহেদী দেওয়া এবং আংটি পরা ছিল। ওই ছবি নিয়ে ডুমুরিয়ার সাজিয়াড়া গেলে স্বজনরা ওই হাতটি সালেহা বেগমের বলে সন্দেহ করেন। তখন আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করেন তিনি। পরীক্ষায় তাঁর ছেলেদের ডিএনএ এবং পুলিশের কাছে সংরক্ষিত ওই অজ্ঞাত নারীর ডিএনএ মিলে যায়। অজ্ঞাত লাশটি সালেহার নিশ্চিত হওয়ার পর বটিয়াঘাটা থানায় দায়ের করা হত্যা মামলাটি পিবিআইতে নিয়ে আসা হয়। এই মামলার দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়।
এরপর সর্বশেষ লোকেশন অনুযায়ী বটিয়াঘাটার গজালিয়া গ্রামে লালনের মামাতো ভাই সিজার মোল­ার বাড়ি থেকে সালেহা বেগমের জামাকাপড় উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে গত ১৯ ডিসেম্বর লালন গাজীকে গ্রেফতার করা হয়। 
আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে লালন স্বীকার করেন, দেশে ফেরার পর সালেহা বেগমের জমানো ১৫/১৬ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিতে তিনি তাঁকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন। ইন্দুরকানীতে তাঁর ব্যবসা ছিল। তখন সালেহা বেগমকে ইন্দুরকানীতে নিয়ে ভাড়া বাসায় রাখেন। এক বছর যেতেই সালেহা তাঁকে রেজিস্ট্রি বিয়ে করার জন্য চাপ দেন এবং বিয়ে না করলে তাঁর বাড়িতে গিয়ে উঠবেন বলে জানান। তখন লালন গাজী হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁকে বটিয়াঘাটায় মামাতো ভাই সিজার মোল­ার বাড়িতে নিয়ে যান। ১৯ আগস্ট সিজার মোল­া মিলে সালেহা বেগমকে হত্যা করা হয়। লাশের পরিচয় লুকানোর জন্য মাথা কেটে ফেলা এবং জামাকাপড় খুলে ফেলা হয়। তাঁরা সবকিছু নদীতে ফেলে দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলার অন্যতম আসামি সিজার মোল­াকে গ্রেফতার করতে না পারায় তদন্ত আটকে ছিল। সিজার মোল­া অত্যন্ত ধুরন্ধর হওয়ায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন না এবং নিজের পরিবারসহ এলাকার কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। অনেক চেষ্টার পর গত ১ মার্চ রাজধানীর হাতিরঝিল থানার মগবাজার এলাকা থেকে সিজার মোল­াকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর স্বীকারোক্তিতে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত একটি হাঁসুয়া উদ্ধার করা হয়। গত ২ মার্চ রাতে সিজার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পুরো ঘটনা স্বীকার করেন। হত্যাকান্ডের তদন্তও শেষ হওয়ায় এখন আনুষ্ঠানিকতা শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। 
নিহতের ছেলে শামীম ফকির বলেন, ‘মাকে তো ফেরত পাব না। হত্যাকারীদের ফাঁসি হলে কিছুটা শান্তি পাব।’

প্রিন্ট

আরও সংবাদ