খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১২ মার্চ ২০২৬ | ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

ভেঙ্গে দেওয়ার ১৭ মাস পর আজ বসছে সংসদ : কে বসছেন সভাপতির আসনে?

বিশেষ প্রতিবেদক |
১২:৫৮ এ.এম | ১২ মার্চ ২০২৬


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ থেকে শুরু হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আজ বেলা ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ মন্ত্রিসভা অনুমোদন করবে এবং পরে সংসদ সদস্যরা তা নিয়ে আলোচনা করবেন।
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরদিন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। সেই থেকে কোনো অধিবেশন হয়নি সংসদে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার। 
এটি ২০২৬ সালেরও প্রথম অধিবেশন। সংসদীয় রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রপতি প্রতি বছর সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন।
এর আগে, গত ২৩ ফেব্র“য়ারি রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহŸান করেন।
অধিবেশন শুরুর আগে সংসদের কার্যপ্রণালী নির্ধারণের জন্য সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে, যেখানে অধিবেশনের সময়কাল ও এজেন্ডা নির্ধারণ করা হবে।
প্রথম বৈঠকে সরকারি দলের (ট্রেজারি বেঞ্চ) প্রধান কাজ হবে সরকার যে সব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে চায় সেগুলো সংসদের সামনে উপস্থাপন করা।
অন্তর্বতীকালীন সরকার তাদের ১৮ মাসের মেয়াদকালে মোট ১৩০টি অধ্যাদেশ জারি বা সংশোধন করেছে।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহŸান করতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশন আহŸান করেন।
এর আগে গত ১২ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট ১৩ ফেব্র“য়ারি প্রকাশিত হয়।
১৩তম জাতীয় সংসদে বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যে সংসদ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। আর বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান।
দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় প্রথম অধিবেশনে একজন জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতা সভাপতিত্ব করবেন বলে সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
সংসদের প্রথম বৈঠক শুরু হওয়ার পরপরই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন এবং রাষ্ট্রপতি তাদের শপথ পাঠ করাবেন। তাদের নির্বাচনের পর শপথ গ্রহণের জন্য অধিবেশন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হতে পারে।
এরপর নবনির্বাচিত স্পিকার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। প্রথম বৈঠকেই নতুন সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হবে, যার প্রধান থাকবেন নতুন স্পিকার। এই কমিটিই উদ্বোধনী অধিবেশনের মেয়াদ এবং সংসদের অন্যান্য কার্যসূচি নির্ধারণ করবেন।
এ অধিবেশনেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠন করা হতে পারে। প্রথম বৈঠকে সংসদে শোক প্রস্তাবও গৃহীত হবে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্র“য়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ১৩ ফেব্র“য়ারি ২৯৭টি আসনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে, যার মধ্যে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৬টি আসন, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একাই পেয়েছে ৬৮টি আসন।
পরে ১৭ ফেব্র“য়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। একই দিন বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের মাধ্যমে দেড় বছর মেয়াদি অন্তর্বতী সরকারের পর দেশে নির্বাচিত সরকারের অধীনে সংসদীয় কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে।
কে বসছেন সভাপতির আসনে? উদ্বোধনী দিনে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সংসদ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
সংবিধান অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহŸান করা বাধ্যতামূলক। সেই বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রথম অধিবেশন আহŸান করেছেন।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সাধারণত নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিদায়ী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার। তাদের উপস্থিতিতেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। তবে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং আত্মগোপনে রয়েছেন।
অন্যদিকে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বিভিন্ন মামলায় কারান্তরীণ। ফলে উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা।
এ পরিস্থিতিতে বুধবার ক্ষমতাসীন দল বিএনপি’র সংসদীয় দলের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নাম চূড়ান্ত করার পাশাপাশি প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্বের প্রক্রিয়াও নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে বিএনপি’র চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, প্রথম দিনে স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশন শুরু হবে। শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের পর সংসদ নেতা একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যকে সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য প্রস্তাব করবেন। অন্য একজন সদস্য তা সমর্থন করলে ওই সদস্য সাময়িকভাবে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করবেন।
তার সভাপতিত্বেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। এরপর তাদের শপথের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে।
সংসদীয় সূত্রে জানা গেছে, জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য হিসেবে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের প্রথম বৈঠকেই সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। আর সংবিধানের ৭২(৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নতুন স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদে বহাল থাকবেন বলে গণ্য হবেন।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দু’জনের কেউ দায়িত্ব পালনের অবস্থায় না থাকায় কার্যপ্রণালী বিধির আলোকে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন। সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার নিয়ে একাধিক গবেষণামূলক বইও লিখেছেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব নিয়ে শূন্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বলেন, সংসদ বিলুপ্ত হলেও সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দায়িত্বে থাকেন। পরবর্তী সংসদে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাদের কার্যকাল থাকে। যেহেতু স্পিকারের বিকল্প হিসেবে ডেপুটি স্পিকার রয়েছেন, তাই এ নিয়ে হয়তো আলাদা করে ভাবতে হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সকল প্রতিষ্ঠান প্রায় ভেঙে পড়েছে। এমতাবস্থায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়ের অনুপস্থিতিতে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, এটা নিয়ে সাংবিধানিক শূন্যতা রয়েছে। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সে শূন্যতা পূরণ করতে রাষ্ট্রপতি একজনকে প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব দিতে পারেন।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ