খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১২ মার্চ ২০২৬ | ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

বাইরে চিকিৎসা নিতে মোটা অংকের টাকা গুণতে হচ্ছে রোগীদের

পাঁচ বছর ধরে নষ্ট সামেক হাসপাতালের কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক লেজার লিথোট্রিপসি মেশিন

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা |
১১:৩৮ পি.এম | ১১ মার্চ ২০২৬


সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ (সামেক) হাসপাতালে কোটি টাকা মূল্যের লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি গত পাঁচ বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা মেশিনটি মেরামতের কোন উদ্যোগ না নেওয়ায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাতক্ষীরার কিডনি রোগীরা। ফলে মোটা অংকের টাকা খরচ করে বেসরকারি হাসপতাল থেকে মাইক্রো সার্জারীর মাধ্যমে বা পেট কেটে কিডনির পাথর অপসারণে মোটা অংকের টাকা গুণতে হচ্ছে রোগীদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের কিডনি থেকে পাথর অপসারণের জন্য কোটি টাকা দিয়ে ক্রয় করা হয়েছিল একটি লেজার লিথোট্রিপসি মেশিন। যার মাধ্যমে কোন প্রকার অপারেশন বা পেট কাঁটা ছেড়া ছাড়াই কিডনী থেকে পাথর অপসারণ করা যাবে। এতে উপকৃত হবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র কিডনি রোগীরা। কিন্তু খাতা কলমে ঠিক থাকলেও ক্রয় করার প্রায় দুই বছর পরে কয়েকদিন ব্যবহারের পর থেকেই বিকল হয়ে পড়ে আছে অত্যাধুনিক এই লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি। এতে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার কিডনি রোগীরা। সামেক হাসপাতালে কাক্সিক্ষত সেবা না পেয়ে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মাইক্রো সার্জারীর মাধ্যমে কিডনির পাথর অপসারণে মোটা অংকের টাকা গুণতে হচ্ছে রোগীদের।  
সামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে আনা মেশিনটির নাম লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি। এর সাথে ছিল ভিডিও ইরেটারো রেনসকোপ। এই মেশিনের সাহায্যে মানবদেহের বাইরে থেকে কিডনীর পাথর ভেফু ফেলা সম্ভব। এর ফলে অপরেশনের ধকল সইতে হয় না রোগীদের। সেই সঙ্গে রোগীদের বাঁচে অর্থ ও মূল্যবান সময়। ২০১৭ সালের দিকে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালে মেশিনটি সামেক হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ানের অভাবে মেশিনটি পড়ে থাকার পর ২০২১ সালে এটি প্রথমে চালু করা হয়। এসময় মেডিকেল কলেজের তৎকালিন অধ্যক্ষ ডাঃ রুহুল কুদ্দুস মেশিনটি ব্যবহার করে পর্যায়ক্রমে সাত জন রোগীর কিডনির পাথর ক্রাশ করেন। পরে হাসপাতালের সাবেক ওয়ার্ড মাষ্টার মুরাদ-এর স্ত্রীর কিডনির পাথর ভাঙার সময় মেশিনের ভিডিও ইরেটারো রেনসকোপটি নষ্ট হয়ে যায়। পরে লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটিও কাজ করেনি। সেই থেকে মেশিনটি আর ঠিক করা হয়নি। অদ্যাবদি সেটি বিকল অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে আছে। 
আশাশুনি উপজেলার বিছট গ্রামের আব্দুল হাকিম মোড়ল জানান, তার একটি কিডনিতে পাথর ছিল। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিডনির পাথর ভাঙা মেশিন আছে শুনে ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি সেখানে যোগাযোগ করেন। এসময় তাকে জানানো হয় মেশিন চালু হলে তিনি এখান থেকে চিকিৎসা নিতে পারবেন। ২০২১ সালের শেষের দিকে তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, চালু করার কিছুদিনের মধ্যেই মেশিনটি নষ্ট হয়ে গেছে। পরে বাধ্য হয়ে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মোট অংকের টাকা খরচ করে মাইক্রো সার্জারীর মাধ্যমে তিনি কিডনির পাথর অপসারণ করেন।
কিডনির পাথর নিয়ে ভর্তি হওয়া আরেক রোগী জানান, ডাক্তার পরীক্ষা করে বলল পাথর হয়েছে অপারেশন করতে হবে। পেট কেটেই অপারেশন করতে হবে। মেশিন নাকি নষ্ট। এই অপারেশন বাইরের হাসপাতালে করতে অনেক টাকা লাগবে। আমরা গরিব মানুষ এতো টাকা কোথায় পাবো। তাই বাধ্য হয়ে পেট কেটেই অপারেশন করতে হবে। মেশিনটি চালু হলে গরিব মানুষ উপকার পাবে। 
এব্যাপারে হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের ডাঃ শরিফুল ইসলাম জানান, এই মেশিনটি চালু থাকলে হতদারিদ্র মানুষদের কাঁটা ছেড়া ছাড়াই সফলভাবে কিডনী থেকে পাথর অপরেশন করা সম্ভব হত। রোগীদের আর বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করা লাগত না। কিন্তু কয়েক বছর ধরে মেশিনটি নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। তাই রোগীদের ভোগান্তি দূরীকরণে এটি চালু করা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডাঃ রুহুল কুদ্দুস জানান, ২০২১ সালে লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি চালু করার পর মাত্র সাতজন রোগীর কিডনির পাথর ক্রাশ করা হয়েছিল। আট নম্বার রোগীর কিডনির পাথর ক্রাশ করার সময় প্রথমে মেশিনের ভিডিও ইরেটারো রেনসকোপে ত্র“টি দেখা দেয়। সেই থেকে মেশিনে আর কাজ করা হয়নি। পরে মেশিনটি মেরামত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোন উদ্যোগ নেয়নি। 
সাতক্ষীরার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক  ডাক্তার মোঃ কুদরত-ই খোদা জানান, ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই আমি যোগদান করার পর জানতে পারি যে, কিডনি থেকে পাথর অপসারণের জন্য ব্যবহৃত লেজার লিথোট্রিপসি মেশিনটি চালু করার কয়েকদিন পর থেকেই নষ্ট। বিষয়টি আমি কয়েকবার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। কিন্তু অদ্যবধি কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। লেজার লিথোট্রিপসি মেশিন, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিনসহ হাসপাতালে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা অন্যান্য মেশিনগুলোর ব্যাপারে আমি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করেছি। তিনি এগুলোর ব্যাপারে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ