খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ মার্চ ২০২৬ | ৪ চৈত্র ১৪৩২

ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও করণীয়

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী |
০৩:০৬ এ.এম | ১৮ মার্চ ২০২৬


ঈদ একটি আরবী শব্দ। এটি  মূলত ‘আওদ’ শব্দমূল থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ হল বার বার আসা, ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা ইত্যাদি। মুসলিম উম্মার জীবনে চন্দ্র বছরের নির্দিষ্ট তারিখে প্রতি বছরই দু’টি উৎসবের দিন ফিরে আসে। এই কারণে দিন দু’টিকে ঈদ নামে অভিহিত করা হয়। আর ফিতর শব্দের অর্থ হলো ভেঙে ফেলা, বিদীর্ণ করা। মুসলমানগণ শাওয়ালের চাঁদ দেখার সাথে সাথে রোজা ভেঙে ফেলেন। এই জন্যই ঈদুল ফিতরকে রোজা ভাঙার আনন্দ বা রোজার ঈদ বলা হয়। বিশ্ব মুসলিম জাহানের জন্য ঈদুল ফিতর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। 
ঈদ রোজাদারদের পুরস্কার দিবস: ঈদুল ফিতর সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, প্রত্যেক স¤প্রদায়ের জন্য রয়েছে আনন্দের দিন, আর এটি হচ্ছে আমাদের আনন্দের দিন। যারা রোজা রাখেনি তাদের জন্য এ দিনে আনন্দের কিছু নেই। মাসের প্রথমে বেতন পাওয়ার আনন্দ তো তারাই প্রকৃতপক্ষে লাভ করতে পারে  যারা দীর্ঘ এক মাস কষ্ট করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অফিসের কাজ সম্পন্ন করে অথবা নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। ঈদের দিন হলো রোজাদারদের জন্য পুরস্কার বা বেতন পাওয়ার দিন। বিশ্ব নবী (সাঃ) এরশাদ করেন, ঈদের দিন হলো রোজাদারদের পুরস্কারের দিন এবং আসমানে এ দিনকে ‘পুরস্কার দিবস’ বলে নামকরণ করা হয় (তাবারানি)। তবে আল্লাহ তায়ালার অপার মেহেরবানি তিনি অঢেল বোনাসসহ বান্দার কর্মের পুরস্কার দিয়ে থাকেন। আল্লাহপাকের ঘোষণা, প্রত্যেক নেক কাজের বদলা আমি দশ গুণ দিয়ে থাকি। যাকে ইচ্ছা আমি আরও অঢেল বাড়িয়ে দিই (আল কুরআন)। 
ঈদের দিনে করণীয় আমল:  ঈদ যেমন আনন্দ তেমনি ইবাদতও বটে। হাদিসের কিতাব থেকে জানা যায়, ঈদুল ফিতরের দিনে করণীয় আমলসমূহের মধ্যে রয়েছে: ১. নিজ মহল্লার মসজিদে ফজরের নামায আদায় করা। ২. মিসওয়াক করা। ৩. গোসল করা। ৪. খুশবু ব্যবহার করা। ৫. সদাকাতুল ফিতর নামাযের পূর্বেই আদায় করা। ৬. সাধ্যানুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করা। ৭. খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করা। ৮. ঈদের ময়দানে যাওয়ার পূর্বে কিছু নাশতা করা। ৯. মিষ্টি জাতীয় ও বিজোড় সংখ্যার খেজুর দিয়ে এই নাশতা করা। ১০. সামর্থ্য অনুযায়ী অধিক পরিমাণ দান-সদাকা করা। ১১. আগেভাগে ঈদগাহে যাওয়া। ১২. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া। ১৩. ঈদগাহে এক পথে যাওয়া এবং অপর পথে ফিরে আসা। ১৪. ঈদগাহে যাওয়ার সময় চুপে চুপে তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা। তাকবীরে তাশরীক হলো, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ। ১৫. ঈদুল ফিতরের দিনে ফজরের ফরজ নামাজের পরে  ঈদের জামাত পর্যন্ত আর কোন সুন্নত বা নফল নামাজ না পড়া।  ১৬. ঈদের নামাজ ঈদগাহে পড়া সুন্নত। তবে যদি বৃষ্টি-বাদল হয় তাহলে মসজিদে আদায় করা যায়।
স¤প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে প্রতিক ঈদ: জাতীয় কবি নজরুলের ভাষায়, রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ। বাস্তবিক পক্ষেই ধনী-গরীব, শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবক, প্রৌঢ়-বৃদ্ধ; এক কথায় আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলের মাঝেই অনাবিল আনন্দের ঢেউ তোলে এই ঈদ।  ঈদ মানেই হলো আনন্দ, খুশি, ভেদাভেদ ভুলে সৌহার্দ্যরে আলিঙ্গন, আর সাম্যের গান। কবির ভাষায়, ‘আজ ঈদগাহে নেমেছে নতুন দিন, চিত্তের ধনে সকলে বিত্তবান, বড়-ছোট নাই, ভেদাভেদ নাই কোনো, সকলে সমান, সকলে মহীয়ান।’ ঈদ আমাদেরকে সাম্য, স¤প্রীতি, সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শেখায়। এই কারণেই  ঈদগাহে  যাবার পূর্বেই  ফিতরা আদায়ের আদেশ দেয়া হয়েছে ধনীদের, যাতে অভাবী, গরীব-দুঃখীরাও ঈদের আনন্দে শামীল হতে পারে। উৎসবের আনন্দধারা সকলের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়াই এই পবিত্র দিনের মর্মকথা। ঈদের ময়দানে রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, সাদা-কালো কোন ভেদাভেদ নেই। এ যেন কবির সেই বাণীকেই স্মরণ করিয়ে দেয়, ’ধনী-গরীব নেই ভেদাভেদ, সমান সবে আাজি/আজ মিলনের বেহেশতি সূর, উঠছে সদা বাজি।’ প্রকৃত অর্থেই স¤প্রীতি ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিয়ে যায় ঈদুল ফিতর। 
লেখক: অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ