খুলনা | বুধবার | ১৮ মার্চ ২০২৬ | ৩ চৈত্র ১৪৩২

বইমেলা ও নারী উদ্যোক্তাদের সৃজনশীল জয়যাত্রা

জয়া মাহবুব |
১২:৩২ এ.এম | ১৮ মার্চ ২০২৬


অমর একুশে বইমেলা এখন আর কেবল ছাপানো হরফ আর মলাটের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে বাঙালির সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক এক মহোৎসব। গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মেলাকে কেন্দ্র করে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এই অর্থনীতির অগ্রভাগে রয়েছেন এদেশের অদম্য নারী উদ্যোক্তারা, যারা সাহিত্য ও ফ্যাশনকে এক সুতোয় গেঁথে বইমেলার ক্যানভাসকে করেছেন আরও বর্ণিল।
ভোক্তা থেকে উৎপাদক : ঐতিহাসিকভাবে বইমেলায় নারীদের উপস্থিতি ছিল মূলত পাঠক বা দর্শক হিসেবে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশের বিপ্লব এই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে হাজারো নারী আজ উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তারা কেবল বইমেলার জন্য শাড়ি বা পাঞ্জাবি কিনছেন না, বরং তারা নিজেরাই নকশা করছেন, উৎপাদন করছেন এবং বাজারজাত করছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি নারী ক্ষমতায়নের এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে ঘরোয়া পরিসর থেকে বেরিয়ে তারা জাতীয় স্তরের একটি উৎসবে অর্থনৈতিক অংশীদার হচ্ছেন।
সাহিত্যের পরিধেয় রূপান্তর : বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তারা মেলা উপলক্ষে যে পোশাকগুলো তৈরি করছেন, তাকে কেবল ‘ফ্যাশন’ বললে ভুল হবে; এটি মূলত এক ধরনের ‘পরিধেয় সাহিত্য’। ফেব্র“য়ারির আবেগ, ভাষার ইতিহাস এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে তারা কাপড়ের ক্যানভাসে রূপ দিচ্ছেন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে শাড়ির পাড়ে টাইপোগ্রাফির সূ² কাজ, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কিংবা ‘ মোদের গরব মোদের আশা’-এমন লাইন যখন নকশার অংশ হয়ে ওঠে, তখন পোশাকটি আর নিছক অলংকার থাকে না; হয়ে ওঠে স্মৃতির বাহক।
কখনো দেখা যায় শাড়ির আঁচলে শহিদ মিনারের বিমূর্ত রূপ, কখনো আবার হাতের তুলিতে ফুটে ওঠে বাংলা বর্ণমালা অ, আ, ক, খ। আবার যখন জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’-এর পঙ্ক্ত হ্যান্ডপেইন্টের ছোঁয়ায় কাপড়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন সেই পোশাক যেন সাহিত্যকে নতুন এক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে পোশাকটি হয়ে ওঠে এক চলমান পাঠ্যপুস্তক যেখানে শিল্প, সাহিত্য এবং ইতিহাস একসঙ্গে কথা বলে।
এই সৃজনশীলতা শুধু নান্দনিকতার জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও রয়েছে। বইমেলার প্রাঙ্গণে যখন কেউ এমন একটি শাড়ি বা পোশাক পরে হাঁটেন, তখন তা দর্শকের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্তি¡ক আভিজাত্য ও বৌদ্ধিক পরিচয়ের অনুভূতি তৈরি করে। যেন তিনি কেবল একটি পোশাক পরেননি-তিনি একটি ভাষা, একটি ইতিহাস এবং একটি সাহিত্যিক ঐতিহ্য বহন করছেন। এক অর্থে, নারী উদ্যোক্তাদের এই উদ্যোগ বইমেলার সংস্কৃতিকে আরেক ধাপ  এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বই যেখানে শব্দের মাধ্যমে গল্প বলে, সেখানে এই পোশাকগুলো রঙ, রেখা ও নকশার মাধ্যমে একই গল্পকে দৃশ্যমান করে তুলছে। ফলে ফ্যাশন এখানে কেবল সাজ নয়, এটি হয়ে উঠছে সংস্কৃতির এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী ভাষা।
প্রান্তিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান : এই শিল্পের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ঢাকার একজন নারী উদ্যোক্তা যখন বইমেলার জন্য শাড়ির অর্ডার নেন, তখন তার সাথে জড়িয়ে যায় টাঙ্গাইল বা সিরাজগঞ্জের তাঁতি পরিবার, জামালপুরের নকশিকাঁথা শিল্পী কিংবা ঢাকার ডাইং কারিগররা। বইমেলা কেন্দ্রিক এই বুটিক ব্যবসা বাংলাদেশের প্রান্তিক নারী কর্মীদের জন্য বছরের একটি বড় আয়ের উৎস, যা পরোক্ষভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করছে।
বাঁধা পেরিয়ে ‘স্মার্ট’ উদ্ভাবন বইমেলার ভেতরে বই ছাড়া অন্য পণ্য বিক্রির আইনি বাধা থাকলেও, প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে মেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলা সম্ভব। এর জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল মডেল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
স্মার্ট ডিরেক্টরি: হাতের মুঠোয় সাহিত্যের বাজার: বইমেলার একটি অফিসিয়াল ‘স্মার্ট ডিরেক্টরি’ বা সুপার অ্যাপ হতে পারে এই বিপ্লবের প্রথম ধাপ। এই অ্যাপের ‘লাইফস্টাইল ও সাহিত্য’ সেকশনে উদ্যোক্তারা নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। একজন পাঠক যখন নির্দিষ্ট লেখকের বই খুঁজবেন, অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই লেখকের থিমে তৈরি পোশাক বা অনুষঙ্গ সাজেস্ট করবে। এতে মেলার ভেতরে কোনো পণ্যের স্তূপ ছাড়াই পাঠক তার পছন্দের পোশাকটি দেখে নিয়ে সরাসরি অনলাইনে অর্ডার করতে পারবেন।
ডিজিটাল কোলাবরেশন: বুকমার্ক যখন সেতুবন্ধন : প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সাথে ‘ডিজিটাল অ্যাফিলিয়েট’ মডেল হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। প্রতিটি বইয়ের সাথে দেওয়া বিশেষ ‘বুকমার্ক’-এর এক পাশে থাকবে কিউআর (ছজ) কোড। এই কোড স্ক্যান করলে পাঠক সরাসরি সেই বইয়ের কাহিনী বা প্রচ্ছদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা পোশাকের কালেকশন দেখতে পাবেন। এতে মেলার শৃঙ্খলা বজায় রেখেও প্রতিটি পাঠকের হাতে উদ্যোক্তাদের ব্র্যান্ড পৌঁছে যাবে।
গ্যামিফিকেশন: মেলার ভেতরে এক ডিজিটাল রোমাঞ্চ : তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করতে ‘ডিজিটাল ট্রেজার হান্ট’ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। মেলার বিভিন্ন স্টলে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে পাঠক পয়েন্ট সংগ্রহ করবেন। নির্দিষ্ট পয়েন্ট অর্জনকারী পাঠকরা মেলা শেষে নারী উদ্যোক্তাদের অনলাইন শপ থেকে বিশেষ ডিসকাউন্ট বা গিফট পাবেন। এটি কোনো ফিজিক্যাল অবকাঠামো ছাড়াই মেলার ভেতরে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী বিপণন জাল তৈরি করবে। বইমেলা কেবল বই বিক্রির জায়গা নয়, এটি বাঙালির রুচি ও সৃজনশীলতার প্রদর্শনী। আর সেই প্রদর্শনীতে নারী উদ্যোক্তারা আজ এক অপরিহার্য শক্তি। যদিও বাজার দখল বা কপিরাইট লঙ্ঘনের মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও নীতিগত সমর্থন এবং প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় এই খাতকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। অক্ষরের বুননে তারা যে অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করছেন, তা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় নারীর অংশগ্রহণকেই স্পষ্ট করে। সাহিত্যের এই মিলনমেলা নারী উদ্যোক্তাদের হাত ধরে আরও বৈচিত্র্যময়, সমৃদ্ধ এবং ‘স্মার্ট’ হয়ে উঠুক-এটাই হোক আগামীর প্রত্যাশা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ