খুলনা | রবিবার | ২২ মার্চ ২০২৬ | ৮ চৈত্র ১৪৩২

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

শোকাহত পরিবেশে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা, পাশাপাশি ৯ স্বজনের দাফন

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট ও মোংলা প্রতিনিধি |
০১:৫৯ এ.এম | ১৪ মার্চ ২০২৬


শোকাহত পরিবেশে ও অশ্র“ নয়নে শেষ বিদায় জানালো বাগেরহাটের রামপালে সড়ক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ নিহত ১৪ জনকে। পৃথকভাবে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার জুম্মাবাদ বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকসহ তার পরিবারের ৯ সদস্যকে মোংলা পোর্ট পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এদিকে একই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কনে, তাঁর বোন ও দাদির জানাজা খুলনার কয়রা উপজেলার নকশা গ্রামে গতকাল সকালে এবং দাকোপে জুমার নামাজের পর কনের নানির জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বেলা ১১টায় বাগেরহাট রামপালে মাইক্রোবাস চালকের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে নিহত আবদুর রাজ্জাক সরদারের পরিবারের ৯ সদস্যের জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। বেলা আড়াইটায় অনুষ্ঠিত এ জানাজায় রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্বজনসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
এর আগে শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টায় যখন নিহতদের মরদেহ মোংলার শেওলাবুনিয়ায় পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকা যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। শত শত মানুষ ছুটে আসেন শেষবারের মতো তাদের দেখতে। চারদিকে শুধু কান্না আর শোকের মাতম।
আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ির ভেতরে রাখা হয় পরিবারের নিহত চার নারীর মরদেহ। আর উপজেলা পরিষদ চত্বরে রাখা হয় বাকি পাঁচজনের মরদেহ। আশপাশের ৯টি মসজিদ থেকে আনা হয় ৯টি খাটিয়া। গোসল শেষে একে একে রাখা হয় স্বজনদের নিথর দেহ।
বৃহস্পতিবার রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল হাসপাতাল থেকে মরদেহগুলো আনার পর গোসল শেষে সকাল থেকে একে একে তাদের মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন মাঠে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। আর কনে পক্ষের বাড়ি কয়রায় ও রামপালের চালকসহ ৫ জনকে তাদের নিজ নিজ এলাকায় দাফন করা হয়েছে। 
নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই মোঃ সাজ্জাদ সরদার বলেন, রাজ্জাক ভাই ছেলের বিয়ে দিয়ে নতুন বউ ঘরে তুলবেন এই আনন্দ নিয়ে সবাই ছিলাম। কিন্তু সেই আনন্দের বিয়েই আজ পুরো পরিবারকে শেষ করে দিলো।
এদিকে মৃত ব্যক্তিদের প্রতিজনকে ৫ লাখ টাকা করে অনুদান প্রদানে করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ। সরকারি ভাবে আরো অনুদান দেয়া হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। 
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি : বাগেরহাটের রামপালে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মেজবাহ উদ্দিনকে প্রধান করে এই কমিটি করা হয়। কমিটির আর দুই সদস্য হলেন, বিআরটিএ বাগেরহাটের সহকারি পরিচালক লায়লাতুল মাওয়া, জেলা পুলিশের নবম গ্রেডের সমমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। 
তিন সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করবে। সেই সাথে দুর্ঘটনারোধে করনীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে। যথাসম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে বলে জানান বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন।
নিহতদের মধ্যে ৯ জনই ছিলেন মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের সদস্য। নিহতরা হলেন আব্দুর রাজ্জাক, তার দুই ছেলে সাব্বির ও আব্দুল­াহ, এক মেয়ে ঐশী, ৪ নাতনি আরফা, ইরান, ফাহিম ও আলিফ। এছাড়া তার এক পুত্রবধূ পুতুল বেগম নিহত হয়। কয়রা উপজেলার কনের দাদি, নানী, বোন ও কনে এবং রামপাল উপজেলার মাইক্রোবাস চালক এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
মোংলায় নব বর সাব্বির ও তার বাবা আব্দুর রাজ্জাকসহ পরিবারের ৯ জনের মরদেহ শুক্রবার ভোর রাতে মোংলার শেহালাবুনিয়ায় শহরের ৮নং ওয়ার্ডে নিজ বাড়িতে পৌঁছালে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা মাঠে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং মোংলা পৌর কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করেন মৃত রাজ্জাকের আত্মীয় ও রাজনৈতিক দল বিএনপি’র উপজেলা ও পৌর নেতাকর্মীরা।
অন্যদিকে, কনে মিতু, তার বোন, নানী ও দাদির মরদেহ খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামে নেওয়া হয়। সেখানে শুক্রবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে তাদের নিজ বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মাইক্রোবাস চালককে দাফন করা হয় রামপালের তার নিজ বাড়িতে। 
মোংলা ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মোঃ রুহুল আমিন এ জানাজায় ইমামতি করেন। মোংলায় একই পরিবারের ৯ জন নিহত হওয়ার মোংলা উপজেলা মাঠে নামাজে জানাজায় অংশ নেয় মোংলা-রামপাল বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাত, বাগেরহাট জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির এড. মাওলানা আঃ ওয়াদুদ, বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ হাছান চৌধুরী, সহকারী পুলিশ সুপার রিফাতুল ইসলাম, পৌর বিএনপি’র সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মোঃ জুলফিকার আলী, সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিক, উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি মোঃ আঃ মান্নান, সাধারণ সম্পাদক আবু হোসেন পনি সহ প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক লোক এ জানাজায় অংশ নেয়।
জানাজার নামাজ শুরুর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে নিহত আবদুর রাজ্জাকের বড় ছেলে আশরাফুল আলম (জনি) উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমার আর কিছুই থাকল না। বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী-সন্তান সবাই চলে গেল। এটিই হয়তো ছিল আল­াহর ফয়সালা। আপনারা সবাই দোয়া করবেন, তাঁদের ক্ষমা করে দেবেন।’ আশরাফুল আলমের আকুতি আর উপস্থিত মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস।
জানাজা শুরুর আগে একে একে নিহত ৯ জনের খাটিয়া পাশাপাশি রাখা হয়। জানাজা শেষে মরদেহগুলো মোংলা সরকারি কবরস্থানে নেওয়া হয়। পরে সেখানে তাঁদের দাফন করা হয়।
বক্তব্যে পৌর বিএনপি’র সভাপতি ও সাবেক মেয়র জুলফিকার আলী খুলনা-মোংলা মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের প্রতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষভাবে নৌবাহিনীর গাড়িগুলোর গতিসীমা বেঁধে দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী নিহত পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। 
তিনি বলেন, এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এছাড়া সড়কে দুর্ঘটনা এড়াতে এখন থেকে কঠোরভাবে কাজ করা হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় হিতদের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রত্যেককে ৫ লক্ষ টাকা করে অনুদান প্রদান করা হয়েছে। 
এ ব্যাপারে মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে তাদের সকল কাগজ পত্র জমা দিয়ে এ টাকা গ্রহণ করার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া সরকারিভাবে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এবং নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। 
সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, ‘যে বাড়িতে আজ আনন্দের ফল্গুধারা থাকার কথা, সেখানে আজ বিষাদের কালো ছায়া। আমরা শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।’
মোংলা কবরস্থানের খাদেম মোঃ মুজিবুর ফকির বলেন, ‘পরিবারের সম্মতিতে একই স্থানে পাশাপাশি ৯টি কবর প্রস্তুত করা হয়। ১৭ বছর ধরে কবরস্থানের দায়িত্ব পালন করছি। কখনো একসাথে একই পরিবারের এত সদস্যের কবর খুঁড়ি নাই। ঘটনাটা খুবই হৃদয়বিদারক।’
প্রত্যক্ষদর্শী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ি এই পাশে। জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা দেখি নাই।  আমার চোখের সামনেই ঘটেছে দুর্ঘটনাটি। মাঠ থেকে গরু নিয়ে ফিরছিলাম, হঠাৎ বিকট শব্দ, প্রথমে ভেবেছি গরুটা হয়তো বাসের সামনে পড়েছে। পরে দেখি দুই গাড়ির সংঘর্ষ। রক্ত আর মরা মানুষ। একসাথে এত আহত মানুষ সরাসরি কখনও দেখি নাই।
রফিক আরও বলেন, মাঝে মাঝেই এই জায়গায় এবং ব্রিজের দুই পাশে ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু ব্রিজের দুই পাশে কোন সতর্কতামূলক চিহ্ন নাই।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর বেলাইব্রিজ এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় একসাথে মোটরসাইকেলের তিন আরোহী নিহত হন। প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর শোনা যায় এই এলাকাটিতে।
কাটাখালি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ জাফর আহমেদ বলেন, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিবার বা স্বজনদের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ করা হয়নি। তবে স্বজনরা অভিযোগ করলে, আমরা তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করব। দুর্ঘটনা কবলিত নৌবাহিনীর স্টাফ বাস ও বর কনে বহনকারী মাইক্রোবাসটি কাটাখালি হাইওয়ে থানায় রয়েছে।
সহযোগিতার ঘোষণা : নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন বলেন, নিহতদের প্রতি পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা সহযোগিতা করা হবে। বর ও কনের দাফনের জন্য ২০ হাজার করে মোট ৪০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এছাড়া বিআরটিএ দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আর্থিক সহায়তা তহবিলসহ অন্যান্য সহযোগিতা নিয়ম অনুযায়ী পাবেন দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবার।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ