খুলনা | রবিবার | ৩১ অগাস্ট ২০২৫ | ১৬ ভাদ্র ১৪৩২

অভিযোগ অস্বীকার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা

কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই সাপে কাটা রোগীর প্রতিষেধক : যেতে হয় সদরে

হাবিব ওসমান, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ |
১১:২৭ পি.এম | ০৮ অগাস্ট ২০২৫


ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে চিত্রা, বেগবতি ও ভৈরব নদ। উপজেলাটি একটি নদী তীরবর্তী উপজেলা। তাছাড়াও এই উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য খাল, বিল, দীঘি নালা, হাওড় বাওড়সহ বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। বর্তমানে এই অঞ্চলে  বর্ষা মৌসুম হওয়ায় ছোট ছোট ঝোপ ঝাড়ে পানি চলে আসায় সাপের নিরাপদ আবাসস্থল তলিয়ে গেছে। যার কারণে বিষধর সাপসহ নানা প্রজাতির অসংখ্য পোকা মাকড় এখন লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলায়  বেশির ভাগ মানুষ কৃষি ও মৎস কাজের সাথে জড়িত। এখানে সাধারণত গ্রামগুলোর মানুষ সাপের কামড়ের স্বীকার হয়ে থাকে। 
সাপের কামড়ের বিষক্রিয়ার প্রভাব দূর করতে বা কমাতে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে কাটা রোগীর জন্য প্রতিষেধক ভ্যাকসিন এন্টিভেনম নেই বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।  
এই উপজেলা বর্তমানে ভয়াবহ এক স্বাস্থ্য সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত ও আশপাশের পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এখন বিষাক্ত সাপ শুধু জলাবদ্ধ স্থানেই সীমাবদ্ধ নেই, বাড়ির ভেতর, শুকনা জায়গা, স্কুলঘর এমনকি মানুষের আবাসস্থলেও হঠাৎ হঠাৎ ঢুকে পড়ছে বিষধর সাপ। ফলে সাপে দংশনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। শুধু গত তিন সপ্তাহেই কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৮ জন সাপে দংশিত রোগী চিকিৎসার জন্য এসেছেন।
সাপের কামড়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় পল­ী এলাকার মানুষ। এই উপজেলার গ্রামাঞ্চলে সাপের কামড়ে মৃত্যু ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্ষা আসলেই সর্প দংশনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সর্প-দংশনে প্রধাণত দরিদ্র জনগণ আক্রান্ত হয় যাদের অনেকেরই ওষুধপত্র ক্রয়ের আর্থিক সঙ্গতি নেই। সরকারী চিকিৎসা সেবায় এদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রধানতম উপায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, কালীগঞ্জ উপজেলার এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সাপে কাটার এন্টিভেনম নেই বলে অভিযোগ অনেকেরই। যদিও মাঝে মধ্যে এন্টিভেনম থাকে তা মাত্র দুইজন সাপে কাটার রোগীর জন্য, যেটা খুবই কম। ফলে সাপে কাটা রোগী দুয়ের অধিক হলেই রোগীকে যশোর বা ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে রেফার্ড করতে হয়। যার ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। 
এই উপজেলায় গত কয়েক বছরে মৃত্যুবরণ অনেক সাপে কাটা রোগী। ২০১৬ সালে উপজেলার শিমলা-রোকনপুর গ্রামের মণিরুল ইসলামের শিশুপুত্র সায়েম সাপের কামড়ে মারা যায়, ২০১৯ সালের ৪ অক্টোবর মাসে উপজেলার সুন্দরপুর গ্রামে সাপের কামড়ে মারা যায় রামজান আলী (৫০) নামের এক কৃষক। তিনি ওই গ্রামের মৃত ভাগাই সরদারের ছেলে। জানাগেছে, তিনি মাঠে ঘাস কাটছিলেন। সে সময় একটি বিষধর সাপ তাকে কামড় দেয়। প্রথমে তাকে গ্রাম্য ওঝার কাছে নিয়ে ঝাড়ফুঁক করে বাড়ি নিয়ে আসে। কিছুক্ষণ পরে তিনি গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। পথিমধ্যে বিকাল সাড়ে ৫ টার দিকে তিনি মারা যান। ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর উপজেলার কোলা ইউনিয়নে সুব্রত নামের এক যুবককের মৃত্যু হয়, তিনি অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। রাতে ছেলেটিকে ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় বিষাক্ত সাপে দংশন করলে ভোর রাতে তাকে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ডাক্তার সাপে দংশনকৃত রোগির অবস্থা খারাপ দেখে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। পরে যশোর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ৪ আগস্ট উপজেলার কাশিপুর বেদে পল­ীর রওশন আলী চাচড়া গ্রামের মাঠে বিষধর সাপ ধরতে যায়। সে মাটি খুঁড়ে সাপ ধরতে গেলে সাপটি তার হাতের একাধিক জায়গায় কামড় দেয়। সে সময় উপস্থিত লোকজন তাকে উদ্ধার করে বেদে পল­ীর নামকরা ওজারা ঝাড়ফুঁক দেয়, এরপর এদিন বিকেলে তার মৃত্যু হয়। 
সর্ব শেষ গত ৩ আগস্ট রোববার ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, উপজেলার শিবনগর গ্রামের খলিলুর রহমানের এক বছরের শিশু কন্যা আয়াতকে সাপে দংশনের পর তার মা ও পরিবারের লোকজন কান্নাকাটি করতে করতে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন। কিন্তু ইনজেকশন না থাকার অভিযোগ করেন তারা। অসহায় সেই মা হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে গিয়ে বুক চাপড়ে কান্নাকাটি করে গড়াগড়ি করতে দেখা যায়। আর বারবার চিৎকার করে বলতে শোনা যায় আমার বাচ্চারে বাঁচান। এই করুণ দৃশ্য উপস্থিত মানুষজনের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, এবং সামাজিক মাধ্যমে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। হাসপাতালে এন্টিভেনম না থাকায় তাকে মটরসাইকেল যোগে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।  
স্থানীয়রা বলছেন, এখন তো আর সাপ শুধু জঙ্গলে বা পানিতে থাকে না, শোবার ঘর, বারান্দায়, রান্নাঘর সবখানেই ঢুকে পড়ছে। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার প্রতিষেধক নেই, যার কারণে অকালে ঝড়ে পড়ছে তরতাজা প্রাণগুলো।  
উলে­খ্য, কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতি মাসে গড়ে ১৪ হাজারের বেশি বহির্বিভাগ রোগীকে সেবা দিয়ে থাকে। অথচ এমন গুরুত্বপর্ণ হাসপাতালে অতি প্রয়োজনীয় সাপে কাটা এন্টিভেনম ভ্যাকসিন মাত্র দুইজন রোগীর জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ, যা খুবই অপ্রতুল্য। সাপে কাটার পর দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিষেধক প্রয়োগ না করলে রোগীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় এলাকাবাসীর দাবি অবিলম্বে কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজন মত এন্টিভেনোম ইনজেকশন সরবরাহ ও জরুরি ইউনিট চালু করতে হবে। কারণ একটি শিশুর মৃত্যু শুধু তার পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের অপমৃত্যু। 
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ রেজাউল করিমের সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এন্টিভেনম নেই এই অভিযোগটা সঠিক নয়, এখানে সাপে কাটার ২০ ভায়েল এন্ট্রিভেনম ভ্যাকসিন আছে। যা দুইজন সাপে কাটা রোগীর প্রয়োগ করা যাবে। গত কালকে যে বাচ্চার কথা বলা হচ্ছে, আসলে ওই বাচ্চার সাপে কাটেনি। আর সাপে না কাটলে এন্টিভেনম দেওয়ার কোন নিয়ম নেই।   
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ জেলা সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ঝিনাইদহ জেলা সদর হাসপাতালে ৫০ ডোজ বরাদ্দ যা ৫ জন সাপে কাটা রোগীকে দেওয়া যায়। বাকি কালীগঞ্জসহ ৫টি উপজেলাতে ২০ ডোজ করে বরাদ্দ যা ২জন রোগীকে দেওয়া যায়। এটা ১ বছরের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। কারণ ১ ডোজের দাম সাড়ে ১২ হাজার টাকা।
 

্রিন্ট

আরও সংবদ