খুলনা | মঙ্গলবার | ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১ বৈশাখ ১৪৩৩

পানি চাইলে খাওয়ানো হয় মদ ও প্রস্রাব

বিহারে মুসলিম নারীকে রোজা অবস্থায় খুঁটিতে বেঁধে গণপিটুনিতে হত্যা

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪৩ এ.এম | ০৮ মার্চ ২০২৬


ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেও শেষ পর্যন্ত চরম নির্মমতার শিকার হতে হলো অসহায় এক মুসলিম নারীকে। রমজানের পবিত্রতা আর বিশ্বাসের আশ্রয়ে থাকা রওশন খাতুন জানতেন না, যে গ্রাম প্রধানের কাছে তিনি শান্তি ও সুরক্ষার আশা নিয়ে গিয়েছিলেন, ঠিক সেই জায়গা থেকেই তাকে ফিরতে হবে অমানবিক মৃত্যুর কোলে। একবিন্দু পানি চাওয়ার বদলে তাকে পান করানো হলো চরম অবমাননা। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই ভাঙেনি, বরং ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ভিত্তিকেই আজ কাঠগড়ায় দাড় করিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের বিহারের মধুবনী জেলার ঘোগারডিহা ব্লকের আমহি গ্রামে। ভুক্তভোগী রওশন খাতুন ১ মার্চ মারা গেছেন। স্থানীয় গ্রাম প্রধানের সাথে একটি বিরোধ মেটাতে গিয়ে তিনি এক উন্মত্ত জনতার হামলার শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ। ২৮ ফেব্র“য়ারি হামলার পর ভুক্তভোগী রওশন খাতুনকে পটনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
গ্রামবাসীদের দেওয়া তথ্য মতে, রওশন খাতুন স্থানীয় গ্রাম প্রধান কুমারী দেবীর কাছে গিয়েছিলেন, আশা করেছিলেন যে তার স্বামীর সাথে জড়িত একটি স্থানীয় সমস্যা তিনি শান্তিপূর্ণভাবে মিটিয়ে দেবেন। কিন্তু সাহায্য পাওয়ার পরিবর্তে, গ্রাম প্রধানের ছেলে মনু সিং এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নেতৃত্বে একটি দল তার ওপর চড়াও হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আক্রমণকারীরা রওশন খাতুনকে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে বেধড়ক মারধর করে। রওশন খাতুন তাদের থামার অনুরোধ করলেও তারা হামলা চালিয়ে যায় এবং তাকে অপমান করা হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “তিনি ন্যায়বিচার চাইতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগ শোনার বদলে কয়েকজন তাকে মারধর শুরু করে। পুরো গ্রামবাসীর কাছেই এটি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক।”
অন্য একজন বাসিন্দা ঘটনাটিকে অত্যন্ত বিচলিত করার মতো বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “মানুষ দেখছিল কী ঘটছে, কিন্তু মারধর চললই। তিনি অসহায় ছিলেন এবং বারবার তাদের থামার অনুরোধ করছিলেন।” ররাজা রাখা ভুক্তভোগীকে জোর করে মদ ও প্রস্রাব মিশ্রিত পানীয় খাওয়ানো হয়।
স্থানীয় ডিজিটাল প্রকাশনা ‘মিথিলা সমাচার’ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, হামলার সময় রওশন খাতুন রমজানের রোজা পালন করছিলেন। তিনি পানি চাইলে তাকে জোর করে মদ ও প্রস্রাব মেশানো এক মিশ্রণ পান করানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে, যা ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তবে, পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে এই অভিযোগগুলো এখনও পুরোপুরি যাচাই করা বাকি।
তদন্তকারী দলের একজন পুলিশ অফিসার বলেন, “আমরা ভুক্তভোগীর রোজা রাখা এবং পানি চাওয়ার বিষয়ে কিছু প্রতিবেদন দেখেছি। এই পর্যায়ে আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছি না। তদন্ত চলছে এবং সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
রওশন খাতুনের স্বামী দোষীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছেন। মনসুরি স¤প্রদায়ের রাজ্য সভাপতি অজয় মনসুরি অঙ্গীকার করেছেন যে, তার স¤প্রদায় প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করবে। তিনি বলেন, “আমি নিশ্চিত করব যে আমরা নিহত নারীর ন্যায়বিচারের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ব এবং আমরা চাই দোষীদের ফাঁসি দেওয়া হোক।”
এফআইআর দায়ের, গ্রাম প্রধানের ছেলে আটক : ঘটনার পর পুলিশ এফআইআর দায়ের করেছে এবং তদন্ত শুরু করেছে। গ্রাম প্রধানের ছেলেকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ঘটনার সময় উপস্থিত সকলকে শনাক্ত করার কাজ করছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা গ্রাম প্রধানের ছেলেকে আটক করেছি এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত সবাইকে শনাক্ত করছি। যারা দায়ী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং উত্তেজনা এড়াতে গ্রামে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে প্রমাণের ভিত্তিতে আরও গ্রেফতার হতে পারে।
পুরো জেলায় শোক ও ক্ষোভ : রওশন খাতুনের মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মধুবনী জেলায় বাসিন্দা, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন স¤প্রদায়ের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেকে বলেছেন যে, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে গ্রামীণ বিহারে বিশেষ করে সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের মানুষ যখন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সাহায্যের জন্য যায়, তখন তারা কতটা অরক্ষিত থাকে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “মানুষ গ্রাম প্রধানদের কাছে যায় এই আশায় যে সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে মিটে যাবে। রওশন খাতুনের সাথে যা ঘটেছে তা অনেক পরিবারকে স্তম্ভিত করেছে।”
এলাকার একজন প্রবীণ ব্যক্তি শোক প্রকাশ করে বলেন, “রওশন খাতুন একজন গরিব মহিলা ছিলেন, যিনি সাহায্যের আবেদন করতে গিয়েছিলেন। তার মৃত্যু সবাইকে গভীর ভাবে আঘাত দিয়েছে। আমরা তার জন্য ন্যায়বিচার চাই এবং সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক, এটাই আমাদের চাওয়া।”

প্রিন্ট

আরও সংবাদ