খুলনা | শুক্রবার | ০৬ মার্চ ২০২৬ | ২১ ফাল্গুন ১৪৩২

খুলনায় মাসুম হত্যাকান্ড পূর্ব শত্রæতা ও আধিপত্য বিস্তারের জের

কিলিং মিশনে অংশ নেয় ৮ সদস্য : আটক ২

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:২৪ এ.এম | ০৬ মার্চ ২০২৬


নগরীর ডাকবাংলা মোড়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহ (৪৮) হত্যাকান্ডের ঘটনায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা হয়েছে। সিসি টিভি’র ফুটেজ ও উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, মাসুম বিল্লাহকে হত্যার জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা কন্ট্রাকে একটি বিশেষ গ্র“পের ৮ সদস্য কিলিং মিশনে অংশ নেয়। এর মধ্যে দুই জনকে আটক করেছে পুলিশ। 
সূত্র জানায় হত্যাকান্ডে অংশ নেয় সন্ত্রাসীদের তিনটি গ্র“প। পূর্ব শত্র“তা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে আটক অশোক ঘোষকে নিয়ে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ মহানগরীর সোনাডাঙ্গা ট্রাক টার্মিনাল ২২ তলা ভবনের পাশ থেকে মোঃ জাবেদ গাজী নামে আরেকজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। আটক জাবেদ ট্রাক টার্মিনাল এলাকার বাসিন্দা আশরাফ আলীর ছেলে।
কেএমপি উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মাদ তাজুল ইসলাম বলেন, হত্যার পরিকল্পনা করা হয় অনেক আগে থেকে। বিভিন্ন সময় হত্যাকারীরা সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু গত বুধবার রাতে সে সময় তাদের হয়ে যায়।
মাসুম হত্যা মিশনে সন্ত্রাসীদের তিনটি গ্র“প কাজ করেছে। তাদের মধ্যে একটি গ্র“প মাসুমের গতিবিধি খুনিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। অপরটি মিশনে অংশ নেওয়া সদস্যদের কাজ হওয়ার পর নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া। অন্য গ্র“পটি হত্যা মিশন সফল করবে।
তিনি বলেন, হত্যা মিশনে ৮ জন সদস্য ছিল। তারা সকলে গল্লামারি থেকে ময়লাপোতা মোড়ে মিলিত হয়। সেখান থেকে অস্ত্র নিয়ে তারা ডাকবাংলো মোড়ে আসে। সন্ধ্যার পর মাসুমসহ পরিবারের সদস্যরা কেনাকাটার জন্য মার্কেটে আসেন। এ তথ্য দেওয়ার পর হত্যাকারীরা মাসুমকে প্রথমে ধাওয়া দেয়। তাদের ধাওয়া খেয়ে মাসুম নিরাপত্তার জন্য ডাকবাংলা মোড় বাটার শো-রুমে প্রবেশ করে। পিছু নিয়ে সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শরীরে একাধিক স্থানে আঘাত করতে থাকে। পরে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে দু’জন সন্ত্রাসী। 
তিনি আরও বলেন, এর আগে হত্যা মিশন সম্পন্ন করার জন্য অশোক ঘোষকে ৫০ হাজার টাকার দেওয়া হয়। মিশন শেষ করার পর তারা যে যার মতো করে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যায়। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সকল সদস্যদের নাম জানতে পেরেছি। তাদের গ্রেফতারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। আরও কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করতে পারলে হত্যার মূল মোটিভ বের হয়ে আসবে।
অশোককে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। রাতে সোনাডাঙ্গা থেকে জাবেদ গাজীকে আটক করা হয়। সে ব্যাক আপ অংশের সদস্য ছিল। নিহতের পরিবার মামলা করলে তাকেও আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে তিনি বলেন, অশোক সন্ত্রাসীদের একটি গ্র“পের সদস্য। নিজেদের অস্ত্র আছে।
খুলনা সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ কবির হোসেন বলেন, আটক অশোকের বিরুদ্ধে খুলনা থানার এসআই আমিরুল বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেছেন। অশোক ঘোষ একজন কনট্রাক্ট কিলার। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সে ৫০ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে সে কিন্তু তদন্তের স্বার্থে কোনো কিছু প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে মাছুম বিল্লার বাড়িতে গিয়ে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক নজরুল ইসলাম মঞ্জু পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। এ সময় তিনি বলেন, খুলনা এখন খুনের নগরীতে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো জোরদার করতে হবে। খুলনা শহরে প্রায়ই হত্যা, খুন ও হামলার ঘটনা ঘটছে। খুলনার মানুষ নিরাপদে থাকতে চায়। তাই সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দায়িত্বের প্রতি আরো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পরিশেষে তিনি বলেন, মাসুম বিল্লাহ হত্যাকান্ডে যারা জড়িত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি কঠোর ভূমিকা পালন করে তাহলে সন্ত্রাসীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।  
খুলনা মহানগর বিএনপি’র সভাপতি এড. শফিকুল আলম মনা বলেন, শ্রমিক দল নেতা মাসুম বিল্লাহ আমাদের দলীয় লোক। তাদের পরিবার বিএনপি পরিবার। বিধায় মাসুম বিল্লাহ হত্যাকান্ডে যারা জড়িত তাদের শিগগিরই আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য বিষয়ক সম্পাদক খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল বলেন, মাসুম বিল্লাহ আমাদের দলীয় লোক। তাকে সন্ত্রাসীরা গুলি ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। হত্যাকান্ডে যারা জড়িত তাদের অল্প সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি উদাত্ত আহŸান জানিয়েছেন।    
জেলা বিএনপি’র আহŸায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু বলেন, শ্রমিক দল নেতা মাসুম হত্যাকান্ডে যারা জড়িত রয়েছে তাদের দ্রুত আইনে  আওতায় আনতে হবে। জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, হত্যাকারী যেই হোক না কেন তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন পুলিশের কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। জেলা বিএনপি’র সাবেক সদস্য সচিব শেখ আবু হোসেন বাবু বলেন, হত্যাকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।  
নিহত মাসুম বিল্লাহ’র বড় ছেলে আবিদ হোসাইন বলেন, এ ঘটনায় এখনো মামলা দায়ের করা হয়নি। তিনি বলেন, সিসি টিভির ফুটেজ দেখে পুলিশ গ্রেনেড বাবু গ্র“পের সদস্য সনাক্ত করতে পারলেও মিশনে অংশ নেওয়া বাকি সদস্যদের এখনো আটক-গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তিনি তার পিতা হত্যাকান্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। হত্যাকান্ডের বিষয়টি যাতে বিএনপি’র চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছায় এ ব্যাপারে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছেন।  নিহত মাসুম বিল্লাহ’র বড় ভাই রূপসা বাগেরহাট বাস মিনিবাস চেয়ার কোচ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিএনপি নেতা আলহাজ¦ মোঃ মহিউদ্দিন শেখ বলেন, হত্যাকান্ডের পর থেকে তাদের পরিবার-পরিজন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি বলেন, হত্যাকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। 
মৃত্যুকালে মাসুম বিল্লাহ স্ত্রীসহ, দুই ছেলে, এক মেয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মাসুম বিল্লাহ কর্মজীবনে একজন প্রতিষ্ঠিত মৎস্য ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতা ছিলেন। এছাড়া রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচিত সাবেক সভাপতি ছিলেন। বাজনৈতিক জীবনে তিনি জাতীয়তাবাদী আদর্শের একজন মানুষ ছিলেন।   

প্রিন্ট

আরও সংবাদ